অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কঠিন দিন পার করেছি: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন
![]() |
| মো. সাহাবুদ্দিন | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অত্যন্ত কঠিন সময় পার করার কথা জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়া মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি অভিযোগ করেছেন, মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার যেমন তাঁকে সরানোর চেষ্টা করেছে, তেমনি তাঁর বিদেশ সফর আটকানো, বিদেশের দূতাবাসগুলো থেকে ছবি নামিয়ে ফেলা এবং তাঁর প্রচার বিভাগকে (প্রেস উইং) সরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটিয়েছে।
গত শুক্রবার রাতে দৈনিক কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপ্রধান এসব কথা বলেন। সোমবার পত্রিকাটি সেই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করেছে।
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছিলেন ৭৫ বছর বয়সী মো. সাহাবুদ্দিন। একসময় তিনি দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কমিশনার ছিলেন, তখন দেশের মানুষ তাঁকে ‘সাহাবুদ্দিন চুপপু’ নামে চিনত।
রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিন বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। এই পদটি মূলত আনুষ্ঠানিক; দেশের নির্বাহী ক্ষমতা থাকে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার হাতে। দায়িত্ব নেওয়ার ১৬ মাসের মাথায় তিনি এক নজিরবিহীন পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান।
আওয়ামী লীগ আমলের আর কিছু অবশিষ্ট না থাকলেও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় বঙ্গভবনে থেকে যান মো. সাহাবুদ্দিন। তাঁকে সংসদ ভেঙে দেওয়ার আদেশ দিতে হয়েছে এবং মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে শপথ পড়াতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোকে আইনি রূপ দিতে বা অধ্যাদেশে পরিণত করতে তাঁকেই সই করতে হয়েছে। এমনকি নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নতুন সরকারও রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের কাছে শপথ নিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নানা ‘চক্রান্ত’ হয়েছে দাবি করে মো. সাহাবুদ্দিন সাক্ষাৎকারে বলেন, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা চিরতরে ধ্বংস করার এবং সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরির অনেক চেষ্টা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি আমার সিদ্ধান্তে শক্ত ছিলাম। যে কারণে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হয়নি। বিশেষ করে অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দেওয়ার অনেক পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে।’
এই দুঃসময়ে বিএনপির কাছ থেকে ‘পুরো সমর্থন’ পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপ্রধান। পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ ও বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের সময়কার পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘আমাকে কতভাবে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে! কোনো পরিস্থিতিতেই আমি ভেঙে পড়িনি। আমি বলেছি, আমার রক্ত ঝরলে ঝরুক, আমি আরেকটি ইতিহাসে যোগ হব। কিন্তু আমি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করব—এই সিদ্ধান্তেই আমি অটল ছিলাম। আল্লাহর ইচ্ছা আর আমার দৃঢ়তার কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে।’
![]() |
| বঙ্গভবনের দরবার হলে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
কালের কণ্ঠের প্রশ্ন ছিল—কারা এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং কেন আপনার প্রতি তাদের এত রাগ ছিল?
জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর বঙ্গভবন ঘেরাও করা হলো। অমুকের দল, তমুকের দল, মঞ্চ, ঐক্য—কত কী! রাতারাতি এসব তৈরি হলো। এগুলো আসলে একই ধরনের লোকজন, যারা বিভিন্ন ফোরামে বিভিন্ন নামে পরিচিত। তারা এত টাকা কোথায় পেল?’
তিনি সেদিনের বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘এখানে যখন ঘেরাও করা হলো, তখন সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশনের সদস্যরা এসে তিন স্তরে নিরাপত্তা দিলেন। তারপর একটি মেয়ে লাফ দিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার ওপর উঠে ঝাঁপ দেয়। কী আশ্চর্যের ব্যাপার! এগুলো সব ভাড়াটে লোক। যখন শব্দবোমা (সাউন্ড গ্রেনেড) মারা হলো, সে লাফ দিয়ে নিচে পড়ল। পড়ার পর সে নিথর হয়ে পড়ে থাকে যাতে ছবি তোলা যায়। সে এমনকি ক্যামেরাম্যানকে ডাকছিল ছবি তোলার জন্য।’
রাষ্ট্রপতি দাবি করেন, ‘এটা মূলত আমাকে ব্ল্যাকমেইল করার জন্য করা হয়েছিল। পরে নারী পুলিশ ও নারী সেনাসদস্যরা তাকে টেনেহিঁচড়ে তুলে সেনাবাহিনীর জিপে করে নিয়ে যান।’
সেই রাতের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, ‘ঐ রাতটি আমার জন্য ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। ফ্লাইওভার দিয়ে পেছন দিক থেকে প্রচুর ঠেলাগাড়ি, ভ্যান ও কাভার্ড ভ্যানে করে ভাসমান ও ছিন্নমূল লোকজন আসছিল। গণভবনের মতো তারা বঙ্গভবনও লুট করতে চেয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘আমরা তো ঘরেই ছিলাম। আমাদের তো আর কিছু নেই, এখান থেকে পালানোরও কোনো জায়গা নেই। পরিস্থিতি যদি ওরকম হতো, তখন অন্য কথা ছিল। তবে সেনাবাহিনী খুব শক্তভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয় এবং সাঁজোয়া যান (এপিসি) দিয়ে ঠেলে সব নিয়ন্ত্রণে আনে।’
সেই রাতের বর্ণনায় মো. সাহাবুদ্দিন আরও বলেন, ‘রাত ১২টার সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা ও তখনকার তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ফোন করেছিলেন। তিনি বললেন—এ রকম একটি খবর পাওয়া গেছে, তবে ওরা আমাদের লোক না। আমি এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলেছি।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘তারপর দেখলাম কিছু স্থানীয় লোক এসে তাদের নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কিছু লোক আবার থেকে যায়, যাদের সরাতে রাত ২টা বেজে গিয়েছিল। রাত ২টা-৩টা পর্যন্ত আমরা জেগে ছিলাম। ওদিকে বিভিন্ন জায়গায় তারা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে রাষ্ট্রপতির অপসারণ চেয়ে সভা করছিল।’
![]() |
| রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের নেতারা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
রাষ্ট্রপতির কাছে প্রশ্ন ছিল, সেই কঠিন সময়ে তিনি কাউকে পাশে পেয়েছিলেন কি না?
জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ওই কঠিন সময়েও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আমার পাশে ছিলেন। তাঁরা তখনো সংবিধানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট করে বলেছেন। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে আমার মনের মধ্যে অনেক কৌতূহল ছিল। কিন্তু আমি পর্যায়ক্রমে বুঝতে পারলাম, তিনি খুবই আন্তরিক মানুষ। তিনি অত্যন্ত আন্তরিক ছিলেন (হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল)! আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।’
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, ‘বিএনপির উচ্চপদে থাকা একজন নেতা আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন—আপনার প্রতি আমাদের সমর্থন আছে। আমরা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাই। কোনো অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে সরানোর পক্ষে আমরা নই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি বলব যে বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গীরা এক পক্ষে ছিল। আর অন্য পক্ষটি কারা, তাদের আপনারা সবাই চেনেন। তবে তারা শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি। বিএনপি ও তাদের জোটের অবস্থানের কারণেই সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। একটি বড় রাজনৈতিক দল যে শক্ত অবস্থান নিয়েছিল, সরকার তখন সেটি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল।’
কালের কণ্ঠের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল—এরপর কি তাঁকে সরানোর আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল?
জবাবে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘হ্যাঁ, বলতে গেলে শেষ সময় পর্যন্ত তারা চেষ্টা করে গেছে—কীভাবে আমাকে সরিয়ে দেওয়া যায়। রাজনৈতিক পর্যায় থেকে সেই চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর খোদ অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকেই নতুন করে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আজ বলতে দ্বিধা নেই যে, একটি অসাংবিধানিক উপায়ে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে এসে আমার জায়গায় বসানোর চক্রান্ত করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি বিষয়টি জানতে পেরেছি। সরকারের একজন উপদেষ্টা ওই বিচারপতির কাছে গিয়েছিলেন। তাঁরা এক ঘণ্টা ধরে বৈঠক করেন। তবে ওই বিচারপতি রাজি হননি। তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে—উনি (সাহাবুদ্দিন) রাষ্ট্রপতি, সাংবিধানিকভাবে তিনি সবার উপরে। ওই জায়গায় আমি অসাংবিধানিকভাবে বসতে পারি না। সেই বিচারপতির দৃঢ় অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত সরকারের ওই চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।’
![]() |
| রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে চলা আন্দোলনের মধ্যে বঙ্গভবনের প্রবেশ পথে কয়েক স্তরের নিরাপত্তার মধ্যে সেনা সদস্যদের নজরদারি | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
কালের কণ্ঠ জানতে চায়—সেই কঠিন সময়ে রাষ্ট্রপ্রধানের দৃঢ় মনোবলের পেছনে কী ছিল বা কেউ তাঁকে সাহস জুগিয়েছিল কি না?
জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘সত্যি বলতে, অনেকের আশ্বাস বা অভয় না পেলে একা আমার পক্ষে মনোবল ঠিক রাখা কঠিন হতো। বিশেষ করে বিএনপির সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আমাকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে আমি যেন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় অটল থাকি। কোনো অবৈধ উপায়ে রাষ্ট্রপতি সরানোর পক্ষে তাঁরা ছিলেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ ছাড়া তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে আমাকে সর্বোচ্চ সমর্থন দেওয়া হয়েছে। তাঁরা শুধু একটা কথাই বলেছেন—মহামান্য, আপনি হচ্ছেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। আপনার পরাজিত হওয়া মানে পুরো সশস্ত্র বাহিনীরই পরাজিত হওয়া। এটি আমরা যেকোনো মূল্যে ঠেকাব। তাঁরা বিভিন্ন সময়ে আমার কাছে এসে আমাকে সাহস দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতর থেকে আরেকবার আমাকে সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে শুনেছি। তখনও তিন বাহিনীর প্রধানরা আমার পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁরা তাঁদের এই মত প্রধান উপদেষ্টাকে গিয়ে জানান যে, কোনো অসাংবিধানিক কাজ তাঁরা হতে দেবেন না। বঙ্গভবনের সামনে যখন অনাকাঙ্ক্ষিত ভিড় বা জটলা (মব) তৈরি করা হয়, তখনও সশস্ত্র বাহিনী এই শক্ত অবস্থানে ছিল।’
ইউনূসের ভূমিকা কী ছিল
কালের কণ্ঠের একটি প্রশ্ন ছিল—অপসারণ চেষ্টার বিষয়ে রাষ্ট্রপতি তখনকার প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন কি না?
জবাবে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘ওই পরিস্থিতিতে ড. ইউনূসের কাছ থেকে কোনো ফোন পাইনি। তিনি আমার পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো অবস্থানেই ছিলেন না। অবশ্য আমিও তাঁর কাছে সাহায্য চেয়ে কোনো অনুরোধ করিনি। আমার মনোভাব ছিল—যা হচ্ছে হতে থাকুক, দেখা যাক কতদূর গড়ায়। তবে এটুকু বলতে পারি যে, কূটনৈতিক মহল থেকেও আমাকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে নেতিবাচক অবস্থান ছিল। আমি এভাবে অসাংবিধানিক ও বেআইনিভাবে অপসারিত হই, সেটি তাঁরাও চাননি। এটিও বড় শক্তি ছিল। তবে আমি সবসময় স্বীকার করি যে, বিএনপি ও তাঁদের জোট অন্যের প্ররোচনায় পা দেয়নি। তাঁরা নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।’
রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টা কি রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সমন্বয় করেছিলেন?
এ প্রশ্নের উত্তরে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টা সংবিধানের কোনো নিয়ম মেনে চলেননি। সংবিধানে বলা আছে, তিনি যখনই বিদেশ সফরে যাবেন, সেখান থেকে ফিরে এসে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করবেন এবং সফরের ফলাফল বা অর্জন সম্পর্কে আমাকে জানাবেন। কী আলোচনা হলো, কোনো চুক্তি হলো কি না বা কী ধরনের কথাবার্তা হলো—এসব আমাকে লিখিতভাবে জানানোর কথা। কিন্তু তিনি প্রায় ১৪ থেকে ১৫ বার বিদেশ সফরে গেলেও একবারও আমাকে জানাননি বা আমার কাছে আসেননি।’
![]() |
| ২০২৪ সালের ৮ অগাস্ট রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে প্রধান উপদেষ্টার শপথ নেন মুহাম্মদ ইউনূস | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
কালের কণ্ঠ জানতে চায়—তার মানে নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে সর্বশেষ চুক্তিটি হয়েছে, সে বিষয়েও কি আপনি কিছু জানেন না?
জবাবে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘না, কোনো কিছুই আমি জানি না। এ ধরনের রাষ্ট্রীয় একটি চুক্তি সম্পর্কে অবশ্যই আমাকে জানানো প্রয়োজন ছিল। চুক্তি ছোট হোক বা বড়, আগের সব সরকারপ্রধানই রাষ্ট্রপতিকে এ বিষয়ে জানাতেন। এটি একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। কিন্তু তিনি (প্রধান উপদেষ্টা) তা করেননি। মৌখিকভাবে বা লিখিতভাবে—কোনোভাবেই আমাকে জানাননি। এমনকি তিনি আমার কাছে আসেনওনি, যদিও নিয়ম অনুযায়ী তাঁর আসার কথা ছিল।’
সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীরা জানতে চান—তার মানে গত দেড় বছরে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আপনার স্বাভাবিক সম্পর্ক বা কাজের সমন্বয় ছিল না?
জবাবে রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, ‘তিনি যে প্রধান উপদেষ্টা হলেন, সেই প্রক্রিয়ার শুরুটা হয়েছিল আমার মাধ্যমেই। অর্থাৎ আমার উদ্যোগেই এই সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টা পরবর্তী সময়ে আমার সঙ্গে সেভাবে সমন্বয় করেননি। এটি আসলে বলে বোঝানোর উপায় নেই, কারণ তিনি একটিবারের জন্যও আমার কাছে আসেননি। আমাকে সম্পূর্ণভাবে আড়ালে রাখার চেষ্টা করেছেন। এমনকি তিনি আমার দুটি বিদেশ সফরও আটকে দিয়েছেন।’
বিদেশ সফর আটকানোর একটি ঘটনা তুলে ধরে মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘কাতারের আমির আমাকে একটি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য দাওয়াত দিয়েছিলেন। সেখানে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়ার কথা ছিল এবং সেই সম্মেলনে রাষ্ট্রপতি ছাড়া অন্য কেউ থাকতে পারবেন না। তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমার কাছে একটি চিঠির খসড়া পাঠানো হয়। সেই চিঠিতে লেখা ছিল—আমি রাষ্ট্রীয় কাজে ভীষণ ব্যস্ত, তাই এই সম্মেলনে যোগ দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি যেন সেই চিঠিতে সই করে দিই।’
কালের কণ্ঠ জানতে চায়—আপনি কি সত্যিই রাষ্ট্রীয় জরুরি কাজে ব্যস্ত ছিলেন?
হেসে মো. সাহাবুদ্দিন উত্তর দেন, ‘আমাদের সংবিধান অনুযায়ী একজন রাষ্ট্রপতি কি এত বেশি ব্যস্ত থাকেন? যাই হোক, পরে আমি ওই চিঠিতে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন দিয়ে সেটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠাই। আমি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এমন শিষ্টাচারবিরোধী ও ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণের তীব্র নিন্দা জানাই এবং ভবিষ্যতে যেন এমনটি না করা হয়, সে বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে চিঠি দিই। ওই চিঠির কোনো জবাব তাঁরা দেননি। এরপর অন্য কোনো দেশ থেকে আমন্ত্রণ এসেছিল কি না, তা জানার সুযোগও আমার হয়নি।’
কেবল বিদেশ সফর নয়, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমাবর্তন অনুষ্ঠানেও প্রথা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির যাওয়ার কথা থাকলেও তা আটকানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন রাষ্ট্রপ্রধান।
ছবি সরিয়ে ফেলা
‘অপমানিত’ হওয়ার আরেকটি ঘটনা তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘একদিন একজন উপদেষ্টা বিদেশ ভ্রমণে গিয়ে সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাসে আমার ছবি লাগানো দেখেন। সারা বিশ্বের সব দূতাবাসে রাষ্ট্রপতির ছবি থাকাটাই নিয়ম, কারণ রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন। এটি বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। কিন্তু ওই উপদেষ্টা সেখানে গিয়ে দূতাবাস প্রধানকে গালিগালাজ করেন এবং প্রশ্ন তোলেন কেন এই ছবি থাকবে। এরপর এক রাতের মধ্যে সারা বিশ্বের সব দূতাবাস ও মিশন থেকে আমার ছবি নামিয়ে ফেলা হলো। দীর্ঘদিনের একটি নিয়ম রাতারাতি শেষ করে দেওয়া হলো। ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে আসার পর আমি তা জানতে পারি।’
![]() |
| বিদেশের মিশনগুলো থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি নামানোর উদ্যোগের মধ্যে গত ১৭ অগাস্ট বিকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্যাফেতে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের ছবি দেখা যায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
রাষ্ট্রপ্রধান বলতে থাকেন, ‘তখন আমার মনে হয়েছে যে এটি সম্ভবত আমাকে সরিয়ে দেওয়ার প্রথম ধাপ। তাই পরবর্তী ধাপে হয়তো আমাকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে—এমন আশঙ্কায় আমি নিজেকে প্রস্তুত রাখতে শুরু করি। এ ছাড়া এসব কর্মকাণ্ডের ফলে সাধারণ মানুষের কাছেও একটি নেতিবাচক বার্তা যায় যে রাষ্ট্রপতিকে আর রাখা হচ্ছে না। এত কিছুর পরও আমি শুধু সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে গেছি।’
'প্রচার বিভাগকে পুরোপুরি খালি করে দেওয়া হলো'
আলাপকালে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ‘একবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নির্বাচনে জয়ী কমিটির সদস্যরা আমার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। আমি সাংবাদিকবান্ধব মানুষ হিসেবে তাঁদের সঙ্গে দেখা করি। সেটি ছিল খুবই সাধারণ একটি সাক্ষাৎ। আমাদের মধ্যে অল্প কিছু কথাবার্তা ও ছবি তোলা হয়। ওই ঘটনাটি পরদিন কয়েকটি পত্রিকায় ছাপা হলে প্রধান উপদেষ্টার প্রচার বিভাগ (প্রেস উইং) তা সহজভাবে নেয়নি। বঙ্গভবনের প্রচার বিভাগের কে এই খবর ও ছবি পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে, তা তাঁরা জোর দিয়ে খুঁজতে শুরু করেন।’
![]() |
| বঙ্গবভনের প্রেস ডিপার্টমেন্টকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন রাষ্ট্রপতি | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘আসলে প্রচার বিভাগের (প্রেস উইং) কেউ এই কাজ করেনি। আমি নিজেই সাংবাদিকদের চিঠি পেয়ে তাঁদের আসতে বলেছিলাম। কিন্তু তারা অত্যন্ত নির্লজ্জভাবে এখান থেকে তিনজন মানুষকে সরিয়ে দিল। প্রচার সচিব (প্রেস সেক্রেটারি), উপ-প্রচার সচিব এবং সহকারী প্রচার সচিব—তিনজনকেই সরিয়ে দেওয়া হলো। পুরো বিভাগটাই তারা খালি করে দিল।’
কালের কণ্ঠ প্রশ্ন করে—আপনার কি এখন কোনো প্রচার বিভাগ নেই?
জবাবে রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, ‘না। তিনজনকেই নিয়ে গেছে। এমনকি দুজন আলোকচিত্রী (ফটোগ্রাফার) ছিলেন, যাঁরা ৩০ বছর ধরে এখানে কাজ করছিলেন, তাঁদেরও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রচার বিভাগকে একদম শূন্য করে দেওয়া হলো। আমরা এখান থেকে কোনো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও দিতে পারি না। বাংলাদেশের ক্রিকেট দল কোথাও জিতলে অভিনন্দন জানিয়ে যে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেব, সেই উপায়ও নেই। একদম হাত-পা বেঁধে দেওয়া বা অচল করে দেওয়ার মতো অবস্থা করা হয়েছে। আমি রাষ্ট্রপতি হয়ে নিজে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে বারবার ফোন করেছি, প্রধান সচিব ও জনপ্রশাসন (এস্টাবলিশমেন্ট) সচিবকে ফোন করেছি; কিন্তু কেউই পাত্তা দেয়নি।’







Comments
Comments