[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

এক কাতারে সব শ্রমজীবী মানুষ

প্রকাশঃ
অ+ অ-
প্রতিবছরের মতো খুলনা ফুড ব্যাংক আয়োজন করে পথচারীদের ইফতারের। খুলনা নগরের ব্যস্ততম শিববাড়ী মোড়ে মঙ্গলবার ১২০ জনের ইফতারের আয়োজন করা হয় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন    

খুলনা নগরের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা শিববাড়ী মোড়। শহরের ব্যস্ততা তখনো থামেনি। ইজিবাইকের হর্ন, রিকশার ঘণ্টার শব্দ আর মানুষের ছুটে চলা—সব মিলিয়ে চারদিকে তুমুল শোরগোল। মেঘলা আকাশে সূর্য ধীরে ধীরে ডুবছে। ঠিক সেই ব্যস্ততার মধ্যেই ফুটপাতে বিছানো সবুজ ত্রিপল, তার ওপর সাজানো সারি সারি প্লেট। কলা, খেজুর, জিলাপি, ছোলা, পেয়ারা, গাজর, আলুর চপ, বেগুনি ও পিঁয়াজু—সবই যেন আমন্ত্রণ জানাচ্ছে ক্লান্ত পথচারীদের। পাশে সাজানো রয়েছে শরবত ও পানির বোতল।

ধীরে ধীরে ভিড় জমছে রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ইজিবাইকচালক ও পথচারীদের। কেউ ফুটপাতে বসে পড়ছেন, কেউ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন মাগরিবের আজানের জন্য। মঙ্গলবার বিকেলে রমজানের শেষ মুহূর্তে ফুটপাতে দেখা যাচ্ছিল এক শান্ত ও মন ভরানো প্রস্তুতি।

রমজানে জীবিকার তাগিদে যাঁদের ইফতারের সময়ও রাস্তায় থাকতে হয়, মূলত তাঁদের জন্যই এই আয়োজন। খুলনা ফুড ব্যাংক ও খুলনা ব্লাড ব্যাংকের স্বেচ্ছাসেবকেরা প্রতিদিন নগরের বিভিন্ন এলাকায় বিনা মূল্যে এই ইফতারের আয়োজন করছেন।

পাশেই রেলস্টেশন থেকে ভেসে আসা সাইরেনের শব্দ আর মসজিদের আজানের ধ্বনি কানে আসতেই সবাই একসঙ্গে পানি মুখে দেন। কেউ কারও নাম জানেন না, তবু সবাই একই জায়গায় বসে ইফতার করছেন। অপরিচিত হলেও সবাই যেন এক কাতারের আপনজন। ইফতারের সময় কেউ দোয়া করছেন, কেউবা ভাগ করে নিচ্ছেন তাঁদের ঈদের পরিকল্পনা।

আয়োজকেরা জানান, প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ জন রোজাদারের জন্য ইফতার প্রস্তুত করা হয়। এতে খরচ হয় সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে সাত হাজার টাকা। পুরো রমজান মাস এই কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।

খুলনা ফুড ব্যাংকের অর্থ সম্পাদক মো. আসাদ শেখ বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো রাস্তায় থাকা রোজাদারদের সম্মানজনকভাবে ইফতার নিশ্চিত করা। দিনমজুর, চালক ও পথচারী—যাঁদের ইফতারের সময়ও কাজ করতে হয়, তাঁদের পাশে দাঁড়ানোই আমাদের মূল উদ্দেশ্য। এ বছর শিববাড়ী মোড় ছাড়াও পাবলিক কলেজ মোড়ে এই আয়োজন করেছি। আমাদের পরিকল্পনা আছে দৌলতপুর নতুন রাস্তা, রয়েল মোড় ও রেলওয়ে স্টেশনেও ইফতারের কার্যক্রম শুরু করার।’

সংগঠনের সদস্যরা জানান, রাস্তায় ইফতার বিতরণের পাশাপাশি তাঁদের উদ্যোগে ইফতারসামগ্রীর বস্তাও দেওয়া হচ্ছে। এ বছর ইতিমধ্যে প্রায় ৬০০ পরিবারকে এই উপহার দেওয়া হয়েছে, তাঁদের লক্ষ্য ২ হাজার জনের কাছে পৌঁছানো। প্রতিটি বস্তায় থাকছে এক কেজি তেল, এক কেজি লবণ, দুই কেজি পেঁয়াজ, পাঁচ কেজি আলু এবং এক কেজি করে ছোলা, মুড়ি ও চিনি। দরিদ্র রোজাদারদের ঠিকানা সংগ্রহ করে গোপনে তাঁদের বাড়িতে এসব পৌঁছে দেওয়া হয়। এ ছাড়া মসজিদের ইমাম ও মোয়াজ্জিনদের জন্যও ইফতারসামগ্রী দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

খুলনা ফুড ব্যাংক, ব্লাড ব্যাংক ও অক্সিজেন ব্যাংকের সভাপতি সালেহ্ উদ্দিন (সবুজ) বলেন, ‘আমরা মূলত অসহায় মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করি। রমজানজুড়ে আমাদের অনেক কার্যক্রমের মধ্যে রাস্তায় থাকা মানুষের জন্য ইফতারের আয়োজনটি অন্যতম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের শুভাকাঙ্ক্ষীরা যুক্ত আছেন। তাঁদের কেউ ১০০ জন আবার কেউ ১৫০ জনের ইফতারের খরচ বহন করেন।’

সালেহ্ উদ্দিন আরও বলেন, করোনার সময় থেকে প্রতিবছর এই কার্যক্রম চলছে। শুরুর দিকে ২০ থেকে ৫০ জনের আয়োজন থাকলেও এখন এর পরিধি বেড়েছে। প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ জনকে ইফতার দেওয়া হচ্ছে। এবার এক দিনে ৫০০ জনকে ইফতার করানোর একটি পরিকল্পনাও রয়েছে।

শিববাড়ীতে ইফতার করতে আসা নির্মাণশ্রমিক মোহাম্মদ বিল্লাল বলেন, ‘সারা দিন কাজে ব্যস্ত থাকি। অনেক সময় সময়মতো বাসায় গিয়ে ইফতার করা সম্ভব হয় না। এখানে ইফতারের ব্যবস্থা থাকায় খুব উপকার হয়।’

এক ভ্যানচালক বলেন, ‘এখানে ইফতারের ব্যবস্থা থাকায় অন্তত এই আয়োজনটি নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। আল্লাহ যেন তাঁদের ভালো রাখেন।’

ইফতার শেষে সবাই ধীরে ধীরে নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা হন। কেউ মসজিদে নামাজ পড়তে যান, কেউ আবার দ্রুত কাজে ফিরে যান। ফুটপাতের ওই সবুজ ত্রিপল আর সারি সারি প্লেটগুলো তখনো পড়ে ছিল মানবিকতার এক উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন