অসময়ে টেকনাফের বাজারে ‘বুক সেলাই’ আম, কেজি ৫০০ টাকা
![]() |
| চাহিদা থাকায় চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে এই আম। সম্প্রতি তোলা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
মাঝারি আকারের আম, একপাশে লম্বালম্বি একটি দাগ। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘বুক সেলাই’ আম নামে পরিচিত। যখন দেশের মানুষ গাছে আমের মুকুলের অপেক্ষায় থাকে, তখন গত ডিসেম্বর থেকেই কক্সবাজারের টেকনাফের ফলের দোকানগুলোতে শোভা পাচ্ছে এই আম। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহেও বাজারে এই আম দেদার বিক্রি হচ্ছে। পবিত্র রমজান মাসের কারণে ইফতারির তালিকায় রাখতে অনেকেই চড়া দামে এই আম কিনছেন। প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায়।
কৃষিবিদদের মতে, এটি স্থানীয় একটি বারোমাসি আমের জাত। দেশের অন্য কোথাও সচরাচর এই আম দেখা যায় না। কেবল টেকনাফের বিশেষ আর্দ্র আবহাওয়ার কারণেই এই সময়ে ফলন পাওয়া সম্ভব হয়।
টেকনাফ বাসস্টেশন বাজারের ‘মামা-ভাগিনা’ ফলের দোকানে সবচেয়ে বেশি কাঁচা আম বিক্রি হয়। দোকানের মালিক মো. ইউনুস ও শাহ জাহান জানান, গত পাঁচ বছর ধরে তাঁরা ফলের পাশাপাশি এই আগাম আম বিক্রি করছেন। গত সাত দিনে টেকনাফের বাহারছড়া, কচ্ছপিয়া ও সাবরাং এলাকা থেকে তাঁরা প্রায় ১২ লাখ টাকার কাঁচা আম কিনেছেন। এসব আমের বড় একটি অংশ ইতিমধ্যে ঢাকায় সরবরাহ করা হয়েছে।
পৌরসভার রাস্তার পাশে ফুটপাতে কাঁচা আম বিক্রি করেন বাদশা মিয়া। ক্রেতাদের আকর্ষণ করতে তিনি সুতায় আম বেঁধে বাঁশের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখেন। বাদশা মিয়া জানান, টেকনাফের এই আগাম আম এখন কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতেও বিক্রি হচ্ছে। পর্যটকেরা অসময়ের এই নতুন ফল শখ করে চড়া দামে কিনে খাচ্ছেন।
টেকনাফের সাবরাং ইউনিয়নের নয়াপাড়ার কৃষক দিল মোহাম্মদ জানুয়ারি মাসেই সাত লাখ টাকার কাঁচা আম বিক্রি করেছেন। প্রতি কেজি আম তিনি বিক্রি করেছেন ৫৫০ টাকা দরে।
৫৭ বছর বয়সী দিল মোহাম্মদ জানান, ১৩ বছর আগে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু শহরের সিকদারপাড়ায় বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে পাহাড়ের নিচে এই জাতের আমের বাগান দেখে তাঁর পছন্দ হয়। সেখান থেকে তিনি পাঁচ কেজি পাকা আম কিনে আনেন। পরে কৃষি বিভাগের পরামর্শ নিয়ে সেই আমের আঁটি থেকে চারা তৈরি করে রোপণ করেন। পাঁচ বছরের মাথায় বেশির ভাগ গাছে মুকুল আসতে শুরু করে।
দিল মোহাম্মদ আরও জানান, প্রথম বছর ১৭টি গাছ থেকে ৬৮৪টি কাঁচা আম পাওয়া গিয়েছিল। বর্তমানে তাঁর ৪২টি গাছে কয়েক হাজার আম ধরেছে। এই জাতের আম বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা গেলে কৃষকেরা অনেক লাভবান হবেন বলে তিনি মনে করেন।
শীতের সময়েই কেন টেকনাফের বাজারে আগাম আম পাওয়া যাচ্ছে, সে বিষয়ে টেকনাফ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির বলেন, এটি সম্ভবত বারোমাসি আমেরই কোনো জাত। তবে টেকনাফের আবহাওয়ায় জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকায় নির্দিষ্ট সময়ের অন্তত দুই মাস আগেই এই আম বাজারে চলে আসে।
টেকনাফের বাজারে আসা এই আম দেখতে রাংগুয়াই জাতের মতো হলেও কৃষি কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবির নিশ্চিত করেছেন যে এটি সেই জাত নয়। তিনি জানান, রাংগুয়াই আম সাধারণত মৌসুমের একেবারে শেষের দিকে পাকে। কিন্তু এই আমটি একটি স্থানীয় জাত, যা টেকনাফের বাইরে কোথাও দেখা যায়নি। বাজারে প্রচুর চাহিদা থাকায় কৃষকেরা কাঁচা অবস্থাতেই এটি বিক্রি করে দেন। ফলে এই আম পাকার পর কেমন হয়, তা এখনো তাঁদের জানা নেই।
সময়ের আগে ফলন দেওয়ার কারণ সম্পর্কে হুমায়ুন কবির বলেন, দেশে 'কাটিমন' নামের একটি বারোমাসি আমের জাত আছে যা সারা বছর ফল দেয়। এই আমটিও অনেকটা তেমন। তবে এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এটি স্থানীয় আবহাওয়ায় জন্মায়। তিনি আরও জানান, এই আমের কলম নিয়ে অন্য এলাকায় লাগানো হলেও সেখানে এমন আগাম ফলন পাওয়া যায়নি। তাই ধারণা করা হচ্ছে, টেকনাফের স্থানীয় আবহাওয়া এই দ্রুত ফলনের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন।
কৃষি, বন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে আমের ফলনে এমন প্রভাব পড়তে পারে। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা জানান, টেকনাফ বাংলাদেশের একেবারে দক্ষিণে সমুদ্রের কাছে অবস্থিত। দেশের উত্তর বা মধ্যাঞ্চলের চেয়ে এখানকার তাপমাত্রা ও বাতাসের আর্দ্রতা কিছুটা বেশি থাকে। ফলে দেশের অন্য এলাকায় যখন শীতের আমেজ চলে, টেকনাফে তখনই আমগাছে মুকুল চলে আসে। বেশি তাপমাত্রার কারণে মুকুল থেকে গুটি এবং গুটি থেকে আম বড় হওয়ার প্রক্রিয়াটিও খুব দ্রুত শেষ হয়। তবে এ বিষয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপসহকারী কর্মকর্তা আশীষ কুমার বলেন, উপকূলীয় এলাকার মাটিতে লবণের উপস্থিতি গাছের হরমোনের ওপর প্রভাব ফেলে। অনেক সময় এটি গাছকে দ্রুত ফল দিতে উৎসাহিত করে। এই বিশেষ আবহাওয়া বা ‘ক্ষুদ্র জলবায়ু’র (মাইক্রো ক্লাইমেট) কারণেই টেকনাফের আম অন্তত দেড় থেকে দুই মাস আগে পরিপক্ব হয়।

Comments
Comments