৭ আসনে এনসিপির বিরুদ্ধে জামায়াত-খেলাফত প্রার্থীরাও মাঠে
![]() |
| জামায়াত ও এনসিপির লোগো | কোলাজ |
জাতীয় রাজনীতিতে নতুন শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের সঙ্গে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে এসব প্রার্থী দেওয়া হয়েছে। তবে এরপরও সাতটি আসনে জামায়াতসহ জোটের শরিক আরও দুটি দলের প্রার্থীরা মাঠে রয়ে গেছেন। এতে নবীন দল এনসিপির তরুণ প্রার্থীদের ভোটের লড়াই আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
দলীয় সূত্র জানায়, এসব আসনে জোটভুক্ত প্রার্থীদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। তারা যেন নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় না থাকেন, সে জন্য চেষ্টা করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম-৮ ও নরসিংদী-২ আসনে এনসিপির প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছেন জামায়াতের প্রার্থীরা। নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে এনসিপির বিপক্ষে লড়ছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী। ঢাকা-২০ ও রাজবাড়ী-২ আসনেও খেলাফত মজলিসের প্রার্থীরা নির্বাচনী মাঠে আছেন। সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে এনসিপির প্রতিপক্ষ হিসেবে রয়েছেন এবি পার্টির প্রার্থী। এ ছাড়া মৌলভীবাজার-৪ আসনকে উন্মুক্ত ঘোষণা করেছে এনসিপি। এখানে সমঝোতার ভিত্তিতে এনসিপির পাশাপাশি বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থীও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সেক্রেটারি মনিরা শারমিন বলেন, ‘আমাদের প্রার্থীরা তরুণ। অন্যান্য দলের মতো আমাদের বেশি কোটিপতি প্রার্থী নেই। তবে আমাদের প্রার্থীরা মানুষের সমর্থন নিয়ে গণ-অভ্যুত্থান থেকে উঠে এসেছেন। নির্বাচনী মাঠে জনগণই শেষ কথা। তাঁরাই শাপলা কলির প্রার্থীদের জিতিয়ে আনবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির প্রার্থী তালিকা দলটির সাংগঠনিক বিস্তার ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিত দেয়। তবে মাঠের রাজনীতিতে দলটি এখনো নবীন। দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত দল, স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা ও ভোটের অঙ্ক—সব মিলিয়ে নির্বাচনী মাঠে এনসিপির সামনে কঠিন লড়াই অপেক্ষা করছে। বিএনপির কাছ থেকেও দলটি কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাচ্ছে। পাশাপাশি নিজেদের জোটভুক্ত দল, অর্থাৎ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের প্রার্থীরাও কয়েকটি আসনে এনসিপির প্রতিপক্ষ হিসেবে থাকছেন। এ ছাড়া কিছু আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও এনসিপির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১ আসন থেকে প্রার্থী হয়েছেন। রাজধানীর এই আসনটি বরাবরই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে বড় দলগুলোর শক্ত অবস্থান রয়েছে। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী এম এ কাইয়ুম, যিনি দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত রাজনীতিবিদ। স্থানীয় সংগঠন, ভোটব্যাংক ও অর্থনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে নাহিদ ইসলামের জন্য এই লড়াই সহজ হবে না বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা।
ঢাকা-৮ আসনে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সামনে বাস্তবতা আরও কঠিন। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী প্রবীণ রাজনীতিবিদ মির্জা আব্বাস। তিনি ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সে সময় তিনি যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। একই বছর তিনি অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র নিযুক্ত হন। এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদের বিপরীতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর লড়াইকে অনেকেই অসম মনে করছেন।
রংপুর-৪ আসন থেকে এনসিপির প্রার্থী হয়েছেন দলের সদস্যসচিব আখতার হোসেন। তিনি পরিচিত মুখ হলেও স্থানীয় রাজনীতিতে এনসিপির সাংগঠনিক শক্তি এখনো পুরোপুরি পরীক্ষিত নয়। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ এমদাদুল হক ভরসা। পাশাপাশি জাতীয় পার্টির প্রার্থী আবু নাসের শাহ মো. মাহবুবার রহমানও এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, খেলাফত মজলিসসহ আরও কয়েকটি দলের প্রার্থীরাও এই আসনে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
এনসিপি যেসব আসনে জয়ের সম্ভাবনা দেখছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য নোয়াখালী-৬ আসন। এখানে দলটির প্রার্থী জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ। এই আসনে তাঁর বিপক্ষে রয়েছেন শক্তিশালী দুজন স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ ফজলুল আজিম ও তানবীর উদ্দিন রাজিব। পাশাপাশি বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ মাহবুবের রহমান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম শরীফসহ আরও কয়েকটি দলের প্রার্থীও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন। এ ছাড়া আবদুল হান্নান মাসউদের বাবা আমিরুল ইসলাম মো. আবদুল মালেকও এই আসনে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির (বিএসপি) প্রার্থী। ফলে নোয়াখালী-৬ আসনে বাবা ও ছেলে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নির্বাচনী লড়াইয়ে রয়েছেন।
দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ কুমিল্লা-৪ আসন থেকে এবং উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম পঞ্চগড়-১ আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। দলের ভেতরে এই দুই নেতার সাংগঠনিক দক্ষতা স্বীকৃত হলেও নির্বাচনী মাঠে তাঁদের সামনে শক্ত প্রতিপক্ষ রয়েছে। তবে কুমিল্লা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর রিট আদালত খারিজ করে দিয়েছেন। ফলে তিনি ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে হাসনাত আবদুল্লাহ তুলনামূলক স্বস্তিতে থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এনসিপির আরেক মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম পঞ্চগড়-১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর কাছ থেকে ছাড় পেয়েছেন। তবে বিএনপির প্রার্থী নওশাদ জমীর তাঁর জন্য কঠিন প্রতিপক্ষ হতে পারেন বলে মনে করা হচ্ছে।
এ ছাড়া এনসিপির ঘোষিত অন্যান্য প্রার্থীরা হলেন—দিনাজপুর-৫ আসনে (পার্বতীপুর ও ফুলবাড়ী উপজেলা) মো. আব্দুল আহাদ, কুড়িগ্রাম-২ আসনে (কুড়িগ্রাম সদর, ফুলবাড়ী ও রাজারহাট উপজেলা) আতিকুর রহমান মোজাহিদ, নাটোর-৩ আসনে (সিংড়া উপজেলা) এস এম জার্জিস কাদির, সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে (শাহজাদপুর উপজেলা) এস এম সাইফ মোস্তাফিজ, পিরোজপুর-৩ আসনে (মঠবাড়িয়া উপজেলা) মো. শামীম হামিদী, টাঙ্গাইল-৩ আসনে (ঘাটাইল উপজেলা) সাইফুল্লাহ হায়দার, ময়মনসিংহ-১১ আসনে (ভালুকা উপজেলা) জাহিদুল ইসলাম, নেত্রকোনা-২ আসনে (নেত্রকোনা সদর ও বারহাট্টা উপজেলা) ফাহিম রহমান খান পাঠান।
এ তালিকায় আরও রয়েছেন—মুন্সিগঞ্জ-২ আসনে (লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলা) মাজেদুল ইসলাম, ঢাকা-৯ আসনে (খিলগাঁও, সবুজবাগ ও মুগদা থানা) মোহাম্মদ জাবেদ মিয়া, ঢাকা-১৮ আসনে (উত্তরা, উত্তরখান, দক্ষিণখান, তুরাগ ও খিলক্ষেত থানা) আরিফুল ইসলাম, ঢাকা-১৯ আসনে (সাভার) দিলশানা পারুল, ঢাকা-২০ আসনে (ধামরাই) নাবিলা তাসনিদ, গাজীপুর-২ আসনে (সিটি করপোরেশনের একাংশ ও সেনানিবাস এলাকা) আলী নাছের খান।
এ ছাড়া নরসিংদী-২ আসনে (পলাশ উপজেলা ও সদর উপজেলার আংশিক) মো. গোলাম সারোয়ার, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে (সদর উপজেলার আংশিক) আব্দুল্লাহ আল আমিন, রাজবাড়ী-২ আসনে (পাংশা, কালুখালী ও বালিয়াকান্দি উপজেলা) জামিল হিজাযী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে (সরাইল ও আশুগঞ্জ উপজেলা) আশরাফ উদ্দিন মাহদি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে (ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর ও বিজয়নগর উপজেলা) আতাউল্লাহ প্রার্থী হয়েছেন।
নোয়াখালী-২ আসনে (সেনবাগ উপজেলা ও সোনাইমুড়ী উপজেলার আংশিক) সুলতান মুহাম্মদ জাকারিয়া, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে (রামগঞ্জ উপজেলা) মো. মাহবুব আলম, চট্টগ্রাম-৮ আসনে (বোয়ালখালী উপজেলা ও চান্দগাঁও-পাঁচলাইশ এলাকা) মো. জোবাইরুল হাসান আরিফ, বান্দরবান আসনে (বান্দরবান পার্বত্য জেলা) আবু সাঈদ মো. সুজাউদ্দিন এবং মৌলভীবাজার-৪ আসনে (শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা) প্রীতম দাস এনসিপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

Comments
Comments