[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

ভারতে বিশ্বকাপ না খেলার সিদ্ধান্ত, অনিশ্চয়তার মেঘে দেশের ক্রিকেট

প্রকাশঃ
অ+ অ-
টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিসিবি | ফাইল ছবি

‘মোস্তাফিজুর রহমান’ ঘটনাটি আসলে একটি উপলক্ষ মাত্র। পুরো ঘটনার পেছনে রয়েছে রাজনীতি। কিছু উগ্র রাজনৈতিক শক্তির প্রভাবেই ৯ কোটি ২০ লাখ রুপি দামের মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দিয়েছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)ও কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। নিরাপত্তার আশঙ্কার কথা তুলে ধরে তারা গতকাল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে (আইসিসি) আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করেছে, আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে অন্য কোনো দেশে আয়োজন করতে।

এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ হবে ভারত ও শ্রীলঙ্কায়। টুর্নামেন্ট শুরু হবে ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে। ‘সি’ গ্রুপে থাকা বাংলাদেশ দলের তিনটি ম্যাচ হওয়ার কথা কলকাতার ইডেন গার্ডেনে এবং একটি ম্যাচ মুম্বাইয়ে। তবে বিসিবির মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের কোনো শহরেই বাংলাদেশ দল নিরাপদ নয়। শুধু খেলোয়াড় নয়, খেলা হলে বোর্ডের কর্মকর্তা, দর্শক ও সাংবাদিকদেরও সেখানে যেতে হবে। বিসিবির আশঙ্কা, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ক্রিকেট–সংশ্লিষ্ট কেউই ভারতে নিরাপদ থাকবেন না। 

পরশু বিসিসিআইয়ের নির্দেশে মোস্তাফিজকে দল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় কলকাতা নাইট রাইডার্স কর্তৃপক্ষ। তার আগে গুয়াহাটিতে বিসিসিআইয়ের সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া বার্তা সংস্থা এএনআইকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক ঘটনার কারণে বিসিসিআই কেকেআর ফ্র্যাঞ্চাইজিকে তাদের দলে থাকা বাংলাদেশের খেলোয়াড় মোস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।’
আইসিসিকে এ বিষয়ে জানিয়ে গতকাল এক ই-মেইলে বিসিবি লিখেছে, ভারতের বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ দলের নিরাপত্তা নিয়ে জোরালো সংশয় তৈরি হয়েছে। সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এবং বাংলাদেশ সরকারের পরামর্শ বিবেচনায় নিয়ে বোর্ড এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, এ অবস্থায় জাতীয় দলকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে ভারত পাঠানো হবে না। বোর্ডের মতে, খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ, কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এমন পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। চিঠিতে ভারতে অনুষ্ঠিতব্য বাংলাদেশের সব ম্যাচ অন্য কোনো দেশে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিসিবির আশা, পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আইসিসি দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে।

এর আগে এ বিষয়টি নিয়ে বিসিবির পরিচালকেরা দুই দফা সভা করেছেন। পরশু রাতে হওয়া অনলাইন সভায় সরাসরি কঠোর কোনো অবস্থানে না যাওয়ার পক্ষে মত দেন বেশির ভাগ পরিচালক। তখন সিদ্ধান্ত হয়েছিল, ভারতে নিরাপত্তাশঙ্কার কথা উল্লেখ করে বিশ্বকাপ চলাকালে সেখানকার নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইবে বোর্ড। আইসিসি যদি বাংলাদেশ দলকে কঠোর নিরাপত্তার আশ্বাস দেয়, তখনও দল–সংশ্লিষ্ট অন্যদের নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে অন্য কোনো দেশে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার কথাও সিদ্ধান্তে রাখা হয়।
মোস্তাফিজুর রহমান ও শশী থারুর | ফাইল ছবি

 কিন্তু পরশু রাতেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ‘উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কাছে নতি স্বীকার করে’ মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের নিন্দা জানান। তিনি লেখেন, ‘ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে আমি ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডকে (বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড) বলেছি, তারা যেন আইসিসির কাছে পুরো বিষয়টি ব্যাখ্যা করে লিখে। বোর্ড যেন জানিয়ে দেয় যে, যেখানে বাংলাদেশের একজন ক্রিকেটার চুক্তিবদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও ভারতে খেলতে পারেন না, সেখানে বাংলাদেশের গোটা ক্রিকেট দল বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া নিরাপদ মনে করতে পারে না। বোর্ড থেকে বাংলাদেশের বিশ্বকাপের খেলাগুলো শ্রীলঙ্কায় করার অনুরোধ জানানোর নির্দেশনাও আমি দিয়েছি।’
 

ভারতে কয়েক দিন ধরেই কিছু উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল ও ধর্মীয় সংগঠন মোস্তাফিজকে কলকাতা নাইট রাইডার্সের দলে নেওয়ার বিরোধিতা করে আসছিল। মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীর রিনমুক্তেশ্বর মহাদেব মন্দিরের প্রধান উপাসক মহাবীর নাথ বলেছেন, আইপিএলে বাংলাদেশের খেলোয়াড়কে খেলালে পিচ নষ্ট করে দেওয়া হবে।

এরপর গতকাল দুপুরে বিসিবির কার্যনির্বাহী কমিটির জরুরি সভায় সিদ্ধান্ত হয়, নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশ দল ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলবে না। ই-মেইলের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের কথা আইসিসিকে জানানো হয়। বিসিবির সভায় আগের ২৪ ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহ এবং সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে বোর্ডের পরিচালকেরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

একই ধরনের মনোভাব প্রকাশ করেছেন আরও অনেকে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘আইপিএলে মোস্তাফিজকে নিয়ে যা হয়েছে, সেটা ন্যক্কারজনক। এর মধ্যে বাংলাদেশের নাগরিকেরা ঘৃণার রাজনীতির চিত্র দেখেছেন এবং ব্যথিত হয়েছেন।’

মোস্তাফিজুর রহমান | ফাইল ছবি

সচিবালয়ের গণমাধ্যম কেন্দ্রে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘খেলাকে যদি খেলার জায়গায় রাখা যেত, তাহলে খুবই ভালো হতো; কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে খেলাটার ভেতরে রাজনীতি টেনে আনা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘চুপ করে বসে থাকার কোনো উপায় নেই। আমাদের একটা প্রতিক্রিয়া দেখাতেই হচ্ছে।’

এ বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি তাবিথ আউয়ালও। তিনি ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, ‘মোস্তাফিজ একজন বিশ্বমানের অ্যাথলেট। তিনি নিজের পারফরম্যান্স দিয়েই সেখানে জায়গা করে নিয়েছিলেন। শুধু জাতীয়তার কারণে তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করা একজন খেলোয়াড়ের প্রতি চরম অবিচার এবং অসহিষ্ণুতার প্রকাশ।’

 
জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক বোর্ড পরিচালক আকরাম খান সিদ্ধান্তটিকে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, ‘ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ভালো হয়েছে। খেলোয়াড়েরা যদি মানসিকভাবে স্বস্তিতে না থাকে, তাহলে পারফর্ম করা কঠিন।’
ভারতে গত কয়েক দিন ধরেই কিছু উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল ও ধর্মীয় সংগঠন মোস্তাফিজকে কলকাতা নাইট রাইডার্সের দলে নেওয়ার বিরোধিতা করে আসছিল। মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীর রিনমুক্তেশ্বর মহাদেব মন্দিরের প্রধান উপাসক মহাবীর নাথ বলেন, আইপিএলে বাংলাদেশের কোনো খেলোয়াড় খেললে পিচ নষ্ট করে দেওয়া হবে।

মোস্তাফিজকে দলে নেওয়ায় নাইট রাইডার্সের মালিক বলিউড তারকা শাহরুখ খানকে ‘গাদ্দার’ বা দেশদ্রোহী বলেও আখ্যা দেন উত্তর প্রদেশের শাসক দল বিজেপির নেতা সংগীত সোম। তিনি হুমকি দেন, মোস্তাফিজকে বিমানবন্দরের বাইরে পা রাখতে দেওয়া হবে না। একই ধরনের হুমকি দিয়েছেন আরও অনেকেই।

মূলত এসব চাপের মধ্যেই পরশু বিসিসিআইয়ের নির্দেশে মোস্তাফিজকে দল থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায় কলকাতা নাইট রাইডার্স কর্তৃপক্ষ। তার আগে গুয়াহাটিতে বিসিসিআইয়ের সচিব দেবজিৎ সাইকিয়া বার্তা সংস্থা এএনআইকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক ঘটনার কারণে বিসিসিআই কেকেআর ফ্র্যাঞ্চাইজিকে তাদের দলে থাকা বাংলাদেশের খেলোয়াড় মোস্তাফিজুর রহমানকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।’

কিছু ধর্মীয় ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠন এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও এর বিরোধিতা হয়েছে ভারতেও। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা শশী থারুর প্রশ্ন তোলেন, ‘সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশি খেলোয়াড়টি যদি লিটন দাস বা সৌম্য সরকার হতেন, তাহলে কী হতো? এখানে আসলে কাকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে—একটি দেশকে, একজন ব্যক্তিকে নাকি তাঁর ধর্মকে? খেলাধুলাকে এভাবে নির্বিচারে রাজনৈতিক রঙে রাঙানো আমাদের শেষ পর্যন্ত কোথায় নিয়ে যাবে?’

অনেকে আবার মনে করছেন, আগামী মার্চ–এপ্রিলে অনুষ্ঠেয় পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার নির্বাচনে হিন্দু ভোটব্যাংক ধরে রাখতেই ভারত সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক আকরাম খান | ফাইল ছবি

এদিকে মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার জবাবে ভারতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বাংলাদেশের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দিচ্ছেন। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক বোর্ড পরিচালক আকরাম খান সিদ্ধান্তটিকে সমর্থন জানিয়ে বলেছেন, ‘ভারতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তটি ভালো হয়েছে। খেলোয়াড়েরা যদি মানসিকভাবে স্বস্তিতে না থাকে, তাহলে পারফর্ম করা কঠিন।’
 
গতকাল রাতে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিসিবির ই–মেইলের কোনো জবাব দেয়নি আইসিসি। বিশ্বকাপের আর মাত্র এক মাস বাকি থাকায় সূচি পরিবর্তন করা কিছুটা কঠিন বলেই মনে করা হচ্ছে। তবে রাজনৈতিক কারণেই এবারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ ভারত ও শ্রীলঙ্কায় আয়োজন করা হচ্ছে। পাকিস্তান দল যেহেতু আগে থেকেই ভারত সফর করছে না, তাই তাদের ম্যাচগুলো হবে শ্রীলঙ্কায়।
Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন