[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

কক্সবাজারে বন্ধ ৬০০ মহাল, বিপাকে ব্যবসায়ীরা

প্রকাশঃ
অ+ অ-
কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক উপকূলের একটি মহালে শুঁটকি তৈরিতে ব্যস্ত দুই শ্রমিক। মাছ সংকটের কারণে এই এলাকার অন্তত ৬০০টি মহালে শুঁটকি উৎপাদন বন্ধ আছে। গত রোববার দুপুরে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন    

দেশের অন্যতম বড় শুঁটকি উৎপাদনের মহাল গড়ে উঠেছে কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের নাজিরারটেক এলাকায়। সমুদ্র উপকূলীয় এ এলাকায় ছোট-বড় ৭০০টি মহালে প্রতি মৌসুমে উৎপাদিত হয় প্রায় ৫৫ হাজার মেট্রিক টন শুঁটকি, যার বাজারমূল্য প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। কিন্তু গত কয়েক মাসে মহালগুলোয় শুঁটকির উৎপাদন ক্রমান্বয়ে কমছে। মূলত সাগরে কম মাছ ধরা পড়ায় শুঁটকির উৎপাদন কমছে।

সাগরে কম মাছ ধরা পড়া ও শুঁটকির উৎপাদন কমার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে নাজিরারটেক মহালের ১০ জন মহালমালিক, ৯ জন শুঁটকি ব্যবসায়ী, ১৫ জন পর্যটক, পরিবেশ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, মৎস্য কর্মকর্তা, ট্রলারমালিক ও জেলেদের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। মাছ ও শুঁটকির উৎপাদন কমার পেছনে ছয়টি কারণের কথা জানিয়েছেন তাঁরা।

এগুলো হলো, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বঙ্গোপসাগরে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ (ঘূর্ণিঝড়, নিম্নচাপ, লঘুচাপ) সৃষ্টি, ট্রলিং জাহাজের বেপরোয়া মাছ আহরণ, নিষিদ্ধ কারেন্ট জালে মাছের পোনা ধ্বংস, উপকূলে জাটকা ইলিশ নিধন, সাগরের পানিদূষণ ও  লবণাক্ততার পরিমাণ বৃদ্ধি।

কক্সবাজার শুঁটকি প্রক্রিয়াজাত ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, সাত মাস ধরে কক্সবাজার উপকূলে ইলিশ দূরের কথা, অন্যান্য প্রজাতির সামুদ্রিক মাছও তেমন ধরা পড়ছে না। আগে ট্রলারের জালে ধরা পড়া মাছের উল্লেখযোগ্য অংশ নাজিরারটেক, নুনিয়াছটা, মগচিতাপাড়াসহ বিভিন্ন উপকূলের শুঁটকি মহালে চলে যেত। সেখানে শুঁটকি তৈরি হতো। এখন মাছ নেই, তাই শুঁটকি উৎপাদনও দ্রুত কমছে। কাঁচা মাছের সংকটের কারণে প্রায় ৬০০ মহালে শুঁটকি উৎপাদন বন্ধ আছে।

জয়নাল আবেদীন বলেন, এখন শতাধিক মহালে যে শুঁটকি উৎপাদিত হচ্ছে, তার ৮০ শতাংশ কাঁচা মাছ সংগ্রহ করা হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে। এসব মাছ আমদানি করা হচ্ছে ভারত ও ওমান থেকে। অবশিষ্ট ২০ শতাংশ শুঁটকি উৎপাদিত হচ্ছে কক্সবাজার উপকূলের মাছ দিয়ে।

সমিতির দেওয়া তথ্যমতে, গত বছর ৭০০ মহালে উৎপাদিত হয়েছিল ৫৫ হাজার মেট্রিক টন শুঁটকি। চলতি মৌসুমের প্রথম আট মাসে (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) শুঁটকির উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন। সাগরে মাছ ধরা না পড়লে চলতি মৌসুমে শুঁটকির উৎপাদন অর্ধেক কমে আসতে পারে।

কক্সবাজার ফিশিংবোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন জানান, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, চকরিয়াসহ জেলার ৯টি উপজেলায় সাগরে মাছ ধরার ট্রলার আছে প্রায় ৬ হাজার। কিন্তু গত ছয়-সাত মাস ধরে ৮০ শতাংশ ট্রলারের জালে তেমন মাছ ধরা পড়েনি। বলতে গেলে বঙ্গোপসাগর থেকে ইলিশসহ অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ উধাও হয়ে গেছে। কক্সবাজার উপকূল থেকে মাছ কেন কমে যাচ্ছে, তা নিয়ে গবেষণা দরকার বলে তিনি মনে করেন।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসহ নানা কারণে সাগরে মাছ ধরা পড়ার হার অনেক কমেছে। এই কারণে শুঁটকির উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। গত ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে কক্সবাজারে ৪৮ হাজার ২৮৫ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছিল, যার বাজারমূল্য ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) শুঁটকির উৎপাদন হয়েছে ১১ হাজার মেট্রিক টনের বেশি।

পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের নাজিরারটেক সড়কের পশ্চিম পাশে ‘রাঙাবালি শুঁটকি মহাল’-এ গিয়ে দেখা যায়, ২০টি বাঁশের মাচায় ছুরি, ফাইস্যা, কামিলা, পোপা ও মাইট্যা মাছ শুকানো হচ্ছে। তিনজন নারী শ্রমিক মাছগুলো রোদে উল্টেপাল্টে দিচ্ছিলেন। মহালের মালিক ফজল কাদের বলেন, এখন শুঁটকি উৎপাদনের মূল সময়। কিন্তু কক্সবাজার উপকূলে মাছ নেই। তাই চট্টগ্রাম থেকে কাঁচা মাছ কিনে এনে শুঁটকি তৈরি করা হচ্ছে। গত বছর এই মহালে প্রায় ৫০০ মেট্রিক টন শুঁটকি উৎপাদন হলেও এবার ২০০ টন হবে কি না, তা নিয়ে তাঁর সন্দেহ আছে।

মহালে উৎপাদিত শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে পাশের ‘রাঙাবালি শুঁটকি শপ’-এ। সেখানে প্রতি কেজি ছুরি শুঁটকি ৬০০ থেকে ২৫০০ টাকায়, লইট্যা ৭০০ থেকে ১২০০ টাকায়, ওমান থেকে আনা লাক্ষা ২ হাজার টাকায় এবং স্থানীয় লাক্ষা ৩ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া কোরাল ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়, পোপা ২৫০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায়, কামিলা (বাইন) ৮০০ টাকায়, চিংড়ি ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় এবং ফাইস্যা ও মলাসহ ছোট মাছ ২৫০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দোকানের পরিচালক মো. তানভির বলেন, বিদেশি মাছে শুঁটকি তৈরি করতে হচ্ছে বলে দাম দ্বিগুণ হয়ে গেছে। 

নাজিরারটেক, কুতুবদিয়াপাড়া, সমিতিপাড়া, ফদনারডেইল, মোস্তাইক্যাপাড়া, বাসিন্যাপাড়াসহ ১ নম্বর ওয়ার্ডের ১৮টি উপকূলীয় পল্লিতে অন্তত ৭০ হাজার জলবায়ু–উদ্বাস্তু পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে অন্তত ৪৫ হাজার নারী-পুরুষ শুঁটকি মহালে শ্রমিকের কাজ করেন। ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আকতার কামাল বলেন, মাছের সংকটের কারণে ইতিমধ্যে ৮০ শতাংশ মহালে শুঁটকি উৎপাদন বন্ধ থাকায় অন্তত ৪০ হাজার শ্রমজীবী মানুষ অর্থসংকটে পড়েছেন। অনেকে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

নাজিরারটেক বহুমুখী মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সদস্যসংখ্যা ৯৭১। এছাড়া সমিতির বাইরে আরও অন্তত ১ হাজার ব্যবসায়ী শুঁটকির ব্যবসা করেন। প্রতিবছর ব্যবসায়ীরা এখান থেকে চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শুঁটকি সরবরাহ করেন। সমিতির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউর রহমান বলেন, টানা কয়েক দিন ছুটি থাকলে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ৩ থেকে ৪ লাখ পর্যটকের ভিড় হয়। বছরে আসেন ৬০ থেকে ৭০ লাখ মানুষ। তাঁদের অর্ধেকই ফেরার সময় কয়েক কেজি করে শুঁটকি কিনে নিয়ে যান। প্রতিবছর শুঁটকির চাহিদা ৫৫ হাজার মেট্রিক টনের বেশি থাকলেও কাঁচা মাছের সংকটের কারণে চাহিদার অর্ধেকও উৎপাদন করা যাচ্ছে না।

নাজিরারটেক, কুতুবদিয়াপাড়া, সমিতিপাড়া, ফদনারডেইল, মোস্তাইক্যাপাড়া ও বাসিন্যাপাড়াসহ ১ নম্বর ওয়ার্ডের ১৮টি উপকূলীয় এলাকায় অন্তত ৭০ হাজার জলবায়ু-উদ্বাস্তু পরিবার বসবাস করে। এদের মধ্যে প্রায় ৪৫ হাজার নারী-পুরুষ শুঁটকি খামারে শ্রমিকের কাজ করেন।

১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আকতার কামাল বলেন, মাছের সংকটে ইতিমধ্যে ৮০ শতাংশ খামারে শুঁটকি উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এতে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমজীবী মানুষ অর্থসংকটে পড়েছেন। অনেকে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

একটি খামারে কথা হয় শুঁটকিশ্রমিক মায়েশা বেগমের সঙ্গে। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত টানা ১২ ঘণ্টা কাজ করে তিনি মজুরি পান ৫০০ টাকা। এই টাকায় ছয় সদস্যের সংসার চলে না জানিয়ে ৪০ বছর বয়সী মায়েশা বেগম বলেন, ‘নাজিরারটেকের কয়েক শ খামার বন্ধ আছে, কাজের খুবই অভাব। ৫০০ টাকায় কাজ না করলে ঘরের সবাইকে না খেয়ে থাকতে হবে।’

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন