ইসলামী আন্দোলন–জামায়াত আসন সমঝোতা চূড়ান্ত হয়নি
নির্বাচনী আসন সমঝোতা নিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মধ্যে দূরত্ব এখনও দূর হয়নি। আসন বণ্টন নিয়ে আরও দু–একটি দলের অসন্তোষ থাকায় ৩০০ আসনের সমঝোতা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে দুই দলের শীর্ষ নেতাদের হস্তক্ষেপে আবার আলোচনা শুরু হয়েছে। দুই দলই দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছানোর পক্ষে কথা বলছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ সময় ছিল ২৯ ডিসেম্বর। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সুযোগ থাকবে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত। এই সময়সীমা সামনে রেখে জোটভুক্ত দলগুলোর ওপর আসন সমঝোতা চূড়ান্ত করার চাপ বাড়ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আলোচনার শুরুতে ইসলামী আন্দোলন শতাধিক আসনের দাবি তোলে। অন্য দলগুলোর চাহিদাও তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল। একপর্যায় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নির্বাচনী আসন সমঝোতায় যুক্ত হওয়ায় ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দলের মধ্যে আসনসংখ্যা নিয়ে অস্থিরতা ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
সমঝোতার আলোচনা চলাকালীন জামায়াত ২৭৬টি আসনে এবং ইসলামী আন্দোলন ২৬৮টি আসনে প্রার্থী দিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেয়। এছাড়া এনসিপি ৪৪টি, এবি পার্টি ৫৩টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ৯৪টি, খেলাফত মজলিস ৬৮টি, এলডিপি ২৪টি, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ১১টি, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ৬টি, জাগপা ৩টি এবং বিডিপি ২টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক রোববার বলেন, আসন বণ্টন নিয়ে আগের সংকট পুরোপুরি কাটেনি। সমঝোতা না হওয়া কিছু আসনে সব দলের সম্মিলিত জরিপ করা প্রয়োজন, যা এখনও হয়নি। সব মিলিয়ে আসন সমঝোতার বিষয়টি চূড়ান্ত হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। তবে সবার মধ্যে নমনীয় মনোভাব দেখা যাচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তিন-চার দিনের মধ্যে সমঝোতার আলোচনা একটি পর্যায়ে পৌঁছাবে।
ইসলামী আন্দোলনে অসন্তোষ
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পরদিনই ইসলামী আন্দোলনের জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তাঁদের দল ১৪৩টি আসনে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে, কিন্তু সমঝোতা সেই অনুযায়ী হচ্ছে না। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, তাঁদের দল কেন জামায়াতের কাছে আসন চাইবে। এক বাক্স নীতি আগে ঘোষণা করেছে ইসলামী আন্দোলন। কোনো আসন দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা নিশ্চিত কি না, সেই প্রশ্ন তৈরি হবে।
ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের একটি অংশের ধারণা, জামায়াত এনসিপিকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সমঝোতায় এনসিপিসহ নতুন তিনটি দল যুক্ত হওয়ায় আসন ছাড়ের বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করতে হচ্ছে। ফলে আগে যত আসনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে সংখ্যা কমাতে হচ্ছে। এ নিয়ে ইসলামী আন্দোলনের পাশাপাশি কয়েকটি দলের তৃণমূল নেতা-কর্মীর মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। কিছু এলাকায় জামায়াতের তৃণমূলেও অসন্তোষের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
দলীয় সূত্র জানায়, আট দলের সর্বশেষ বৈঠকের পর জামায়াত ইসলামী আন্দোলনকে ৩৫ থেকে ৪০টি, এনসিপিকে ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে ১১টি, খেলাফত মজলিসকে ৩টি, এবি পার্টিকে ৩টি, এলডিপিকে ২টি এবং বিডিপিকে ২টি আসন ছাড়ের প্রস্তাব দেয়। এই প্রেক্ষাপটে ইসলামী আন্দোলন একপর্যায়ে সমঝোতার আলোচনা থেকে সরে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এর পরপরই দুই দলের অনুসারীদের মধ্যে পক্ষে-বিপক্ষে বক্তব্য শুরু হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আক্রমণাত্মক পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে।
ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের একটি অংশের ধারণা, জামায়াত এনসিপিকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। সমঝোতায় এনসিপিসহ নতুন তিনটি দল যুক্ত হওয়ায় আসন ছাড়ের বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করতে হচ্ছে। এতে আগে যত আসনে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, সেখান থেকে সংখ্যা কমাতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসলামী আন্দোলনের একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, শুরু থেকেই যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে আসন ছাড়ের কথা ছিল। কোনো দলের প্রার্থী যদি ২০টি আসনে যোগ্য হন, তবে তাঁকে ২০টিই দেওয়া উচিত। আবার কেউ যদি ৮০টি আসনে যোগ্য হন, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
অন্যদিকে জামায়াতের একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ইসলামী আন্দোলন ৭০ থেকে ৭৫টি আসন চাইছে, যা বাস্তবসম্মত নয়। এখানে তৃতীয় কোনো পক্ষের উসকানি আছে কি না, সেটিও ভাবতে হবে। অতীতের নির্বাচনগুলোতে নানা ষড়যন্ত্র হয়েছে। আসন্ন নির্বাচন ঘিরেও একই ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে। যারা ইসলামী দলগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে দেখতে চায় না, তারাই এসব ষড়যন্ত্র করছে।
আট দলের বৈঠকে উপস্থিত থাকা ইসলামী আন্দোলনের এমন একজন নেতা বলেন, আসন সমঝোতা না হলে ইসলামী ঐক্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এ বিষয়ে সবাই একমত। কিছুটা অস্বস্তি থাকলেও পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসছে।
দলীয় সূত্র জানায়, গতকাল জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার পর্যন্ত সময় আছে। তার আগেই সমঝোতা চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে।
শেষ পর্যন্ত সমঝোতার আলোচনা চূড়ান্ত হবে কি না—এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম রোববার বলেন, বিষয়টি পরিবেশ ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। ইসলাম, দেশ ও মানবতার স্বার্থেই ইসলামী আন্দোলন সমঝোতা করবে। এই তিনটি ব্যাহত হলে বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করা হবে।
এনসিপি ও এবি পার্টি
আসন সমঝোতা নিয়ে এলডিপির তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। তবে আসনসংখ্যা নিয়ে এনসিপির মধ্যে কিছুটা সংশয় রয়েছে। আর এবি পার্টির মতে, আসন সমঝোতার বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়।
রাজনৈতিক সূত্র জানায়, এনসিপি ও এবি পার্টি সমঝোতার আলোচনায় ৫০টি আসন চেয়েছিল। তবে জামায়াত আলাদাভাবে এনসিপির সঙ্গে বৈঠক করে তাদের ৩০টি আসন ছাড় দেওয়ার বিষয়ে রাজি করায়। জানানো হয়, এসব আসনে জামায়াত প্রার্থী দেবে না। তবে কোন ৩০টি আসনে সমঝোতা হয়েছে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।
এনসিপি সূত্রে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, ওই ৩০টি আসনের বেশির ভাগ আসনেই জামায়াত ইতিমধ্যে প্রার্থী দিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। এ কারণে শেষ মুহূর্তে এনসিপিও ৪৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, জামায়াতের পক্ষ থেকে তাঁদের ৩০টি আসন ছাড়ার বিষয়ে আশ্বস্ত করা হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন মাধ্যমে ইঙ্গিত মিলছে, এনসিপির জন্য এই আসনসংখ্যা আরও কমতে পারে। তবে এনসিপি চায়, আসনসংখ্যা যেন কোনোভাবেই ৩০-এর নিচে না নামে। সে জন্য তারা ৪০টি আসনের বিষয়ে জামায়াতের ওপর চাপ দিচ্ছে।
অন্যদিকে এবি পার্টির সঙ্গে তিনটি আসনে সমঝোতা করতে চায় জামায়াত। তবে এবি পার্টি ৫৩টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, আট দলের সঙ্গে এখনো এবি পার্টির কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়নি। শুধু জামায়াত নেতাদের সঙ্গে এবি পার্টি ও এনসিপির আলাদা বৈঠক হয়েছে। জোটের নাম, রাজনৈতিক লক্ষ্য, আসনসংখ্যা ও সমঝোতার বিষয়গুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আলোচনা এখনো চলমান রয়েছে।

Comments
Comments