উচ্ছেদ সত্ত্বেও পাইকগাছায় ভাটা ও কয়লা চুল্লি চালুর চেষ্টা
![]() |
| খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় উচ্ছেদ অভিযানের পর ভাঙা চুল্লির ভেতর থেকে ঝুড়িভর্তি কয়লা তুলছেন শ্রমিকেরা। আজ শুক্রবার সকালে উপজেলার চাঁদখালী বাজারসংলগ্ন এলাকায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
পুরো এলাকা যেন ধ্বংসস্তূপে পরিণত। চারপাশে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে পোড়া কাঠ, ইটের টুকরা আর কালচে কয়লা। ইট দিয়ে তৈরি গোলাকার চুল্লির ভাঙা কাঠামোর মধ্যে থেকে ঝুড়ি ভরে কয়লা তুলছেন কয়েকজন নারী–পুরুষ। আজ শুক্রবার সকালে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার চাঁদখালী বাজার সংলগ্ন এলাকায় এমন দৃশ্য দেখা গেছে।
প্রশাসন ও স্থানীয়দের মতে, চাঁদখালী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদন ছাড়া কাঠভিত্তিক কয়লা তৈরির কারখানা ও ইটভাটা চালানো হচ্ছিল। গত বুধবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিবেশ অধিদপ্তর ও পাইকগাছা উপজেলা প্রশাসনের যৌথ অভিযানে লাইসেন্সবিহীন তিনটি ইটভাটা এবং ৫৩টি অবৈধ কয়লার চুল্লি উচ্ছেদ করা হয়। উচ্ছেদ হওয়া ইটভাটাগুলোর মধ্যে রয়েছে এডিবি ব্রিকস, বিবিএম ব্রিকস ও স্টার ব্রিকস।
একটি ভাঙা চুল্লির পাশে দাঁড়িয়ে কয়েকজন নারী একসঙ্গে বললেন, ‘প্রশাসনের লোকজন এসে সব ভেঙে দিয়েছে। আমরা পরিষ্কার করছি। আবার এইখানেই কয়লার কারখানা হবে। কয়বার ভাঙবে? যতবার ভাঙবে, ততবার বানাব। এই কাজ করেই তো আমাদের সংসার চলে।’
ঝুড়িতে কয়লা তুলতে তুলতে মন্টু গাজী নামের এক শ্রমিক জানান, চুল্লির মালিক মিঠু। তিনি বলেন, ‘এই এলাকায় এমন আরও ৫২টি চুল্লি গত পরশু প্রশাসন ভেঙে দিয়েছে।’
আজ সকালে সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, এক্সকাভেটর দিয়ে ইটভাটাগুলো গুঁড়িয়ে ফেলা হয়েছে। কাঠভিত্তিক কয়লা তৈরির বেশির ভাগ চুল্লি ভেঙে ফেলা হয়েছে। কয়েক হাত পরপর ভাঙা গোলাকার চুল্লির কাঠামো পড়ে আছে। তবে আশপাশে এখনো কিছু কয়লার কারখানা অক্ষত আছে।
পাশেই কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধে দেখা গেছে, বাঁধের পাশে মাটি কাটায় বাঁধটি পাতলা হয়ে গেছে। ট্রলি ও ট্রাকের চাকার দাগও স্পষ্ট। অথচ এসব অবৈধ ভাটা ও চুল্লির পাশেই রয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও একাধিক মাদ্রাসা।
![]() |
| অবৈধ ইটভাটার মালিকদের মাটি কাটার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধ | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
একটি ভাঙা কয়লা কারখানার সামনে দাঁড়িয়ে কথা হয় রফিকুল ইসলাম গাজীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি চুল্লিতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতাম। চুল্লির ভেতর থেকে কয়লা বের করে বস্তায় ভরা ছিল আমার কাজ। এখানে কাজের ভাগ আলাদা—কেউ কাঠ সাজায়, কেউ আগুনে পোড়ায়, কেউ মাটির প্রলেপ দেয়। কাঠ পুড়ে কয়লা হলে ট্রাকে তুলে ঢাকায় পাঠানো হতো।’
দৈনিক ৪০০ টাকা মজুরিতে কাজ করতেন জানিয়ে রফিকুল বলেন, ‘জানতাম শরীর দ্রুত ক্ষয় হয়, আয়ুও কমে। সারা দিন ধোঁয়ার মধ্যে কাজ করতে করতে পেট পর্যন্ত কালো হয়ে যেত। থুতু ফেললেও কালো দেখাত। তবু পেটের দায়ে কাজ ছাড়তে পারিনি। এখন চুল্লি ভেঙে দিয়েছে।’
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, একটি চুল্লিতে মাসে তিন থেকে চারবার কাঠ পুড়িয়ে কয়লা উৎপাদন করা হতো। এতে প্রতি মাসে প্রায় ৮০ হাজার থেকে এক লাখ মণ কাঠ পোড়ানো হতো। দীর্ঘদিন ধরে এসব অবৈধ চুল্লি চালাতে মালিকপক্ষ প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলের একটি অংশকে ‘ম্যানেজ’ করে আসছিলেন। ২০২২ সালেও একবার অভিযানের পর বেশির ভাগ চুল্লি আবার চালু হয়েছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা আনারুল মোল্লা বলেন, ‘ধোঁয়া আর ছাইয়ের কারণে মানুষের শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ বেড়েছে, ফসলের ফলনও কমেছে। এবার বড় ধরনের অভিযান হওয়ায় আমরা খুশি। তবে নিয়মিত নজর না রাখলে আবার সব চালু হয়ে যাবে।’
![]() |
| চারদিকে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে আছে পোড়া কাঠ, ইটের খণ্ড আর কালচে কয়লা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কারখানা মালিক বলেন, ‘অল্পের জন্য আমার চুল্লিগুলো রক্ষা পেয়েছে। সন্ধ্যা হয়ে যাওয়ায় সব ভেঙে ফেলা সম্ভব হয়নি। পরিস্থিতি এখন কিছুটা ভিন্ন হলেও নির্বাচিত সরকার এলে আর সমস্যা হবে না। আগেও অভিযান হয়েছে—একটা–দুটো ভেঙে ছবি তুলে চলে গেছে।’
পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী বলেন, এসব স্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা কপোতাক্ষ নদের বেড়িবাঁধ কেটে মাটি নিয়ে ইট তৈরি করতেন এবং বিষাক্ত কার্বন ডাই–অক্সাইড নিঃসরণসহ পরিবেশবিনাশী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। পরিবেশ ও জনস্বার্থ রক্ষায় প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এটি এক দিনের অভিযান নয়, ধারাবাহিকভাবে চলবে।



Comments
Comments