বিদ্যার দেবীর আরাধনায় ‘মব’ রুখে দেওয়ার বার্তা
![]() |
| রাজধানীর মধ্যে সবচেয়ে বড় আয়োজন হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
বিদ্যা ও সংগীতের দেবী সরস্বতীর কৃপা লাভের আশায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের মাঠে মণ্ডপে মণ্ডপে বাণী অর্চনা, আরতি ও পুষ্পাঞ্জলির মাধ্যমে আরাধনা করছেন সনাতন ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীরা।
এবার জগন্নাথ হলের খেলার মাঠের চারপাশজুড়ে বিভিন্ন বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা মোট ৭৬টি মণ্ডপে সরস্বতী দেবীর পূজার আয়োজন করেছেন।
এর মধ্যে ৭৪টি মণ্ডপ গড়ে তোলা হয়েছে বিভিন্ন বিভাগ এবং সমাজের নানা দৃষ্টিভঙ্গি ও ‘থিম’কে সামনে রেখে। সকাল থেকেই প্রতিটি মণ্ডপে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা গেছে।
মণ্ডপগুলোর মধ্যে একটি ব্যতিক্রমী মণ্ডপ তৈরি করেছেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা। সেখানে দেশে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা ‘মব’ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বার্তা তুলে ধরা হয়েছে।
আয়োজকদের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শ্রাবস্তী বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমরা শুধু থেমে থাকা কলম কিংবা পোড়া সংবাদপত্রের কথা বলিনি। আমরা কথা বলতে চেয়েছি সব ধরনের নিপীড়নের বিরুদ্ধে।
অস্পৃশ্য হরিজন থেকে শুরু করে রক্ত জল করে জীবনের শেষ শক্তিটুকু নিংড়ে দেওয়া চা–শ্রমিক, যিনি ন্যায্য মজুরি পান না, কিংবা প্যালেস্টাইনের ধ্বংসস্তূপে পড়ে থাকা নিষ্পাপ শিশুর লাশ—সবকিছুকে ঘিরে একটি বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। যুদ্ধ নয়, শান্তি। মব নয়, সুবিচার।’
শুক্রবার সকালে বাণী বন্দনা ও পুষ্পাঞ্জলির মাধ্যমে বসন্ত পঞ্চমী তিথিতে পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় সকাল সাড়ে ৮টায়। আনুষ্ঠানিক পর্ব শেষ হয় সকাল ১০টার দিকে।
অন্য বছরের মতো এবারও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সরস্বতী পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক দেবাশীষ পাল।
তিনি বলেন, ‘এবার খুবই শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা হচ্ছে। তবে সকাল থেকে এত মানুষের জনসমাগম আমি আগে কখনো দেখিনি। শুরুতে দুটি গেইট খোলা ছিল, পরে মানুষের ভিড় সামলাতে আরও একটি গেইট খুলে দিতে হয়েছে। সকাল থেকেই বিপুলসংখ্যক মানুষ আসছেন। আমার মনে হয়, এবার আমাদের সরস্বতী পূজা গিনেস বুকে নাম লেখাবে।’
অন্য বছরের মতো এবারও চারুকলা অনুষদ দৃষ্টিনন্দন প্রতিমা তৈরি করেছে, যা বসানো হয়েছে হলের পুকুরের মাঝখানে। পাশাপাশি বিভিন্ন থিমে সাজানো মণ্ডপে জাকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে সরস্বতী পূজা উদযাপন করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
![]() |
| মণ্ডপে মণ্ডপে বাণী অর্চনা, আরতি ও পুষ্পাঞ্জলি চলছে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী রাজা তালুকদার বলেন, ‘প্রতিবছরের মতো এবারও জগন্নাথ হলে বিদ্যার দেবী মা সরস্বতীর আরাধনা খুব জাঁকজমকপূর্ণভাবে আয়োজন করা হয়েছে। লাখো ভক্তের সমাগমে দিনটি আমরা উৎসবমুখর পরিবেশে কাটাই।
সাধারণত মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে (বসন্ত পঞ্চমী) বিদ্যলাভের আশায় আমরা সরস্বতী পূজা ও আরাধনা করে থাকি। আজকের দিনে আমাদের প্রত্যাশা, বিদ্যার দেবী মা সরস্বতী যেন সবাইকে বিদ্যা দান করেন, বিদ্যার আলো সারা জগতে ছড়িয়ে পড়ুক। জগতের সব প্রাণী সুখী হোক।’
‘বিশ্বব্রহ্মাণ্ড’ ধারণাকে সামনে রেখে মণ্ডপ তৈরি করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইনান্স বিভাগ।
এ বিভাগের শিক্ষার্থীদের একজন রাতুল চক্রবর্তী বলেন, ‘মা সরস্বতী সবার। আমরা চাই, পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তাঁর কৃপা লাভ করুক। এ বিশ্ব শান্তিময় হোক।’
অন্যদিকে লাইব্রেরির আদলে সরস্বতীর মণ্ডপ তৈরি করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ।
![]() |
| জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৬টি মণ্ডপে দেবী সরস্বতীর পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
এ বিভাগের শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘সরস্বতী বিদ্যার দেবী। বই যেহেতু বিদ্যার প্রতীক, তাই আমরা চেয়েছি—সরস্বতী যেন বিদ্যা দান করেন। আলোকিত মানুষ হতে হলে বইয়ের কোনো বিকল্প নেই।’
এবারের সরস্বতী পূজায় দর্শনার্থীদের ভিড়ও ছিল চোখে পড়ার মতো। অনেকেই পরিবার নিয়ে দূরদূরান্ত থেকে জগন্নাথ হলে এসেছেন পূজা দেখতে।
খিলগাঁও থেকে পরিবার নিয়ে আসা সৌরভ দাশ বলেন, ‘ঢাকায় ঘোরার মতো জায়গা তেমন নেই। আমরা সাধারণত বাইরে যেতে পারি না। কিন্তু জগন্নাথ হলে এলে মনে হয় এক অন্যরকম অনুভূতি। এত সুন্দর সাজানো আয়োজন, এত বিশাল জায়গা—সব মিলিয়ে ভালো লাগে। ছেলে-মেয়েরা এখনো ছোট, বাইরে নিয়ে যাওয়া কঠিন। যেহেতু পূজা, তাই আজ পরিবার নিয়ে ঘুরতে এলাম।’
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, ভগবানের জ্ঞান ও বিদ্যার রূপ হলেন দেবী সরস্বতী। প্রতিবছর মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের শ্রী পঞ্চমী তিথিতে বিদ্যাদেবীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়। হাতে বীণা থাকায় দেবী সরস্বতীকে বীণাপাণি নামেও ডাকা হয়।
সাদা রাজহাঁস দেবী সরস্বতীর বাহন। ঐতিহ্য অনুযায়ী এদিন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পুরোহিতের মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে বিদ্যাদেবীর মন্দিরে সন্তানদের প্রথম বিদ্যার পাঠ, অর্থাৎ হাতেখড়ির আয়োজন করেন।
এবার জগন্নাথ হলের উপাসনালয়ে দুদিনব্যাপী সরস্বতী পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এতে রয়েছে পুষ্পাঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ, সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা ও রক্তদান কর্মসূচি।
এ ছাড়া পূজাকে ঘিরে হলের ভেতরে দর্শনার্থী শিশু-কিশোরদের জন্য বিভিন্ন রাইড, খেলনা এবং খাবারের দোকানের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।



Comments
Comments