[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

বাংলাদেশের একাত্তরের বন্ধু সাংবাদিক মার্ক টালির জীবনাবসান

প্রকাশঃ
অ+ অ-
২০১২ সালে বাংলাদেশে এসেছিলেন মার্ক টালি | ছবি: মোস্তাফিজুর রহমান

মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনে বিবিসি রেডিওতে যার কণ্ঠ শোনার জন্য দেশের মানুষ অপেক্ষা করত, এই ভূখণ্ডে পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ আর বাঙালির দুঃখের প্রকৃত ছবি বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিতেন সেই প্রখ্যাত সাংবাদিক, বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু স্যার মার্ক টালি মারা গেছেন।

নয়া দিল্লির ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার দুপুরে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স প্রায় ৯০ বছর ছিল।

বিবিসি হিন্দি সার্ভিস জানিয়েছে, মার্ক টালির মৃত্যুর বিষয়টি তাদের সাবেক সহকর্মী সতীশ জ্যাকব নিশ্চিত করেছেন।

ব্রিটিশ-ভারতীয় মার্ক টালি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বিবিসির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক সংবাদদাতা ছিলেন। তার পরিবেশিত খবর বিবিসি রেডিওতে দেশের মানুষের জন্য মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ জানার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল।

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকে সহযোগিতা করে স্বাধীনতা অর্জনে ভূমিকা রাখায় ২০১২ সালে বাংলাদেশ তাকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ দেয়। সম্মাননা নিতে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। ১৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় সোনারগাঁও হোটেলে ‘স্মৃতি ৭১’ নামে এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন।

‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ পাওয়া আরেক ব্রিটিশ সাংবাদিক সায়মন ড্রিংও ওই অনুষ্ঠানে ছিলেন। তারা দুজন সেদিন মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা শোনান। 

১৯৩৫ সালের ২৪ অক্টোবর কলকাতার টালিগঞ্জে জন্ম নেওয়া মার্ক টালি পেশাজীবনের বড় অংশ ভারতে কাটিয়েছেন। তিনি ২০ বছর ধরে নয়াদিল্লিতে বিবিসির ব্যুরোপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যমে তাকে প্রায়ই বিবিসির অন্যতম খ্যাতনামা বিদেশ সংবাদদাতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তার মৃত্যুর খবর জানিয়ে বিবিসি লিখেছে, বহু বছর ধরে তিনি পরিচিত ছিলেন বিবিসির ‘ভয়েস অব ইনডিয়া’ হিসেবে।

কাশ্মির মনিটর লিখেছে, দক্ষিণ এশিয়ার সম্প্রচার সাংবাদিকতার পথপ্রদর্শক মার্ক টালি নিজেই এক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছিলেন। ভারত, পাকিস্তানসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে একটি প্রজন্মের কাছে মার্ক টালির কণ্ঠস্বর বিবিসিরই সমার্থক ছিল।

শান্ত, কর্তৃত্বপূর্ণ এবং গভীর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন তার প্রতিবেদন ছিল অহংকারহীন দৃঢ়তা, আবেগপ্রবণ না হয়েও সহমর্মিতা এবং আপসহীন স্পষ্টতার অনন্য উদাহরণ। কয়েক দশক ধরে উপমহাদেশের রাজনীতি, সমাজ এবং মানুষের জীবনের খবর প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি অসাধারণ ভারসাম্য ও সততার পরিচয় দিয়েছেন।

সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তিনি এ অঞ্চলের বহু ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছেন এবং সেগুলো সংবাদ ও নিজের লেখায় লিপিবদ্ধ করেছেন। তার বইগুলোতে ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর সঙ্গে তার গভীর সম্পৃক্ততার ছাপ স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।

মার্ক টালির জন্ম ভারতে হলেও ৯ বছর বয়সে তিনি ইংল্যান্ডে ফিরে যান এবং সেখানেই পড়াশোনা করেন। টাইফোর্ড স্কুল, মার্লবোরো কলেজ এবং ট্রিনিটি হলে ধর্মতত্ত্ব পড়ার পর তিনি ক্যাম্ব্রিজের চার্চ অব ইংল্যান্ডে পাদ্রী হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লিঙ্কন থিওলোজিক্যাল কলেজে পড়াশোনার পর তার মন বদলে যায়।

১৯৬৪ সালে বিবিসিতে যোগ দেন মার্ক টালি। পরের বছর নয়াদিল্লিতে দায়িত্ব নিয়ে আসেন। বিবিসিতে ৩০ বছরের চাকরি জীবনের মধ্যে তিনি ২০ বছর ছিলেন দিল্লি ব্যুরোর প্রধান।

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, ভূপাল গ্যাস দুর্ঘটনা, অপারেশন ব্লু স্টার, ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ড, শিখবিরোধী দাঙ্গা, রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ডসহ অনেক ঘটনার খবর তিনি বিবিসির মাধ্যমে বিশ্বকে পৌঁছে দিয়েছেন।

এক সহকর্মীর সঙ্গে বিরোধের জেরে ১৯৯৪ সালে মার্ক টালি বিবিসি ছাড়েন। এরপর তিনি দিল্লিতে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক এবং উপস্থাপক হিসেবে কাজ শুরু করেন।

সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য ভারত সরকার ১৯৯২ সালে তাকে পদ্মশ্রী এবং ২০০৫ সালে পদ্মভূষণ সম্মাননায় ভূষিত করে। আর নিজের দেশ ব্রিটেন ২০০২ সালে তাকে নাইট উপাধি দিয়েছে।

তার প্রথম বই ‘অমৃতসর: মিসেস গান্ধী’স লাস্ট ব্যাটেল’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে। বিবিসির সাবেক দিল্লি প্রতিনিধি সতীশ জ্যাকব ওই বইয়ের সহলেখক।

অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে সংঘটিত অপারেশন ব্লু স্টার, শিখ বিদ্রোহীদের দমন ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর অভিযান খুঁটিনাটিসহ তুলে ধরা হয়েছে এ বইয়ে।

১৯৯২ সালে প্রকাশিত ‘নো ফুল স্টপস ইন ইন্ডিয়া’ বইটিকে টালির অন্যতম সেরা বই হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন