[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করা গণতন্ত্র নয়, ‘কর্তৃত্ববাদ’ দ্য প্রিন্টকে হাসিনা

প্রকাশঃ
অ+ অ-
 শেখ হাসিনা | ফাইল ছবি

আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে একে ‘রূপান্তরের মোড়কে কর্তৃত্ববাদ’ বলেছেন চব্বিশের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা। টানা ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকা তার শাসনামলকে বিরোধীরা ‘ফ্যাসিবাদী শাসন’ বলে উল্লেখ করে থাকে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় প্রতিটি প্রাণহানির জন্য তিনি ‘দুঃখিত’।

তবে ওই সময়ের সহিংসতার বিচারিক তদন্ত ‘সীমিত’ করে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করে এর দায় অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের ওপর চাপান শেখ হাসিনা।

কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের এক দফায় রূপ নেওয়া ওই অভ্যুত্থান ঘিরে প্রায় ১,৪০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে বলে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

আন্দোলন দমনের চেষ্টায় মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ইতোমধ্যে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ক্ষমতা হারানোর পর থেকেই শেখ হাসিনা দিল্লিতে অবস্থান করছেন। আদালতের দৃষ্টিতে তিনি এখন পলাতক ফাঁসির আসামি।

ট্রাইব্যুনালে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার প্রক্রিয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলটির সব ধরনের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইউনূস সরকার।

কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকায় রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করেছে নির্বাচন কমিশন। এর ফলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না দেশের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় শাসন করা দলটি।

শেখ হাসিনা বলেন, তার দলকে নিষিদ্ধ করা মানে আসন্ন নির্বাচনে ‘কয়েক কোটি বাংলাদেশির ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া’।

দ্য প্রিন্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের পরিস্থিতিতে নির্বাচন হলে তাকে মুক্ত, সুষ্ঠু বা বৈধ বলা যায় না। ভোটারদের পছন্দের দল বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা থাকতে হবে। কাউকে ভোটে অংশ নিতে বাধা দেওয়া বা ঘরে ঘরে গিয়ে সহিংসতার হুমকি দিয়ে বিএনপি বা জামায়াতের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য করা চলতে পারে না।’

আওয়ামী লীগ সভাপতির দাবি, ‘অন্তর্বর্তী সরকার জানে, আমাদের নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হলে আমরা বিপুল সমর্থন পেতাম। সে কারণেই আমাদের নিষিদ্ধ করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভুলে গেলে চলবে না, ইউনূস নিজে কখনও বাংলাদেশের জনগণের কাছ থেকে একটি ভোটও পাননি। অথচ নিজের বেআইনি কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিতে তিনি দেশের আইনগত কাঠামো নতুন করে লিখেছেন।’

লিখিত সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে গণতান্ত্রিক বৈধতা দাবি করা যায় না। এটি সংস্কার নয়; রূপান্তরের মোড়কে কর্তৃত্ববাদ।’

ইউনূস বরাবরই বলে আসছেন, আওয়ামী লীগকে ‘নিষিদ্ধ’ করা হয়নি; তাদের ‘রাজনৈতিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত’ করা হয়েছে।

তবে শেখ হাসিনার ভাষ্য, ওই পার্থক্য ‘অর্থহীন’। কারণ তার দল প্রচার চালাতে, সংগঠিত হতে কিংবা নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।

ট্রাইব্যুনালের মামলায় জুলাই আন্দোলন দমনের ঘটনায় ১,৪০০ জনকে হত্যার উসকানি, প্ররোচনা ও নির্দেশ দেওয়া, ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবলিটি’ এবং ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’-এর আওতায় মোট পাঁচটি অভিযোগ আনা হয়েছিল শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে।

তবে তার দাবি, রাষ্ট্রের ‘প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষা’ এবং ‘প্রাণহানি ঠেকানোর’ তাগিদেই তখন তার সরকার কাজ করেছিল।

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে হওয়া বৈধ আন্দোলনকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি এবং শান্তিপূর্ণভাবে এগোতে দিয়েছি। তাদের দাবির কথা শুনেছি এবং সরকারি চাকরির কোটা বাতিল করেছি, যা ছিল তাদের হতাশার মূল কারণ।’

ওই আন্দোলনের সময় বিভিন্ন সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগ ও থানায় হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা যা আঁচ করতে পারিনি, তা হলো উগ্রবাদী শক্তি ওই আন্দোলন হাইজ্যাক করে নেয়। এটি আর স্বতঃস্ফূর্ত ও শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন ছিল না।’

সে সময় সহিংসতার তদন্তে আওয়ামী লীগ সরকার একটি কমিটি গঠন করেছিল, যা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আর এগোয়নি।

বিষয়টি নিয়ে ‘হতাশা’ প্রকাশ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ইউনূস ক্ষমতায় এসেই ওই তদন্ত ভেঙে দেন। নিশ্চয়ই তিনি জানতেন, এতে তার ‘মেটিকুলাস প্ল্যান’ প্রকাশ হয়ে যাবে। তার এই সিদ্ধান্ত আন্দোলনের পেছনের উদ্দেশ্য ও ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে এবং বিদেশি সম্পৃক্ততার বিষয়টিও সামনে আনে। এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত।’

আইন-শৃঙ্খলার আরও অবনতি ঠেকাতে ‘সব দলের’ অংশগ্রহণে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে দ্রুত ‘সংবিধানিক শাসনে’ ফেরার দাবি জানিয়েছেন শেখ হাসিনা। তার অধীনে গত তিনটি নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

হাসিনার ভাষ্য, ‘ভয় দেখিয়ে বা বেছে বেছে আইন প্রয়োগ করে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা যায় না।’

এক মাস আগে শরীফ ওসমান হাদিকে হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশে রাতভর সহিংসতা হয়। এতে দুটি সংবাদমাধ্যমের কার্যালয় এবং ছায়ানটের মতো প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়।

এই প্রসঙ্গ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এটি ম্যান্ডেটহীন একটি অনির্বাচিত প্রশাসনের সরাসরি ফল। তারা রাজনীতিকে চরমপন্থী গোষ্ঠীর হাতে তুলে দিয়েছে। সংস্কারের বদলে উগ্র গোষ্ঠীগুলোকে ক্ষমতার কেন্দ্রে তুলে এনেছে, মবের বিচার প্রতিষ্ঠা করেছে এবং বৈধ রাজনীতির কণ্ঠরোধ করেছে।’

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের অভিযোগ, দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করে আসছে আওয়ামী লীগই। হাদিকে হত্যার ঘটনায় যাদের দায়ী করা হচ্ছে, তারাও আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে পুলিশের ভাষ্য।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আজকের বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলার কোনো ছাপ নেই। ইউনূস সরকার নিয়মিতভাবে সহিংসতার বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং তারা উগ্রবাদীদের উৎসাহ জুগিয়েছে—যারা প্রতিদিনের নৃশংসতার মাধ্যমে তাদের কট্টর মতাদর্শ ছড়াচ্ছে, সমাজের বহুত্ববাদ দমন করছে এবং ভিন্নমতকে রাজনৈতিক শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করছে।’

বাংলাদেশে নেওয়া সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েও সমালোচনা করেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষতা, বহুত্ববাদ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য চরমপন্থি গোষ্ঠীর পুনর্বাসন আমাদের জাতির কাঠামোকেই হুমকির মুখে ফেলছে। উগ্র গোষ্ঠীকে মূলধারার রাজনীতিতে ফিরতে দিলে তারা রাষ্ট্রকে সংযত করে না; তারা নিজেদের ছাঁচে ঢালতে চায় এবং বহুত্ববাদের সব চিহ্ন মুছে ফেলতে চায়।’

বাংলাদেশ যে পথে এগোচ্ছে, তাতে সমাজে বিভক্তি বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা।

তার ভাষায়, ‘সংখ্যালঘু নির্যাতন ও সহিংসতা’ চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক মিত্ররা ‘বসে থাকবে না’।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ‘ইতিহাস বিকৃতি’র অভিযোগও করেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ‘আজ আমরা যা দেখছি, তা ইতিহাসের সত্যকে পরিকল্পিতভাবে মুছে দেওয়ার চেষ্টা। উগ্রপন্থি শক্তি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের কাছ থেকে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতার বাস্তবতাকে লঘু করতে চেয়েছে—ভুক্তভোগী ও হানাদারের পার্থক্য মুছে দিতে চেয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে এই সত্য অস্বস্তিকর হতে পারে; তারা আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে তুলে ধরতে চায়। কিন্তু সত্য তো সত্যই।’ 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন