ভোটের খরচ আসছে কোথা থেকে, দলই বা কত টাকা দিতে পারবে?
| ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন | গ্রাফিক্স: পদ্মা ট্রিবিউন |
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীরা সর্বোচ্চ কত টাকা খরচ করতে পারবেন এবং যে দলের প্রার্থী, সেই দলের ব্যয়ের সীমা কত—এ বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নির্বাচনে প্রার্থী যে অর্থ ব্যয় করবেন, সেই টাকার উৎস এবং কোন খাতে কত টাকা খরচ হচ্ছে, তার বিস্তারিত তথ্য নির্বাচন কমিশনকে জানাতে হবে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারি থাকবে—এমনটাই আশা করছেন নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য আব্দুল আলীম।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই রোববার শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন।
৩০০ আসনে মোট ১ হাজার ৮৪২ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং অফিসাররা। আর বাতিল হয়েছে ৭২৩ জনের মনোনয়নপত্র।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ সামনে রেখে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষ করেছে ইসি। আপিল ও নিষ্পত্তির জন্য ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় রাখা হয়েছে।
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০ জানুয়ারি। ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পরদিন থেকেই শুরু হবে ভোটের প্রচার।
তফসিল ঘোষণার পর রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছ থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহের সময় থেকে শুরু করে ভোটের দিন পর্যন্ত প্রার্থীদের সব ধরনের ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে হয়। এসব ব্যয় নির্ধারিত সীমার মধ্যেই দেখাতে হবে। একইভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া দলগুলোর জন্যও ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া আছে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধন করে এবার সংসদ নির্বাচনে ভোটারপ্রতি ১০ টাকা ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে প্রার্থীদের ব্যয়সীমা আগের তুলনায় বেড়েছে।
৩০০ আসনের মধ্যে এবার সবচেয়ে কম ভোটার রয়েছে ঝালকাঠি-১ আসনে—২ লাখ ২৮ হাজার ৪৩১ জন। আর সবচেয়ে বেশি ভোটার রয়েছে গাজীপুর-২ আসনে—৮ লাখ ৪ হাজারের বেশি।
কে কী তথ্য দিলেন
ঢাকা-১৭ আসনে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৭৭৭ জন। এই আসনের প্রার্থীরা সর্বোচ্চ ৩৩ লাখ ৩৭ হাজার ৭৭০ টাকা পর্যন্ত নির্বাচনি ব্যয় করতে পারবেন।
এই আসনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ জামায়াত, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলনসহ মোট ১০ জন প্রার্থী বৈধ হয়েছেন। ২০ জানুয়ারির পর চূড়ান্ত হবে, শেষ পর্যন্ত কতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকছেন।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় তারেক রহমান জানিয়েছেন, তিনি নিজের কৃষিখাত ও ব্যাংক আমানত থেকে পাওয়া আয় থেকে ৩০ লাখ টাকা নির্বাচনি ব্যয়ে ব্যবহার করবেন।
বগুড়া-৬ আসনেও তারেক রহমান একই পরিমাণ অর্থ ব্যয় করবেন বলে জানিয়েছেন। ভোটারপ্রতি ১০ টাকা হিসাবে এই আসনে তিনি সর্বোচ্চ ৪৫ লাখ ৪০ হাজার ৪৩০ টাকা ব্যয় করতে পারবেন।
জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. শফিকুর রহমান ঢাকা-১৫ আসনে মোট ৩৫ লাখ টাকা ব্যয় করবেন। এর মধ্যে ১০ লাখ টাকা নিজের ব্যাংক হিসাবে থাকা অর্থ থেকে এবং বাকি ২৫ লাখ টাকা দলের অনুদান থেকে নেওয়া হবে।
ভোটারসংখ্যা অনুযায়ী এই আসনে শফিকুর রহমান সর্বোচ্চ ৩৫ লাখ ১৭ হাজার ১৮০ টাকা ব্যয়ের সুযোগ পাবেন।
এবার বিএনপি ও জামায়াত দুই শতাধিক প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচনি আইনের বিধান অনুযায়ী, প্রতিটি দল সাড়ে ৪ কোটি টাকার বেশি ব্যয় করতে পারবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১ আসনে নির্বাচনি ব্যয়ের জন্য ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে ৪৪ লাখ টাকা সংগ্রহ করছেন। এ ছাড়া নিজের আয় থেকে ১ লাখ টাকা ব্যয় করবেন। এই আসনে তিনি সর্বোচ্চ ৪৩ লাখ ৯০ হাজার ৭৮০ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে পারবেন।
নির্বাচনি ব্যয় পরিচালনার জন্য নিজের অর্থ, আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার, আত্মীয়-স্বজনের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত দান, আত্মীয়-স্বজন ছাড়া অন্য ব্যক্তির কাছ থেকে ধার, অন্য ব্যক্তির স্বেচ্ছাপ্রণোদিত দান অথবা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ গ্রহণ করলে তা নির্ধারিত ফরমে (ফরম-২০) নির্বাচন কমিশনকে জানাতে হবে।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ও নির্বাচন বিশ্লেষক আব্দুল আলীম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রার্থী ও দলের ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। নিয়ম অনুযায়ী সবাই জমাও দেন। কিন্তু নির্বাচনি ব্যয়ের ওপর বাস্তবে তেমন নজরদারি থাকে না। এই জায়গায় আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন। আশা করছি, বর্তমান নির্বাচন কমিশন বিষয়টি কঠোরভাবে তদারকি করবে।”
প্রার্থী ও দলের ব্যয় কত, দিতে হবে ব্যয়ের হিসাব
কোনো দলের প্রার্থী সংখ্যা ২০০ জনের বেশি হলে সেই দল সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয় করতে পারবে। প্রার্থী ১০০ থেকে ২০০ জনের কম হলে ব্যয়ের সীমা ৩ কোটি টাকা। প্রার্থী সংখ্যা ৫০ থেকে ১০০ হলে সর্বোচ্চ দেড় কোটি টাকা এবং ৫০ জনের কম হলে সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ের সুযোগ রয়েছে।
প্রার্থীরা নিজ নিজ আসনে সর্বনিম্ন ২৫ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ভোটারপ্রতি ১০ টাকা হিসাবে সর্বোচ্চ ব্যয় করতে পারবেন। এই ব্যয় নির্ধারিত খাতেই দেখাতে হবে।
নির্বাচনি আইন অনুযায়ী, সব প্রার্থীকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব জমা দিতে হবে। তা করতে ব্যর্থ হলে বা আইন লঙ্ঘন করলে জরিমানার পাশাপাশি দুই বছর থেকে সাত বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়ার সুবিধার জন্য ভোটের পর এক মাস পর্যন্ত রিটার্নিং অফিসার (জেলা প্রশাসক) ও জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার কার্যালয় খোলা রাখা হয়।
এবার নির্বাচনি আইন ও বিধিতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। পোস্টার ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্দিষ্ট সংখ্যক বিলবোর্ড ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে, পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালানো যাবে। নির্বাচনি ব্যয়ের সব দিক নির্ধারিত ছকে তুলে ধরে তা রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দিতে হবে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, হলফনামায় মিথ্যা তথ্য দিলে বা নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে অসত্য তথ্য দিলে ভোটের পরও ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনি ব্যয়ের রিটার্ন তদারকির বিষয়ে ইসির নজর রয়েছে। আইন ও বিধি সঠিকভাবে অনুসরণ না করলে জেল ও জরিমানার বিধান রয়েছে।’
নির্বাচনি ব্যয় সংক্রান্ত বিধি মানতে সবার সহযোগিতা চেয়েছে নির্বাচন কমিশন।
‘ক্রাউড ফান্ডিংয়ে’ বাধা দেখছে না ইসি
স্বজন ছাড়া অন্য ব্যক্তির কাছ থেকে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত দান হিসেবে পাওয়া অর্থ ভোটের কাজে ব্যয় করার কথা নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছেন তাসনিম জারা।
ঢাকা-৯ আসনে ভোটারপ্রতি ১০ টাকা হিসাবে প্রত্যেক প্রার্থীর সর্বোচ্চ ৪৬ লাখ ৯৩ হাজার ৬০০ টাকা নির্বাচনি ব্যয় করার সুযোগ রয়েছে।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় তাসনিম জারা নির্বাচনি ব্যয়ের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে উল্লেখ করেছেন—‘জনসাধারণ থেকে ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ’।
এটি কতটা বিধিসম্মত—এমন প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, ভোটের জন্য ‘ক্রাউড ফান্ডিং’ হলে ইসির করার মতো কিছু থাকে না।
তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমরাও দেখেছি। ক্রাউড ফান্ডিং বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো বিধান নেই। তবে দলের ক্ষেত্রে আরপিওতে (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ) বলা আছে—নিবন্ধিত দল কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা অনুদান নিতে পারবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনি ব্যয়ের জন্য কেউ যদি দিতে চায়, কেউ যদি নেয়—এ ক্ষেত্রে ইসির করার কী আছে? যদি দেখার কিছু থাকে, তাহলে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো দেখতে পারে। কেউ মানুষের কাছে সহায়তা চেয়েছে, মানুষ সহায়তা করেছে—এটা তার বিষয়। ইসির খুব একটা কিছু করার নেই। আমরা দেখব, প্রার্থী ২৫ লাখ টাকার বেশি ব্যয় করছেন কি না বা ভোটারপ্রতি ১০ টাকার বেশি নির্বাচনি ব্যয় করেছেন কি না। তিনি আয়ের উৎস দেখিয়েছেন। মানুষের কাছ থেকে নিলে আইনে তো কোনো বাধা নেই।’
তাসনিম জারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। তবে বাছাইয়ে ১ শতাংশ ভোটারের তথ্যের সঠিকতা না পাওয়ায় তার মনোনয়ন বাতিল হয়।
সোমবার তিনি প্রার্থিতা ফিরে পেতে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেছেন। ১০ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আপিল শুনানিতে তার ভাগ্য নির্ধারণ হবে—তিনি ভোটে ফিরতে পারবেন কি না।
ভোটে ফিরতে না পারলে ‘ক্রাউড ফান্ডিংয়ের’ মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থ ফেরত দেওয়ার ঘোষণা আগেই দিয়েছেন তাসনিম জারা।
Comments
Comments