নতুন বন্দোবস্তে সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রশ্ন করতে হবে: জামিল আহমেদ
![]() |
| একক বক্তৃতা দেন অধ্যাপক সৈয়দ জামিল আহমেদ | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
সাংস্কৃতিক কর্মীদের প্রশ্ন করার সাহস দেখাতে হবে। নতুন বন্দোবস্তে এসব প্রশ্ন করা জরুরি—আমরা সবাই মিলে কীভাবে এই দেশে থাকব, কীভাবে আমাদের অতীতকে মনে রাখব, কতটুকু মনে রাখব এবং আমরা কোন পথে এগোব। এসব বিষয় একসঙ্গে ভাবতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক সৈয়দ জামিল আহমেদ।
শনিবার বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার সেমিনারকক্ষে আয়োজিত সেলিম আল দীন স্মরণ উৎসব ২০২৬-এর আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। সীমা লঙ্ঘনেই পূর্ণ প্রাণ: জুলাই গণ-অভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশ, সাংস্কৃতিক রাজনীতি, সেলিম আল দীন শীর্ষক একক বক্তব্য দেন সৈয়দ জামিল আহমেদ।
নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের ১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে সেলিম আল দীন সংগ্রহশালা। ১৪ জানুয়ারি প্রথম দিনে নাট্যশালায় মঞ্চস্থ হয় সেলিম আল দীনের দুটি নাটক—প্রাচ্য ও যৈবতী কন্যার মন। গতকাল সমাপনী দিনে অনুষ্ঠিত হয় এই একক বক্তৃতা।
সূচনা বক্তব্যে অনুষ্ঠানের সঞ্চালক, গবেষক ও নাট্যসমালোচক আবু সাঈদ বলেন, সেলিম আল দীনের নাট্যচেতনা বিস্তৃত ও গভীর। তাঁর নাট্য ও সাংস্কৃতিক ভাবনার মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ নিজেদের আত্মপরিচয় খুঁজে পায়।
স্বাগত বক্তব্যে উৎসবের আয়োজক সেলিম আল দীন সংগ্রহশালার প্রধান কামরুল হাসান বলেন, সেলিম আল দীনের সব রচনা সংগ্রহ ও প্রকাশের কাজ তারা করে যাচ্ছেন। তাঁকে নিয়ে দেশে ও দেশের বাইরে নানা উদ্যোগ চলছে। এই উৎসবের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সবাইকে একত্র করা এবং পারস্পরিক যোগাযোগ তৈরি করাই তাঁদের লক্ষ্য।
মূল বক্তব্যে একক বক্তা সৈয়দ জামিল আহমেদ পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনার মাধ্যমে দীর্ঘ আলোচনা করেন। তিনি সেলিম আল দীনের বিখ্যাত নাটক চাকা অবলম্বন করে তাঁর বক্তব্য শুরু করেন। এরপর ধাপে ধাপে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজনীতি, সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভূমিকা এবং জাতিগত ধারণা নিয়ে গভীর তত্ত্বভিত্তিক আলোচনা করেন।
জামিল আহমেদ বলেন, ‘নাটকে শুধু জাতীয়তাবাদের প্রচার করলেই হবে না। প্রশ্ন তুলতে হবে—আমাদের পরিচয় কী হবে? আমরা বাঙালি, না মুসলমান? না বাংলাদেশি? এসব প্রশ্ন করে যেতে হবে। শুধু নিজের মত নিয়েই মগ্ন থাকলে চলবে না। যাঁদের আমরা অপর বলে মনে করি, সেই বিরোধী মতের মানুষদের কাছেও জানতে হবে, তাঁদের ভাবনা কী। বিরোধী মতকে দমন করার মানসিকতা থেকে সরে আসতে হবে। মনে রাখতে হবে, শক্তি প্রয়োগ করে বিরোধী মতকে দমন করা যায় না। যেমন ছায়ানটে আগুন দিয়ে গান বন্ধ করা যায় না, তেমনি প্রথম আলো বা ডেইলি স্টার পুড়িয়ে দিয়েও মতপ্রকাশের অধিকার রোধ করা সম্ভব নয়। গত ফ্যাসিস্ট শাসক সেই চেষ্টা করেছিল। তবে তারা সফল হতে পারেনি।’
সৈয়দ জামিল আহমেদ তাঁর বক্তৃতায় আরও বলেন, ‘নাট্যকর্মীদের সাহস নিয়ে নাটক করতে হবে। এসব প্রশ্ন সামনে আনতে হবে। শক্তিশালী সংলাপ লিখতে হবে। প্রশ্ন ও সংলাপ এখন খুবই জরুরি। এর মধ্য দিয়েই নতুন সময়ের সাংস্কৃতিক রাজনীতি গড়ে উঠবে।’ তিনি বলেন, সেলিম আল দীনের নাটকে এসব বিষয় নানা রূপে উঠে এসেছে। সে কারণে তাঁর নাটক ও চিন্তা গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন বন্দোবস্তের প্রেক্ষাপটে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আলোচনার পর অনুষ্ঠিত হয় প্রশ্নোত্তরপর্ব। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটকলা বিভাগের শিক্ষক ও নাট্যনির্দেশক শাহমান মৈশান বলেন, ‘প্রশ্ন করার চর্চা আমাদের লোকসংস্কৃতিতে বহুদিন ধরেই আছে। বিচারগান ও কবিগানে এর স্পষ্ট উদাহরণ দেখা যায়। কিন্তু সমাজ দিন দিন অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। প্রশ্ন তোলা ও ভিন্নমত গ্রহণের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর এমন পরিস্থিতি মোটেও কাম্য ছিল না।’

Comments
Comments