অডিও বার্তায় ড. ইউনূসের কড়া সমালোচনা করলেন শেখ হাসিনা
![]() |
| শেখ হাসিনা ও মুহাম্মদ ইউনূস | গ্রাফিক্স: পদ্মা ট্রিবিউন |
চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা হারানোর পর ভারতে নির্বাসিত জীবনে প্রথম কোনো অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেন আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা। সেই ভাষণে তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের তীব্র সমালোচনা করেছেন।
এনডিটিভি জানিয়েছে, বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে ‘অবৈধ ও সহিংস’ শাসন চালানোর অভিযোগ এনে হাসিনা বলেছেন, ইউনূসের নেতৃত্বে দেশ এখন ‘ভয়, নৈরাজ্য ও গণতন্ত্রের নির্বাসনের এক যুগে’ প্রবেশ করেছে।
বাংলাদেশে আন্দোলন দমাতে ১,৪০০ মানুষকে ‘হত্যার নির্দেশ’ দেওয়ার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে তার বিরোধীরা ‘দুর্নীতিগ্রস্ত ফ্যাসিস্ট স্বৈরশাসক’ বলে থাকেন।
এই বক্তব্যে হাসিনা বারবার ইউনূসকে ‘খুনি ফ্যাসিস্ট’, ‘মহাজন’, ‘অর্থপাচারকারী’ ও ‘ক্ষমতালোভী বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যায়িত করে তীব্র আক্রমণ করেছেন।
শুক্রবার দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই বক্তব্য তিনি অডিও বার্তায় প্রদান করেন। আদালতের দৃষ্টিতে তিনি একজন ‘পলাতক ফাঁসির আসামি’।
দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ‘সার্বভৌমত্ব ও সংবিধানের’ জন্য সংকটজনক উল্লেখ করে তিনি সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, 'বিদেশি স্বার্থে পরিচালিত পুতুল সরকারকে উৎখাত করতে হবে।'
সংবাদ সম্মেলন ‘সেইভ ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক একাধিক মন্ত্রী এবং নেতারা উপস্থিত ছিলেন। শেখ হাসিনা সরাসরি উপস্থিত না হলেও, তার অডিও বার্তা সংবাদ সম্মেলনে প্রচার করা হয়। উপস্থিত নেতারা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
শেখ হাসিনা তার বক্তব্য শুরুতে বলেন, 'বাংলাদেশ আজ এক গভীর খাঁদের কিনারে দাঁড়িয়ে আছে।'
তিনি দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে এক বিশাল কারাগার, এক মৃত্যুকূপ, এক মৃত্যুপুরী হিসেবে বর্ণনা করেন, ঠিক যেমন অভিযোগ তার শাসনামলে বিএনপি নেতারা করতেন।
তিনি বলেন, উগ্রপন্থি শক্তি ও বিদেশি শক্তি দেশকে ধ্বংস করছে।
হাসিনা অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তাকে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। সেই দিন থেকেই দেশ ভয়াবহ সন্ত্রাসের যুগে প্রবেশ করেছে। গণতন্ত্র নির্বাসনে গেছে। মানবাধিকার ধুলায় পদদলিত হয়েছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ‘ধ্বংস’ হয়েছে এবং নারী ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ‘নির্বিঘ্নে সহিংসতা’ চলছে।
রাজধানী থেকে গ্রাম পর্যন্ত দেশজুড়ে ‘গণপিটুনি, লুটপাট ও চাঁদাবাজি’ হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “জীবন ও সম্পত্তির কোনো নিরাপত্তা নেই, আইনশৃঙ্খলা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে।”
তবে তার সবচেয়ে তীব্র আক্রমণ ছিল প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের ওপর।
হাসিনা অভিযোগ করেন, ইউনূস দেশকে নিঃস্ব করে দিচ্ছেন এবং ভূখণ্ড ও সম্পদ বিদেশি স্বার্থের কাছে বেচে বাংলাদেশকে বহুজাতিক সংঘাতের অগ্নিকুণ্ডের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তিনি বলেন, 'দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে খুনি ফ্যাসিস্ট ইউনূস আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।'
মুহাম্মদ ইউনূসের সমালোচনার পাশাপাশি শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, 'শহীদের রক্তে লেখা সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।'
শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগকে দেশের ‘গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের একমাত্র বৈধ ধারক’ হিসেবে দাবি করেন, যদিও বিরোধীরা তাদের বিরুদ্ধে ‘একদলীয় শাসন’ চালানোর অভিযোগ করেন।
তিনি আওয়ামী লীগকে 'স্বাধীন বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দল হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, 'জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তার দল ছিনিয়ে নেওয়া সমৃদ্ধ স্বদেশ পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখবে।'
দেশকে “সারিয়ে তুলতে” পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরেছেন শেখ হাসিনা।
প্রথমে তিনি ইউনূস সরকার সরিয়ে ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ ও ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি’ করার দাবি জানান। যদিও তার আমলে গত তিনটি নির্বাচনেই ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল।
দ্বিতীয় দাবিতে তিনি ‘সহিংসতা ও নৈরাজ্যের’ অবসান চান। তার ভাষায়, স্থিতিশীলতা হল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও নাগরিক সেবার পূর্বশর্ত।
তৃতীয় দাবিতে তিনি ধর্মীয় সংখ্যালঘু, নারী ও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলেছেন এবং তাদের ওপর ‘হামলা’ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
চতুর্থ দাবিতে তিনি আইনি প্রক্রিয়া ব্যবহার করে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে’ সাংবাদিক, আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও বিরোধীদের ‘হয়রানি ও গ্রেপ্তার’ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
পঞ্চম ও শেষ দাবিতে শেখ হাসিনা গত এক বছরের ঘটনাবলি নিয়ে জাতিসংঘের অধীনে ‘নিরপেক্ষ তদন্ত’ চেয়ে বলেন, 'সত্যের পরিশুদ্ধি' ছাড়া জাতির পুনর্মিলন সম্ভব নয়।
তিনি সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, 'অন্তর্বর্তী সরকার জনগণের কণ্ঠ শুনতে ব্যর্থ হয়েছে। ঐক্যবদ্ধ থাকলে আমরাও শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের দাবি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।'
এনডিটিভি জানিয়েছে, শেখ হাসিনার এই বক্তৃতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘গভীর বিভাজনের’ চিত্র তুলে ধরেছে। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে কোনো সাধারণ রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং ‘মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বনাম চরমপন্থা, বিশৃঙ্খলা ও বিদেশি প্রভাবের’ লড়াই হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন।
‘বিশ্বাসঘাতকতা’, ‘দখল’ ও ‘প্রতিরোধের’ মতো শব্দচয়ন ব্যবহার করে তিনি সমর্থকদের উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের বর্তমান সংগ্রামকে শুধুমাত্র দলীয় নয়, বরং ‘দেশপ্রেমিক দায়িত্ব’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

Comments
Comments