ভারতীয় বিধিনিষেধের কারণে সংকুচিত বাংলাদেশি রপ্তানি
![]() |
ভারতের বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি দেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) ভারতে রপ্তানি কমেছে সাড়ে ৬ শতাংশের বেশি। এই সময়ে বাংলাদেশের শীর্ষ তিন রপ্তানি পণ্য—তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য এবং পাট ও পাটজাত পণ্য—সবই কমেছে।
বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে ভারতের স্থলবন্দর ব্যবহার করে চলতি বছর তিন দফায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বিধিনিষেধের পরে দুই-তিন মাস রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও গত সেপ্টেম্বরে তা আবার কমতে শুরু করেছে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে ভারতে রপ্তানি হয়েছে ৭৬ কোটি ডলারের পণ্য। গত অর্থবছরের একই সময়ে এটি ছিল ৮১ কোটি ডলার, অর্থাৎ রপ্তানি কমেছে ৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ।
রপ্তানিকারীরা জানান, বিধিনিষেধের ফলে ভারতে পণ্য পাঠানোর খরচ বেড়ে গেছে। প্রতিযোগিতার সুযোগও কমেছে। পরিস্থিতি না বদলালে সামনের দিনগুলোতে রপ্তানি আরও কমে যাবে।
করোনার পর ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে ১৯৯ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল। এরপর দুই বছর রপ্তানি কমেছে। বিদায়ী অর্থবছরে ভারত বাংলাদেশের অষ্টম বড় রপ্তানি বাজার ছিল। ওই বছর ভারতে রপ্তানি হয়েছিল ১৭৬ কোটি ডলারের পণ্য, যা আগের বছরের চেয়ে ১২ শতাংশ বেশি।
গত এপ্রিলে ভারত স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ করে দেয়। এরপর তিন দফায় বাংলাদেশি পণ্যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ১৭ মে ও ২৭ জুন দুই দফায় পোশাক, খাদ্যপণ্য, পাটপণ্য, তুলা-সুতার বর্জ্য, প্লাস্টিকের পণ্য ও কাঠের আসবাব রপ্তানিতে বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। তৃতীয় দফা ১১ আগস্ট পাটপণ্যে আরোপ করা হয়। পরে বাংলাদেশের পাটপণ্য আমদানির ওপর প্রতিকারমূলক শুল্ক বসানোর জন্য তদন্তও শুরু করেছে ভারত।
বিধিনিষেধ অনুযায়ী, পাট ও পোশাক রপ্তানি শুধুমাত্র ভারতের মুম্বাইয়ের নভোসেবা বন্দরের মাধ্যমে সম্ভব। খাদ্যপণ্য, কোমল পানীয়, কাঠের আসবাব, তুলা-সুতার বর্জ্য ও প্লাস্টিক পণ্য রপ্তানি করতে হবে বুড়িমারী বা বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর ব্যবহার করে, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে যুক্ত অন্য স্থলবন্দর ছাড়া।
বাংলাদেশ থেকে ভারতে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয় তৈরি পোশাক। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে প্রায় ৩০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল সাড়ে ৩২ কোটি ডলার। অর্থাৎ রপ্তানি কমেছে ৮ দশমিক ৮০ শতাংশ।
পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা জানান, ৫০ শতাংশ পাল্টা শুল্কের কারণে ভারতের ক্রেতারা মার্কিন বাজারের মতো ক্রয়াদেশ পাচ্ছে না। তাই তারা নিজেরা কম দামে পণ্য অফার করছেন। ভারতের সরকারও রপ্তানিকারীদের স্থানীয় বাজারে বিক্রির জন্য জিএসটি মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিদেশি ব্র্যান্ডও ভারতের বাজারের জন্য বাংলাদেশে উৎপাদন করে। সমুদ্রপথে পণ্য পাঠাতে সময় বেশি লাগে, খরচও বেশি। এ কারণে ভারতে তৈরি পোশাকের রপ্তানি কমছে।
স্প্যারো গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতে তৈরি পোশাকের রপ্তানি আরও কমবে। বিধিনিষেধের কারণে দেশটির বাজারের ক্রয়াদেশও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কাছেই যায়।
দ্বিতীয় শীর্ষ রপ্তানি পণ্য প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য। চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরে প্রায় পৌনে ১০ কোটি ডলারের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রপ্তানি হয়েছে। এটি গত বছরের একই সময়ে তুলনায় ১৩ শতাংশ কম।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল জানান, পণ্য পাঠাতে বাড়তি খরচ হচ্ছে। এতে অনেক পণ্যের মুনাফা কমেছে। তাই প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের রপ্তানি কমছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করে স্থলবন্দরগুলো খোলা হবে এবং পণ্য পরীক্ষা সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
তৃতীয় শীর্ষ রপ্তানি পণ্য পাট ও পাটজাত পণ্য। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে রপ্তানি হয়েছে পাঁচ কোটি ডলার, যা গত বছরের একই সময়ে তুলনায় ৩৭ শতাংশ কম।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ভারতের সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধের পরে দেশটি থেকে সুতা আসা বেড়েছে। ভারতের বিধিনিষেধের কারণে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি কমেছে। কৌশলগত কারণে ভারতের বাজার বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আশা করা যায়, নির্বাচিত সরকার পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে যৌক্তিক অর্থনৈতিক আচরণ করবে। রাজনৈতিক বিষয় সব সময় অর্থনীতির সঙ্গে মেলানো উচিত হবে না।

Comments
Comments