মানুষের প্রতি অটল বিশ্বাস আর নিঃস্বার্থ ত্যাগে স্মরণীয় ইলা মিত্র
![]() |
| ইলা মিত্রের প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নেত্রীবৃন্দ। মহিলা পরিষদ মিলনায়তন, ঢাকা। ১২ নভেম্বর | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
মানুষের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস ইলা মিত্রকে কিংবদন্তিতে পরিণত করেছিল। তিনি যে সমতার আদর্শে বিশ্বাস করতেন, তা নিজের জীবনেই অনুসরণ করেছেন। যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের জন্য, তা আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে, মন্তব্য করেছেন আলোচকেরা।
আজ বুধবার বিকেলে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ আয়োজিত ‘তেভাগা আন্দোলনের বিপ্লবী নেত্রী ইলা মিত্রর জন্মশতবার্ষিকী পালন’ উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বক্তারা এ মন্তব্য করেন। মহিলা পরিষদ তাদের সেগুনবাগিচা কার্যালয়ের আনোয়ারা বেগম–মুনিরা খান মিলনায়তনে এই অনুষ্ঠান আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই মহিলা পরিষদের নেত্রীরা ইলা মিত্রের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর তাঁর জীবন ও কর্মের ওপর নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র ‘রানিমা’ প্রদর্শন করা হয়। এতে ইলা মিত্র এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, জীবনে যত নির্যাতন, লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা সহ্য করেছেন, সেগুলো নিয়ে তাঁর কোনো আফসোস নেই। তিনি বলেছেন, মানুষের মুক্তির জন্য বড় আদর্শের জন্য কাজ করেছেন। ব্যক্তিগত সুখ–স্বাচ্ছন্দ্য জীবনের প্রধান লক্ষ্য নয়; মানুষের জন্য কাজ করতে পারাটাই তাঁর জীবনের সার্থকতা।
আলোচনা পর্বে বক্তারা বারবার ইলা মিত্রের এই কথাগুলো উদ্ধৃত ও ব্যাখ্যা করেছেন। তারা বলেছেন, তিনি কত কঠিন সংগ্রাম করেছেন। জন্মেছিলেন অভিজাত পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে। কলকাতায় পড়াশোনা করেছেন। তুখোড় ক্রীড়াবিদ ছিলেন। জমিদার বধূ ছিলেন। তবুও তিনি চলে এসেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের নিভৃত গ্রামে। সাঁওতালদের আস্থা অর্জনের জন্য তাদের সঙ্গে বসবাস করেছেন।
নিজেরা করির প্রধান সমন্বয়কারী খুশী কবির বলেন, ইলা মিত্র আক্ষরিক অর্থেই নিজের শ্রেণিগত অবস্থান ত্যাগ করতে পেরেছিলেন। সত্তর দশকে তিনি যখন গ্রামে কাজ করতে গিয়েছিলেন, তখন তাঁর এই আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ঈষানী চক্রবর্তী বলেন, ইতিহাসে নাচোল, তেভাগা আন্দোলন ও ইলা মিত্র একে অপরের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। তিনি জীবনে যেখানেই কাজ করেছেন, সেখানেই স্বতন্ত্রতা ও বিশিষ্টতার ছাপ রেখেছেন। ভালো ক্রীড়াবিদ, ভালো সংগঠক, ভালো শিক্ষক ও রাজনীতিক—সব ক্ষেত্রেই তিনি নিজের সর্বোচ্চ নিষ্ঠা ও ভালোবাসা দিয়ে কাজ করেছেন। ব্যক্তিগত সাহসিকতাকে তিনি সমষ্টির মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন। কৃষকের অধিকার, বিশেষত উত্তরবঙ্গের যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীকে তিনি সংগঠিত করেছিলেন, সেই সাঁওতালরা আজও তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাই তাঁর প্রাসঙ্গিকতা এখনও প্রবলভাবে রয়ে গেছে।
সভাপতির বক্তব্যে মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ইলা মিত্র ছিলেন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা ভারত ছেড়ে যাওয়ার সময় এখানে যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ রোপণ করেছিল, তা ধীরে ধীরে মহিরুহে পরিণত হয়েছে। শুধু ধর্মীয় বিভেদই নয়, এটি জাতির গঠনে বাধা সৃষ্টি করেছে। হিংসা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে সমাজকে অসহিষ্ণু করে তুলেছে। সমাজে ঘৃণার বিস্তার ঘটেছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে তরুণদের গভীরভাবে ভাবা উচিত।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন মহিলা পরিষদের সহসভাপতি মাখদুমা নার্গিস, যুগ্ম সম্পাদক সীমা মোসলেম, গ্রিন ভয়েস ও বহ্নিশিখার সমন্বয়ক আলমগীর হোসাইন। আবৃত্তি করেন ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় ও নায়লা তারান্নুম। সংগীত পরিবেশন করেন উদীচীর শিল্পীরা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মহিলা পরিষদের প্রকাশনা সম্পাদক সারাবান তহুরা।
জন্মশতবর্ষ

Comments
Comments