র্যাব সদস্যদের কোটি টাকার লুটের মামলা দীর্ঘায়িত
![]() |
| চট্টগ্রামের আনোয়ারার তালসরা দরবার শরিফ। ২০১১ সালের ৪ নভেম্বর এই দরবার থেকে ২ কোটি ৭ হাজার টাকা লুট করার অভিযোগ ওঠে র্যাবের বিরুদ্ধে | ছবি: দরবারের এক ভক্তের সৌজন্যে |
চট্টগ্রামের আনোয়ারার তালসরা দরবার শরিফ থেকে কোটি টাকা লুটের অভিযোগে র্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে করা ডাকাতি মামলার বিচার ১৩ বছরেও শেষ হয়নি। আসামি উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নেওয়ায় এখনো শুরু হয়নি সাক্ষ্য গ্রহণ। মামলার দীর্ঘসূত্রতায় হতাশ হয়ে পড়েছেন মামলার বাদী।
র্যাব-৭ চট্টগ্রামের সাবেক অধিনায়ক (বরখাস্ত) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জুলফিকার আলী মজুমদারসহ সাতজনের বিরুদ্ধে করা ডাকাতির মামলাটি পঞ্চম অতিরিক্ত চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। আসামি জুলফিকারের আবেদনে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় সাড়ে সাত বছরের বেশি সময় ধরে মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু করা যাচ্ছে না। এর আগেও উচ্চ আদালতের আদেশে মামলার কার্যক্রম চার বছর স্থগিত ছিল।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, জুলফিকারের নেতৃত্বে দরবারের টাকাগুলো লুট করা হয়। ওই টাকায় ঢাকায় ফ্ল্যাট ও জমি নেন তিনি। পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন র্যাবের সোর্স (তথ্যদাতা) দিদারুল আলম ও তরুণ বসু; উপসহকারী পরিচালক আবুল বাসার; জুলফিকারের গাড়িচালক হাসানুজ্জামান; দেহরক্ষী ইব্রাহিম। তরুণ কুমার বসু তাঁর জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, জুলফিকার আলী কোনো প্রকার জব্দ তালিকা প্রস্তুত না করেই দরবার থেকে অর্থ নিয়ে যান। মো. হাসানুজ্জামান তাঁর জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন, লুট করা অর্থ জুলফিকার তাঁর বাসায় নিয়ে গেছেন।
২০১১ সালের ৪ নভেম্বর চট্টগ্রামের আনোয়ারার তালসরা দরবার শরিফ থেকে ২ কোটি ৭ হাজার টাকা লুট করার অভিযোগ ওঠে র্যাবের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। ২০১২ সালের ১৩ মার্চ র্যাব-৭ চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাবেক অধিনায়ক (বরখাস্ত) জুলফিকার আলী মজুমদারসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে আনোয়ারা থানায় ডাকাতির মামলা করেন দরবার শরিফের গাড়িচালক মোহাম্মদ ইদ্রিস।
২০১২ সালের ৩০ এপ্রিল জুলফিকার আলীকে সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়। এর আগে তাঁকে র্যাব চট্টগ্রাম থেকে সরিয়ে সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। চাকরিচ্যুত হওয়ার পর আত্মগোপন করেন তিনি। একই বছরের ৩ মে ঢাকার রমনা থানা এলাকায় এক বন্ধুর বাসা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে আনোয়ারা থানার পুলিশ। তিনি এখন এই মামলায় জামিনে আছেন।
আদালত সূত্র জানায়, জুলফিকার আলীসহ সাতজনকে আসামি করে ২০১২ সালের ২৮ জুলাই আনোয়ারা থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) আবদুস সালাম চট্টগ্রাম জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। মামলার অন্য আসামিরা হলেন র্যাব-৭-এর তৎকালীন সদস্য ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট (বাধ্যতামূলক ছুটিতে) শেখ মাহমুদুল হাসান, উপসহকারী পরিচালক আবুল বাসার, উপপরিদর্শক (এসআই) তরুণ কুমার বসু, সোর্স দিদারুল আলম, মানব বড়ুয়া ও আনোয়ার মিয়া। তাঁরা সবাই জামিনে রয়েছেন।
আসামিরা ডাকাতিকে ধামাচাপা দিতে এত বছর পর ঘটনাটি রাজনৈতিক দাবি করছেন। এটি রাজনৈতিক কোনো ঘটনা নয়। ডাকাতি হয়েছে সবাই জানেন। আশপাশের লোকজন দেখেছেন। ওই সময়ে পাঁচ আসামির জবানবন্দি এবং আদালতে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে উঠে এসেছে ডাকাতির ঘটনা।
মো. ইদ্রিস, মামলার বাদীএদিকে ২০১২ সালের নভেম্বরে আসামিরা হাইকোর্ট থেকে এ মামলার কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ নেন। ২০১৬ সালের আগস্টে উচ্চ আদালত স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর মামলাটি আবার সচল হয়। ২০১৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর পঞ্চম অতিরিক্ত চট্টগ্রাম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে জুলফিকারসহ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে এই মামলার বিচার শুরু হয়। ২৩ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয় সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ। তবে অভিযোগ গঠন বাতিল চেয়ে আসামি জুলফিকার আলী উচ্চ আদালতে মামলাটির কার্যক্রমের স্থগিতাদেশের আবেদন করেন। আদালত স্থগিতাদেশ দেওয়ার পর কার্যক্রম বন্ধ থাকে। শেষ গত বৃহস্পতিবার শুনানি হয়, তবে আদেশ হয়নি।
জানতে চাইলে আসামি জুলফিকার আলীর আইনজীবী মোহাম্মদ আশেক-ই-রসুল বলেন, তালসরা দরবারে অভিযান চালিয়ে মিয়ানমারের নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছিলেন তৎকালীন র্যাব কর্মকর্তা জুলফিকার আলী। চার মাস পর র্যাবের তৎকালীন গোয়েন্দাপ্রধান সেনাবাহিনী থেকে সদ্য অব্যাহতিপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের নির্দেশমতো গুম-খুনে রাজি না হওয়ায় জুলফিকারের বিরুদ্ধে ডাকাতি মামলা সাজানো হয়। তিনি কোনো টাকা লুট করেননি। এক প্রশ্নের উত্তরে আইনজীবী বলেন, তৎকালীন সময়ে চাপে পড়ে আদালতে জবানবন্দি ও অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে।
মামলার বাদী ও তালসরা দরবারের গাড়িচালক মো. ইদ্রিস এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে বলেন, আসামিরা ডাকাতিকে ধামাচাপা দিতে এত বছর পর ঘটনাটি রাজনৈতিক দাবি করছেন। এটি রাজনৈতিক কোনো ঘটনা নয়। ডাকাতি হয়েছে সবাই জানেন। আশপাশের লোকজন দেখেছেন। ওই সময়ে পাঁচ আসামির জবানবন্দি এবং আদালতে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্রে উঠে এসেছে ডাকাতির ঘটনা। সরকারি বিভিন্ন সংস্থাও বিষয়টি জানে। স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে দ্রুত মামলাটি নিষ্পত্তি করা হোক।

Comments
Comments