দলীয়করণ-খামখেয়ালিপনায় সংকটে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা
চার বছরের জন্য নিয়োগ হলেও মাস পেরোতেই সরিয়ে দেয়া হচ্ছে দায়িত্ব থেকে
গত ২১ সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের বৃত্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে। এর মাত্র ৫৬ দিন আগে চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন তিনি। ওই প্রজ্ঞাপনে তাঁর নিয়োগের মেয়াদ উল্লেখ করা হয়েছিল চার বছর। যেদিন তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন অধ্যাপক সায়েম। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজে শিক্ষা মন্ত্রণালয়েও গিয়েছিলেন তিনি। কেন নিয়োগের দুই মাস পার হওয়ার আগেই তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলো, সে বিষয়ে প্রজ্ঞাপনে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। অব্যাহতির পর থেকে তাঁকে আবার উপাচার্য পদে নিয়োগের দাবিতে আন্দোলন করছেন বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা।
কেবল আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমই নন, গত কয়েক মাসে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের কিছুদিনের মধ্যেই উপাচার্য পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। গত ১৯ জুলাই গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন অধ্যাপক মো. নাজমুস সাদাত। নিয়োগের এক মাস পর গত ২৫ আগস্ট তাঁকে ওই পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। একই দিনে গোবিপ্রবির উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় অধ্যাপক ড. মো. সোহেল হাসানকে।
এর আগে গত ৬ জুন নিয়োগের ২৩ দিনের মাথায় অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আমির হোসেন ভূঁইয়াকে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল ১৪ মে। অব্যাহতি দেওয়ার প্রজ্ঞাপনে তাঁকে উপাচার্য পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে মূল পদে যোগদানের অনুমতি দেওয়ার কথা জানানো হয়। ওই প্রজ্ঞাপনেও অব্যাহতির কারণ জানানো হয়নি।
শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর আগে উপাচার্যদের সরিয়ে দেওয়া হতো গুরুতর অভিযোগ বা ছাত্র আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে। ওইসব ক্ষেত্রেও তাঁদের সাধারণত পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হতো। তবে বর্তমানে যেভাবে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে, তা অত্যন্ত অসম্মানজনক।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে যে প্রক্রিয়ায় উপাচার্যদের অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে, সেটি একজন শিক্ষকের ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত অসম্মানজনক। এ ধরনের প্রক্রিয়া থেকে বোঝা যাচ্ছে সরকার দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মানসম্পন্ন ও মর্যাদাপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করছে না এবং উপাচার্য নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়াটিকেই চরম অবহেলার সঙ্গে সম্পন্ন করছে। তারা যে প্রক্রিয়ায় উপাচার্যদের নিয়োগ দিচ্ছে, সেখানে আর্থিক লেনদেন, দলীয়করণের মাধ্যমে অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগসহ নানা অভিযোগও রয়েছে। উপাচার্য পদে যোগ্যতাহীন ব্যক্তিদের আসীন করার এ অসুস্থ প্রভাব সরাসরি পড়ছে শিক্ষার মান ও পরিবেশের ওপর। সরকারের এমন নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ, খামখেয়ালিপনা ও দলীয়করণের সিদ্ধান্তের কারণে পুরো উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা এবং দেশের ভবিষ্যৎই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সিনেটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়ে আসার কথা। এর মধ্য দিয়ে একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উপাচার্য নিয়োগের সুযোগ ছিল, কিন্তু সরকার এ নিয়ম নিজ স্বার্থে উপেক্ষা করছে। একটি দায়িত্বশীল সরকারের প্রাথমিক কাজ হওয়া উচিত ছিল, এ চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে রকম উপাচার্য নির্বাচনের নিয়ম দেওয়া আছে, সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য তেমন একটি অভিন্ন, স্বচ্ছ ও স্পষ্ট উপাচার্য নিয়োগ নীতিমালা তৈরি করা এবং এটা নিশ্চিত করা যে উপাচার্য পদে যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্নরাই নিয়োগ পাবেন। কারণ শিক্ষার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে সবার আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের যথাযথ গুরুত্ব ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৬১। এর মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর চারটি এবং সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ তুলনামূলক অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।
২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে বিতর্কিত ভূমিকার জেরে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষরা একে একে পদত্যাগ করেন। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরের কয়েক মাসে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে স্বায়ত্তশাসিত চার বিশ্ববিদ্যালয়—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়—ছাড়া অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল চার বছরের জন্য। তবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপর অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ পদে কর্মরতদের অব্যাহতি দিয়ে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। গত আট মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ সময়ে মোট ৪৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে পরিবর্তন করা হয়েছে এবং ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দায়িত্বপ্রাপ্তরা এখনো দায়িত্ব পালন করছেন।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে এক উপাচার্য বলেন, ‘পদ থেকে সরকার চাইলে অপসারণ করতেই পারে, তবে এর সুনির্দিষ্ট কারণ থাকা এবং একটি সম্মানজনক পদ্ধতি থাকা জরুরি। অনেক সময়ই দেখা যায়, অনেক বিষয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা বা সরকারদলীয় ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে উপাচার্যদের কাছে বিভিন্ন অনুরোধ আসে, যার অনেক কিছুই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থে উপেক্ষা করা বা এড়িয়ে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু এভাবে অব্যাহতি প্রক্রিয়া চলতে থাকলে এ ধরনের ক্ষেত্রে উপাচার্যদের বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থ বিবেচনায় কোনো বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করার সুযোগ থাকবে না।’
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনা যখন স্বাভাবিক চর্চায় পরিণত হয়, তখন এর প্রতিফলন বিভিন্নভাবে দেখা যায়। বাস্তবে যদি উপাচার্যদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হতো, তাহলে এ ধরনের অপসারণের সুযোগ থাকত না। চুয়েটের উপাচার্য অপসারণের ঘটনায় হতবাক হয়েছি। কারণ যাঁকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে যেমন জনপ্রিয়, তেমনি বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিচ্ছিলেন। সেই জায়গা থেকে তাঁকে অপসারণ করা হয়েছে। এ ঘটনা বার্তা দেয়, কীভাবে দলীয়করণ হচ্ছে। নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনাই মুখ্য হয়ে ওঠে। ’৯০ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরের সময়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের সংস্কৃতি শুরু হয়েছিল। এখন সেটি একটি অসুস্থ প্রবণতার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়াটাই এখন স্বাভাবিক বাস্তবতা। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করা। ক্ষমতায় যাওয়ার পর সুযোগ-সুবিধা অর্জনের প্রবণতা এবং বিজয়ীরা সবকিছু নিয়ে নেবে—এ ধরনের মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসা প্রয়োজন।’