পদ্মা ট্রিবিউন | বাংলা নিউজ পেপার
বাংলাদেশ রাজনীতি বিশ্ব বাণিজ্য মতামত খেলা বিনোদন চাকরি জীবনযাপন ভিডিও

শিবিরের লাগাম টানতে চায় ছাত্রদল?

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বলেন, শিবিরের অবৈধ দখলদারত্ব থেকে ছাত্রাবাস উদ্ধার করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা
ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের লোগো
ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের লোগো

সম্প্রতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এতে বেশ কিছু শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। সংঘাতের সময় ধারালো অস্ত্রের মহড়া দেখা গেছে। আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। অভিভাবকদের মধ্যেও বেড়েছে উদ্বেগ। শিক্ষাবিষয়ক কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন কেউ কেউ। মূলত ক্ষমতাসীন বিএনপির ছাত্রদল ও প্রধান বিরোধী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের মুখোমুখি অবস্থানের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।


গত ২ আগস্ট থেকে থেমে থেমে এ ধরনের সংঘাত অব্যাহত আছে। ঢাকা, জগন্নাথ, রাজশাহী, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও বরিশালের বিএম কলেজের পরিস্থিতি মোটামুটি শান্ত হলেও পুরান ঢাকার বকশীবাজারে অবস্থিত মাদরাসা-ই আলিয়া এখনো অস্থিতিশীল। সর্বশেষ শনিবার দুপুরে আবাসিক ছাত্রাবাসে প্রবেশ করতে চাইলে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা।


এমন অভিযোগ করে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা জানান, বহিরাগত ছাত্রদলের কর্মীরা তাঁদের আসন দখল করে নিয়েছেন। পুলিশের বাধার কারণে অনেকে স্নাতক প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি।


তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বলেন, শিবিরের অবৈধ দখলদারত্ব থেকে ছাত্রাবাস উদ্ধার করেছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।


সরকারের ৬ মাসের মাথায় দুটি প্রধান ছাত্র সংগঠনের এমন মারমুখী অবস্থানের পেছনে আসলে কোন বিষয়টি কাজ করছে? কোনো তৃতীয় শক্তির ইন্ধন আছে? এই অস্থিরতা কত দিন চলবে? ছাত্র সংসদে শিবিরের একক আধিপত্য ছাত্রদল সহ্য করতে পারছে না? ক্ষমতার বাইরে থাকলেও আবাসিক ছাত্রাবাসে শিবিরের নিয়ন্ত্রণ থাকার পেছনে শক্তি কী? এমন প্রশ্নও সামনে আসছে।


নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের এক নেতা বলেন, আসলে ৫ আগস্টের পর থেকে বিভিন্ন কল্যাণমূলক রাজনীতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির। যে কারণে বিগত ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সংগঠনটি অভূতপূর্ব সাফল্য পেয়েছে। সেখানে ছাত্রদল কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে। এ ছাড়া কৌশলে আবাসিক ছাত্রাবাসগুলোতে শিবির নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখেছে। অথচ মূল সংগঠন বিএনপি সরকারে থাকলেও ছাত্রদল সে অর্থে অনেকটা পিছিয়ে আছে। তাই তারা স্বাভাবিকভাবেই প্রাঙ্গণে (ক্যাম্পাসে) নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইবে। এতে প্রয়োজনে সংঘাতের দিকে যেতে পারে ছাত্রদল। আর ছাত্রদল মারমুখী হলে শিবির বসে থাকবে, তা ভাবার অবকাশ নেই। তাই এ সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অশান্ত হোক—সরকার চায় কি না, সেটাও দেখার বিষয়।


জানতে চাইলে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং রাজনীতি বিশ্লেষক রুহিন হোসেন প্রিন্স সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, বিষয়টি পরিষ্কার। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলীয় ছাত্র সংগঠন নিজেদের আধিপত্য জাহিরের জন্যই পরিকল্পিতভাবে সংঘাতে লিপ্ত হয়েছে। কারণ বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে সুবিধা নিয়ে এবং নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে আবাসিক ছাত্রাবাসগুলোতে নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ছাত্রশিবির। তখন ছাত্রদল কিছুটা শান্ত থাকলেও এখন আবার নিজেদের ক্ষমতা জাহির করতে চায়। এ কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। দুই সংগঠনের এমন শক্তি প্রদর্শনের লড়াইয়ে ভীষণ চেপে যাচ্ছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা, যা জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে কাম্য ছিল না।


তিনি মনে করেন, এমনটি চলতে থাকলে এর প্রভাব সারা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর পড়বে। তাই পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।


২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর ছাত্রলীগবিহীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় হওয়া ডান-বাম সব সংগঠনই জুলাইয়ের শক্তি। তাই বিশেষ কোনো ছাত্র সংগঠন প্রকাশ্যে ছাত্রাবাস দখল করার মতো সুযোগ পায়নি। তাছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নিজেদের ছাত্র সংগঠনকে বাড়াবাড়ি করা থেকে বিরত রেখেছে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল। বিশেষ করে অতীতের ধারাবাহিকতার কথা চিন্তা করলে সংগঠন হিসেবে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে এমন উদ্যোগ নেওয়ার কথা ছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা। কিন্তু বিএনপির পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কঠোর মনোভাব থাকায় তারা তা করতে পারেনি। তাছাড়া তখন বৈষম্যবিরোধী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকেও এ ব্যাপারে হুঁশিয়ারি ছিল। যদিও তখন থেকেই ছাত্রদল বলে আসছিল, আসলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের আড়ালে শিবির নিজেদের পরিচয় গোপন করে ছাত্রাবাসে অবস্থান নিয়েছে।


অন্যদিকে ছাত্র সংসদ নির্বাচনেও দেখা গেছে শিবিরের জয়জয়কার। সেখানে ছাত্রদল প্রতিদ্বন্দ্বিতাই গড়ে তুলতে পারেনি। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, জাহাঙ্গীরনগর, জগন্নাথ ও গণবিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে সহসভাপতি , সাধারণ সম্পাদক ও সহসাধারণ সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে জয় পেয়েছে শিবির। শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এজিএস পদে জয়লাভ করেছে ছাত্রদল। আর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিপি পদে স্বতন্ত্র প্যানেল থেকে নির্বাচন করে নির্বাচিত হন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও জুলাই আন্দোলনের সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আবদুর রশিদ জিতু। পরে অবশ্য জাতীয় নির্বাচনের আগে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। যদিও তাঁর ছাত্র সংসদে জিএস ও এজিএসসহ বেশির ভাগ পদই শিবির প্যানেলের।


এমন বাস্তবতায় সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজেদের বলয় ফিরে পেতে চায় ছাত্রদল। এ ক্ষেত্রে তারা কোন প্রক্রিয়ায় এগোবে, তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে দফায় দফায় বৈঠক করেছে দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের এক নেতা জানান, সংগঠনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ চায় ঠিকই। তবে তাদের অভিভাবক সংগঠন বিএনপি এ মুহূর্তে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে সহিংস দেখতে চায় না। তাই ছাত্রদল আগামী দিনে সাধারণ শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচি নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চায়।


এ বিষয়ে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আবু হুরায়রা সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘অতীতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রাবাস দখলসহ সব ক্ষেত্রে আধিপত্য বজায় রেখেছিল। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্রদল সহাবস্থানের রাজনীতি করে আসছে। আর ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে আমরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শান্তিপূর্ণ রাখার চেষ্টা করছি। তারপরও ছাত্রশিবির নানাভাবে উসকানি দিয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে চায়। তবে ছাত্রদল ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা কোনোভাবেই কারও ফাঁদে পা দেবে না। আমরা সৃজনশীল কর্মসূচির মাধ্যমে সামনে এগিয়ে যেতে চাই।’


সাধারণত আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ছাত্রদল-শিবিরের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলেও এর নেপথ্যে অন্য হিসাব-নিকাশ দেখছেন অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের নেতারা। তাঁরা মনে করেন, দুই সংগঠনই ছাত্ররাজনীতিতে অতীতের ধারা ফিরিয়ে আনতে চায়। বিশেষ করে অবৈধভাবে অতিথিকক্ষ ও আসন বাণিজ্যের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় তারা মরিয়া। তাছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নকাজে নিজেদের ভাগ বসাতে প্রতিপক্ষকে সহ্য করতে চায় না। তাই এক পক্ষ আরেক পক্ষকে প্রতিহত করার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে। যে কারণে তারা সহিংস হয়ে উঠেছে। এর খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের।


এ বিষয়ে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘ছাত্রদল-শিবিরের চলমান সংঘর্ষ মূলত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একচেটিয়া দখল এবং ভাগ-বাঁটোয়ারার দ্বন্দ্ব। এই সংঘর্ষের সঙ্গে শিক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের স্বার্থের কোনো সংযোগ নেই। এটাকে শুধুমাত্র দুই দলের সংঘর্ষ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।’


তিনি বলেন, ‘লড়াইটা সন্ত্রাস বনাম গণতান্ত্রিক শিক্ষা প্রাঙ্গণ রক্ষারও। শিক্ষা ও ছাত্রস্বার্থবিরোধী এই সংগঠনগুলো সন্ত্রাস-দখলদারত্ব ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। ঠিক তেমনই গণতান্ত্রিক চিন্তার শিক্ষার্থীদেরও সন্ত্রাস-দখলদারত্বমুক্ত গণতান্ত্রিক শিক্ষাঙ্গন প্রতিষ্ঠার লড়াই করা ছাড়া কোনো সুযোগ নেই। সন্ত্রাস-দখলদারত্বের বিরুদ্ধে লড়াই না করলে এর অবসান হবে না। প্রতিনিয়ত, প্রতি মুহূর্তে এই লড়াই অব্যাহত রাখতে হবে। আমরা বাংলাদেশের ৫৫ বছরের ইতিহাসে বারবার দেখেছি লীগ-দল-শিবির মুখে যা-ই বলুক না কেন, তারা বারবার শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস করেছে। আর দলবাজ প্রশাসন সব সময় এসবের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে। নির্বিকার থেকেছে।’


তিনি মনে করেন, শিক্ষা ও ছাত্রস্বার্থবিরোধী এসব ছাত্র সংগঠনের সন্ত্রাসী রাজনীতির বিরুদ্ধে দেশের ছাত্রসমাজের রাজনৈতিক সচেতনতা, ঐক্যবদ্ধতা এবং প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।


ছাত্রদল-শিবিরের চলমান সহিংসতা নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে একই ধরনের উদ্বেগ বিরাজ করছে। দেশের শিক্ষাঙ্গনে এমনটি চলতে থাকলে শিক্ষাবিষয়ক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনটি মনে করেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি মুনতাসীর মাহমুদ। তিনি মনে করেন, এর দায় ছাত্রদল ও শিবির এড়াতে পারে না। দুই পক্ষকেই দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।


অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা শান্তিপূর্ণ শিক্ষা প্রাঙ্গণ দেখতে চায়। কিন্তু ছাত্রদল তা মানছে না। তাই তারা ছাত্রশক্তিসহ ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। মূলত তারা অবৈধভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে মরিয়া। তবে ছাত্রদল বা শিবির যারাই পেশিশক্তির ব্যবহার করতে চাইবে, সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের প্রত্যাখ্যান করবেন।’


জানতে চাইলে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় মানবসম্পদবিষয়ক সম্পাদক নোমান হোসেন নয়ন সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে শুধু শিবিরই দায়ী নয়। ক্ষমতাসীন দলের সংগঠন হিসেবে ছাত্রদলকেও দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘ছাত্রশিবির সব সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশে থাকবে।’

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

How did this article make you feel?

0 Comments

No comments yet. Be the first to share your thoughts!

Leave a Comment

Moderated — may take a moment.