সংবিধান সংস্কার নাকি সংশোধন, বিএনপির পথ কোনটি?
আগামী সেপ্টেম্বরে ঢাকা থেকে বিভাগীয় জেলা পর্যন্ত ধারাবাহিক লংমার্চ এবং নভেম্বরে ঢাকায় মহাসমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে দলগুলো।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ছয় মাস পার হলেও সংবিধান সংশোধন, নাকি সংস্কার—এই বিতর্কের সমাধানে পৌঁছাতে পারেনি সরকার ও বিরোধী দল। জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় অনুযায়ী জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দল সংস্কারের দাবিতে অনড়। এ লক্ষ্যে সংসদ অধিবেশনের পাশাপাশি রাজপথেও জোরালো বক্তব্য দিচ্ছেন দলগুলোর নেতারা। এরই মধ্যে আগামী সেপ্টেম্বরে ঢাকা থেকে বিভাগীয় জেলা পর্যন্ত ধারাবাহিক লংমার্চ এবং নভেম্বরে ঢাকায় মহাসমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে দলগুলো।
বৃহস্পতিবার রাজধানীতে বিরোধী দলের অবস্থান কর্মসূচি থেকে এ ঘোষণা দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি সংবিধান সংশোধনের দিকেই এগোচ্ছে। ইতিমধ্যে এ-সংক্রান্ত কমিটির প্রথম বৈঠকও হয়েছে।
জানা গেছে, বৈঠকে জুলাই জাতীয় সনদে থাকা সংবিধান-সম্পর্কিত মৌলিক সংস্কার প্রস্তাবগুলোর কী হবে এবং সংবিধান সংশোধন কমিটি কীভাবে কাজ করবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এর আগে গত ১৩ জুলাই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের ‘সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি’ গঠন করে জাতীয় সংসদ। অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে ১৭ সদস্যের কমিটিতে বিরোধী দলকে তাদের পাঁচজন সংসদ সদস্যের নাম দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু তারা সাড়া না দেওয়ায় সরকার একলা চলার নীতিতেই এগোচ্ছে। তবে সরকারি সূত্র জানিয়েছে, তারা এখনো বিরোধী দলের জন্য অপেক্ষা করছে।
এর বাইরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জুলাইয়ের অংশীজন ও দেশের বিশিষ্টজনদের মতামত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ক্ষমতাসীনরা। বিরোধী দল চাইলে চিঠির মাধ্যমেও মতামত দিতে পারে। যদিও তারা সে প্রস্তাবও প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে বিরোধী দলকে ছাড়াই বিএনপি এই সংশোধন কতটা টেকসই করতে পারে বা এ নিয়ে ভবিষ্যতে আইনগত কোনো চ্যালেঞ্জ হতে পারে কি না, সে প্রশ্নও সামনে আসছে।
বিশ্লেষকেরা মনে করেন, যেহেতু জুলাই সনদে বিএনপিসহ অন্যান্য অংশীজন স্বাক্ষর করেছেন, সেখানে শুধু ক্ষমতাসীন দলের মতামতের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন বাস্তবায়ন হলে ভবিষ্যতে আদালতে কেউ তা চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ পাবেন।
জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহমুদুর রহমান মান্না সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, 'যেহেতু জুলাই জাতীয় সনদে আমরা ৩৭টি রাজনৈতিক দল স্বাক্ষর করেছি। সেখানে একটি সমন্বয় কমিটি এবং দুটি শপথ নেওয়ার কথা ছিল। এর মধ্যে একটি ছিল সংবিধান সংস্কার কমিটি। যাদের গঠনতান্ত্রিক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিএনপি জুলাই সনদ মানলেও শপথ নিয়েছে একটিতে। তাই তারা যদি এককভাবে সংবিধান সংশোধনই করে, তা ভবিষ্যতে আদালতে যে কেউ চ্যালেঞ্জ করতে পারে। তবে সরকার চাইলে তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারে।’
এ ক্ষেত্রে বিরোধী দল আন্দোলন করে নিজেদের দাবি আদায় করতে পারবে কি না, জানতে চাইলে মান্না বলেন, ‘সাধারণত এ ধরনের দাবি তেমন জনসম্পৃক্ত নয়। তাই তারা দাবি আদায় করতে হলে অবশ্যই সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে।’
প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-সহ অন্য দলগুলো ১৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন থেকেই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। এদিন জুলাই সনদ অনুযায়ী তারা সংসদ সদস্যের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেন। যদিও বিএনপি ও তাদের মিত্ররা শুধু সংসদ সদস্যের শপথ নেন। তারা মনে করে, এটি সংবিধানবিরোধী।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্রাঙ্গণে (প্লাজা) এক অনুষ্ঠানে জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করেন বিএনপি ও জামায়াতসহ ৩৭টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা। তবে নাখোশ হয়ে তখন না করলেও নির্বাচনের পর ১৬ ফেব্রুয়ারি যমুনায় গিয়ে স্বাক্ষর করেন এনসিপির নেতারা। যদিও এখনো জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধ অব্যাহত আছে।
শুরু থেকেই সংবিধান সংশোধনের দাবিতে অনড় জামায়াত ও এনসিপি। রাষ্ট্রপতির সংস্কার আদেশ অনুযায়ী সংস্কার কমিটি গঠনের দাবি জানায় তারা।
কিন্তু ক্ষমতাসীন বিএনপির মতে, বিদ্যমান সংবিধানে ‘সংবিধান সংস্কারের’ কোনো বিধান নেই। ১৪২ অনুচ্ছেদে সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ আছে। তাই সনদে যেসব পরিবর্তন আনা হয়েছে, বিএনপি এর সবগুলো হুবহু সংবিধানে যুক্ত করতে চায় না।
বিশেষ করে সনদের ১৫ ধারায় একই ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান না হওয়ার কথা বলা হয়েছে। সংবিধান সংশোধন বিল আইনসভার উভয় কক্ষে পাস হতে হবে—এমন প্রস্তাবও করা হয়েছে জুলাই সনদে।
অপরদিকে বিএনপি এই প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। আবার উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ে দলটি একমত হলেও এর গঠনপ্রক্রিয়া নিয়ে জুলাই সনদে যা বলা হয়েছে, সেখানে দলটির ভিন্নমত বা আপত্তি (নোট অব ডিসেন্ট) ছিল। তবে উচ্চকক্ষ গঠন করার বিষয়ে বিরোধী নয় বিএনপি।
বিরোধী দলকে বাদ দিয়েই সংবিধান সংশোধন বাস্তবায়ন করলে সরকার ভবিষ্যতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বলে মনে করে বিরোধী দল। এ ক্ষেত্রে আদালতে গেলে তা বাতিলও হয়ে যেতে পারে। আবার রাজপথের আন্দোলনে জনমত সরকারের বিপক্ষেও চলে যেতে পারে।
জানতে চাইলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, ‘জুলাই সনদে জনগণের অভিপ্রায়কেই সর্বোচ্চ আইন বলে অভিহিত করা হয়েছে—যেখানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা বলা হয়েছে। অথচ সরকার একতরফা কমিটি করে সংশোধন কমিটি করেছে।’
তিনি মনে করেন, 'ভবিষ্যতে যে কেউ আদালতে চ্যালেঞ্জ করলে তা বাতিল হয়ে যেতে পারে। তা ছাড়া রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও সরকারকে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে।'
দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি বলেন, ‘২০১১ সালের ৩০ জুন সংসদে পাস হওয়া পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়েই তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। তখন সরকারের তরফে সংবিধান সংশোধনে গঠিত কমিটিতে বিরোধী দল বিএনপিকে আহ্বান জানালেও তারা অংশ নেয়নি। পরে বিএনপিকে বাদ দিয়েই ওই কমিটির সুপারিশে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী প্রস্তাব পাস হয়। ওই সংশোধনীর মাধ্যমে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা’ বিলুপ্ত হয়। কিন্তু সম্প্রতি আদালত সে সংশোধনী বাতিল করে। সংবিধানে সংশোধনের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটতে পারে বলে তিনি মনে করেন।’
জানতে চাইলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, ‘আমরা জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠনের পক্ষে অনড় আছি। কিন্তু সরকার গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করছে। সরকারের সংবিধান সংশোধনী কমিটিতেও আমরা যাইনি। এখন সরকার চিঠি দিয়ে মতামত জানানোর যে প্রস্তাব দিয়েছে, আমাদের পক্ষ থেকে সে আহ্বানে সাড়া দেওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। হয়তো রাজপথ থেকেই এর ফায়সালা খুঁজতে হবে।’
বিরোধী দলের আপত্তি উপেক্ষা করেই গত ৪ আগস্ট জাতীয় সংসদে বৈঠক করে ক্ষমতাসীন দলের সংবিধান সংশোধন কমিটি। বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে পদ্ধতিগত মতবিরোধের কারণে এই কমিটিতে নাম দেয়নি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী ও বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে বিরোধী দলের জন্য ৫টি পদ ফাঁকা রাখা হয়েছে। যখন নাম দেবে, তখনই তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।’
বিরোধী দল কমিটিতে নাম না দিলে সংশোধন কতটা বাস্তবসম্মত হবে—এমন প্রশ্নে গণমাধ্যমকে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বিরোধী দলের সুপারিশ নেওয়ার জন্য যা যা করণীয় সব করা হবে। আর তাদের সুপারিশ জুলাই সনদের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত আছে। কারণ জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে ৩৩টি রাজনৈতিক দল। তার মধ্যে বিরোধী দলের সব সুপারিশ সেখানে আছে।’
তিনি এখনো বিরোধী দলের অংশগ্রহণের বিষয়ে আশাবাদী বলে জানান।
এ বিষয়ে বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আমানউল্লাহ আমান সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে সমুন্নত রেখেই সামনে এগোতে চাই। সংবিধান অনুযায়ী তো সংস্কার কমিটি বলতে কিছু নেই। জাতির প্রয়োজনে সংশোধনের সুযোগ আছে।’
তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদে যাই বলা হোক না কেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকেও তো স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী সবাইকে নিয়ে চলার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
How did this article make you feel?