ভুল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার: এক বছর ধরে কারাবন্দি আলমাসকে মুক্তির নির্দেশ হাই কোর্টের
নামের মিলের কারণে প্রকৃত অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিবর্তে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে উল্লেখ করে উচ্চ আদালতে রিট করেন কারাগারে থাকা আলমাস
দুই যুগ আগের অস্ত্র মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত মো. আলমাছের পরিবর্তে গ্রেপ্তার হয়ে এক বছর ধরে কারাগারে থাকা নিরপরাধ মো. আলমাসকে তাৎক্ষণিক মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। কারা কর্তৃপক্ষকে এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রোববার এ আদেশ দেন।
নামের মিলের কারণে প্রকৃত অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিবর্তে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে উল্লেখ করে উচ্চ আদালতে রিট করেন কারাগারে থাকা আলমাস।
রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ৬ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট রুল জারি করেন। একই সঙ্গে কারাগারে থাকা আলমাস ও দণ্ডিত ব্যক্তির পরিচয়সহ বিস্তারিত তথ্য যাচাইয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন। আদেশে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে তাঁর তত্ত্বাবধানে একজন জ্যেষ্ঠ বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে অনুসন্ধান (তদন্ত) পরিচালনা করতে বলা হয়। আদেশ পাওয়ার তারিখ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এর ধারাবাহিকতায় প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা আলমাস এই মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন। প্রকৃত আসামি আলমাছ বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন।
এর ধারাবাহিকতায় রিটটি রোববার আদালতের কার্যতালিকায় আদেশের জন্য ওঠে। আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. তানভীর আহমেদ ও আবদুল্লাহ আবু সাঈদ। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শিহাব উদ্দিন খান ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মহিউদ্দীন মো. হানিফ।
‘নামের মিলে ১০ মাস ধরে কারাগারে, প্রকৃত আসামি কে তদন্তের নির্দেশ’ শিরোনামে গত ৪ অক্টোবর একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, দুজনের নাম একই। দুজনের বাবার নামেও আংশিক মিল রয়েছে। অস্ত্র আইনের একটি মামলায় ২২ বছর আগে মো. আলমাছ নামের একজনের ১০ বছরের কারাদণ্ড হয়। সেই রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন একজন, তাঁর নাম মো. আলমাস।
গ্রেপ্তার হওয়া আলমাস এবং মিরপুর থানার অস্ত্র আইনের মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আলমাছ সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি বলে অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার আলমাস অস্ত্র আইনের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি নন। পলাতক আলমাছ মিরপুর থানার অস্ত্র আইনের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি। তিনি বর্তমানে কানাডায় অবস্থান করছেন।
প্রতিবেদনের সার্বিক আলোচনা ও বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সরেজমিনে অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট মামলার নথিপত্র পর্যালোচনা করে স্পষ্ট হয়েছে, ভুল ব্যক্তি অর্থাৎ আলমাস গ্রেপ্তার হওয়ার পেছনে তিনটি বিষয় রয়েছে।
প্রথমত, গ্রেপ্তার আলমাস সপরিবার ২০০৭ সালের আগে ঢাকা জেলার দোহারের দক্ষিণ বাহ্রা ডাকঘরের অধীন বাহ্রা গ্রামে বসবাস করতেন। অন্যদিকে প্রকৃত আসামির গ্রাম পূর্ব ধোয়াইরও একই ডাকঘরের অধীন। ফলে ডাকঘরের নাম দিয়ে পরিচয় দেওয়ার প্রচলনের কারণে দুজনের ঠিকানা এক হয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, উভয়ের বাবার নামের মধ্যে অনেকাংশে মিল রয়েছে। প্রকৃত আসামির বাবার নাম মো. খলিলুর রহমান (খলিল)। আর গ্রেপ্তার ব্যক্তির বাবার নাম শেখ খলিল। নামের এই মিল পরিচয় নির্ধারণে বিভ্রান্তি বাড়িয়েছে।
তৃতীয়ত, ২০০২ সালে করা অস্ত্র মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আলমাছের ঠিকানা ভুলক্রমে ‘পূর্ব ধোয়াইর’-এর পরিবর্তে ‘দক্ষিণ বাহ্রা’ লেখা হয়, যা পরবর্তী নথিতেও বহাল থাকে। মামলার রায় ঘোষণার পর গ্রেপ্তারি পরোয়ানাতেও আসামি আলমাছের ঠিকানা ‘পূর্ব ধোয়াইর’-এর পরিবর্তে ‘দক্ষিণ বাহ্রা’ লেখা হয়।
আলমাসের রিট আবেদন ও এর সঙ্গে সংযুক্ত নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, মো. আলমাছ (২৪) ও মো. নাজমুল আলম মামুনের (২২) বিরুদ্ধে মিরপুর থানায় ২০০২ সালের ১০ এপ্রিল অস্ত্র আইনে মামলা করে পুলিশ।
মামলায় ২০০৪ সালের ১৯ জুন ঢাকা মহানগর বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১১ রায় দেন। রায়ে মো. আলমাছকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায়ে আসামির বর্তমান ঠিকানা মিরপুরের পাইকপাড়ার আহমেদনগর উল্লেখ করা হয়েছিল। অপর আসামি নাজমুল খালাস পান।
নথিপত্র থেকে জানা যায়, রায় ঘোষণার সময় আলমাছ পলাতক ছিলেন। তাঁর নামে সাজা পরোয়ানা জারি করা হয়।
২০২৪ সালের ২০ মার্চের পরোয়ানার পরিপ্রেক্ষিতে আলমাসকে (বাবা শেখ খলিল) সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে গত বছরের ৪ নভেম্বর আদালতে হাজির করে পুলিশ। আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠান। সেই থেকে তিনি কারাগারে আছেন।