তেল পেতে গভীর রাত থেকে রাঙামাটির ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ সারি
![]() |
| রাঙামাটি শহরের কল্যাণপুরের তান্যাবি এন্টারপ্রাইজ নামের পাম্পে অকটেন নিতে আসা মোটরসাইকেলের সারি। আজ সকালে তোলা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
রাঙামাটির রিজার্ভ বাজারের মেসার্স মহসিন স্টোর। জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত এই ফিলিং স্টেশনে ক্রেতাদের জ্বালানি তেল বিক্রি করার কথা। তবে তেলের জন্য গতকাল মঙ্গলবার গভীর রাত থেকেই অনেককে মোটরসাইকেল নিয়ে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। শুধু মহসিন স্টোর নয়, রাঙামাটির সব ফিলিং স্টেশনেই গভীর রাত থেকে একই চিত্র দেখা গেছে।
রিজার্ভ বাজারের মহসিন স্টোরে গভীর রাতে তেলের জন্য অপেক্ষা করা ব্যক্তিদের একজন রতন চাকমা। তিনি জানান, তিনি পেশায় স্কুলশিক্ষক। তাঁর কর্মস্থল নানিয়ারচর ঘিলাছড়ি উচ্চবিদ্যালয় হলেও তিনি থাকেন রাঙামাটি শহরের শশী দেওয়ানপাড়া এলাকায়, যা প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে। সাধারণত সকাল সাড়ে সাতটায় মোটরসাইকেলে করে তিনি বিদ্যালয়ে যান। তবে গত সোমবার থেকে তাঁর মোটরসাইকেলের তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় কর্মস্থলে যেতে সমস্যায় পড়ছেন।
রতন চাকমা বলেন, ‘সোমবার তেল নিতে এসে সিরিয়াল পাইনি। তাই এবার রাত তিনটায় চলে এসেছি। রাতে আসায় ২ নম্বর সিরিয়াল পেয়েছি। তেল নিয়েই স্কুলে রওনা দেব। তবে তেল নেওয়ার জন্য রাতে ঘুমাতে পারিনি।’
সকাল আটটায় ফিলিং স্টেশনটিতে তেল বিক্রি শুরু হয়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই রতন চাকমা মোটরসাইকেলের জন্য তেল পান। তবে পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষার পর তিনি মাত্র ৩০০ টাকার তেল পেয়েছেন।
রতন চাকমার মোটরসাইকেলে তেল দেওয়া হচ্ছিল, তখন ফিলিং স্টেশনটিতে প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। তেলের জন্য অপেক্ষা করা মো. ইসরাফিল নামে এক ব্যক্তি জানান, তিনি একটি ওষুধ বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কর্মী। সকালে চট্টগ্রামে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মাসিক বৈঠক রয়েছে। তিনি মোটরসাইকেলে সেখানে যাবেন, তাই তেল নিতে এসেছেন। ইসরাফিল বলেন, ‘লাইনে অপেক্ষা করতে করতে বাইকে বসেই মিটিংয়ের প্রস্তুতির কাজ করতে হচ্ছে। ভোরে আসায় তেল পাব, এটিই স্বস্তি।’
মিশু মল্লিক নামের আরেকজন জানান, এর আগে একদিন দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তেল না পেয়ে ফিরে গেছেন। এবার অনেক কষ্টে সিরিয়াল পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘রাঙামাটি পাহাড়ি এলাকা। এখানে অনেক জায়গায় মোটরসাইকেল ছাড়া চলাচল করা কঠিন। তেল না পেলে মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে।’
সরেজমিনে মহসিন স্টোরের ব্যবস্থাপক আবদুল বাতেন জানান, প্রতি মোটরসাইকেলে ৩০০ টাকা, অটোরিকশায় ৫০০ টাকা এবং মালবাহী ট্রাকে দেড় হাজার টাকার অকটেন দেওয়া হচ্ছে।
রাঙামাটিতে ফিলিং স্টেশন রয়েছে পাঁচটি। এর মধ্যে চারটি শহর এলাকায়, একটি কাপ্তাইয়ে। জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ফিলিং স্টেশনগুলোতে প্রতি শনি, সোম ও বুধবার সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত অকটেন দেওয়া হচ্ছে। রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার একই সময়ে ডিজেল দেওয়া হয়।
রাঙামাটিতে ফিলিং স্টেশন আছে পাঁচটি। এর মধ্যে চারটি শহরে, একটি কাপ্তাইয়ে। জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, প্রতি শনিবার, সোমবার ও বুধবার সকাল ৯টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত অকটেন দেওয়া হয়। রোববার, মঙ্গলবার ও বৃহস্পতিবার একই সময়ে ডিজেল দেওয়া হয়।
এ ছাড়া নির্ধারিত দিনে তেল থাকলে বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য তেল নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। শুক্রবার সব ফিলিং স্টেশন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
![]() |
| মোটরসাইকেলের জ্বালানি তেল নিতে ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষা করছেন রতন চাকমা (ডানে)। আজ সকালে রাঙামাটির রিজার্ভ বাজারের মহসিন স্টোরে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
সকাল সাড়ে আটটার দিকে রাজবাড়ী এলাকার এস এন পেট্রোলিয়াম এজেন্সি পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে প্রায় অর্ধশত মোটরসাইকেল তেলের জন্য অপেক্ষা করছে। তেল নিয়ে সুনেন্তু চাকমা নামের এক ব্যক্তি জানান, তিনি রাত তিনটায় তেল নিতে এসেছেন। পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষার পর তিনি মাত্র ২০০ টাকার তেল পেয়েছেন। সুনেন্তু বলেন, তিনি পেশায় বিক্রয়কর্মী। তাঁকে জেলার বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়। এত কম তেলে এক দিনও যাতায়াত করা সম্ভব নয়।
রাঙামাটির পেট্রলপাম্পগুলোতে ট্যাগ অফিসারদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতিও ছিল প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে। শহরের মেসার্স তান্যাবি এন্টারপ্রাইজে ট্যাগ অফিসারের দায়িত্বে আছেন জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা টিপু সুলতান। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহযোগিতায় সুশৃঙ্খলভাবে জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে।
রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নিশাত শারমিন জানান, দুজন যুগ্ম সচিব এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পেট্রলপাম্পগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে। জ্বালানি তেলের সংকট আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জেলায় জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। সংকটের আশঙ্কায় অনেকেই বারবার পাম্পে এসে তেল নিচ্ছেন। তাঁদের তেল মজুত করার প্রবণতার কারণে অন্যদের ভোগান্তি বাড়ছে।


Comments
Comments