একই খেতে নানা জাতের ধান, সরকারি বীজের মান নিয়ে প্রশ্ন
![]() |
| ব্রি ধান-৮৮ বীজ বিএডিসির কাছ থেকে নিয়েছিলেন কৃষকরা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
কিশোরগঞ্জের হাওরজুড়ে এখন বোরো ধান কাটার প্রস্তুতি চলছে। আর কয়েক দিন পরেই ধান কাটা শুরু হওয়ার কথা। তবে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ব্রি-ধান ৮৮ জাত চাষ করে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। তাঁদের জমিতে এক জাতের বদলে নানা জাতের ধান দেখা দিয়েছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের দেওয়া এই বীজে এমন গোলমালের কারণে কোনো ধান পেকে গেছে, কোনোটি আধাপাকা, আবার কোনোটির এখনো শিষ বের হয়নি। এই অবস্থায় ধান কাটা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন চাষিরা। পাকা ধান কাটতে গেলে আধাপাকা ধান নষ্ট হওয়ার ভয় আছে, আবার আধাপাকা ধান পাকার জন্য অপেক্ষা করলে পাকাগুলো ঝরে যাচ্ছে। এ নিয়ে চাষিদের দুশ্চিন্তার শেষ নেই।
ইটনা ও করিমগঞ্জের কয়েকটি হাওরে ব্রি-ধান ৮৮ চাষ করে এমন অস্বাভাবিক চিত্র দেখা গেছে। আরও কিছু এলাকা থেকেও একই ধরনের খবর আসছে। তবে সেখানকার পরিস্থিতি এতটা খারাপ নয়। ধানের জাত মিশে যাওয়ায় কৃষকরা তাঁদের ফসল একসঙ্গে কাটতে পারছেন না। কৃষকদের অভিযোগ, বিএডিসির সরবরাহ করা ব্রি-ধান ৮৮ বীজের মধ্যে অন্য জাতের মিশ্রণ থাকায় তাঁরা এই ভোগান্তিতে পড়েছেন। এক জাতের কথা বলে বীজ দেওয়া হলেও বাস্তবে তাতে ছিল নানা জাতের ধানের মিশ্রণ।
করিমগঞ্জের বড় হাওরে সরেজমিনে গিয়ে এই অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। ১০ এপ্রিল দুপুরে কড়া রোদের মধ্যে নিজের জমির পাশে বসে ছিলেন গুণধর ইউনিয়নের মদন গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান। ৫০ বছর বয়সী এই কৃষক বলেন, ‘১৩ কানি জমিতে বিএডিসির ৮৮ জাতের ধানের বীজ লাগিয়েছিলাম। শুরুতে তো বীজ চেনা যায় না। এখন দেখছি আমার জমির অর্ধেকেরও ব্রি-৮৮ ধান নেই। একেকটা একেক জাতের ধান হয়েছে। কোনোটি পেকে গেছে, কোনোটি আধাপাকা, আবার কোনোটির শিষও বের হয়নি। এখন এই ধান কীভাবে কাটব? ধারদেনা করে চাষ করেছি। আশা ছিল ৪০০ মণ ধান পাব। এখন ১০০ মণ হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। আমার এই ক্ষতিপূরণ এখন কে দেবে?’
সেখানে কথা হয় কৃষক ওমর সিদ্দিকের সঙ্গে। তিনি জানান, ১৫ বিঘা জমিতে ব্রি-ধান ৮৮ চাষ করেছেন। এটি কৃষি বিভাগের প্রদর্শনীর জমি। সেখানেও একই অবস্থা দেখা গেছে। ওই জমিতে তিন-চার ধরনের ভিন্ন ভিন্ন জাতের ধান হয়েছে।
বড় হাওরের কৃষক আক্তার মিয়া ও জমির উদ্দিনেরও একই অভিযোগ। তাঁরা জানান, যাঁরা ব্রি-ধান ৮৮ চাষ করেছেন, সবার জমিতেই অন্য জাতের ধানের মিশ্রণ পাওয়া গেছে। ফলে প্রায় সবাই ক্ষতির মুখে পড়বেন। যাঁরা ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন, তাঁদের পথে বসতে হবে। কারণ সব ধান একসঙ্গে কাটা যাবে না, ফলে বেশির ভাগই নষ্ট হবে।
চাষিরা জানান, বিএডিসির ব্রি-ধান ৮৮ জাতের বীজে নানা জাতের ধানের মিশ্রণ ছিল। এ কারণে জমিতে ভিন্ন ভিন্ন জাতের ধান হয়েছে এবং পাকছেও আলাদা আলাদা সময়ে। জমির এই অস্বাভাবিক অবস্থা দেখে তাঁরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কৃষি ও বীজ কার্যালয়ে ছোটাছুটি করেও কোনো সমাধান মিলছে না। কেউ কেউ বলছেন, বিএডিসির ভালো মানের বীজ দেওয়ার কথা থাকলেও তাঁদের বীজে ভেজাল ছিল। এখন সেই ভেজালের মাশুল দিতে হচ্ছে কৃষকদের।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এবার পুরো জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ব্রি-ধান ৮৮ চাষ হয়েছে প্রায় ১৯ হাজার হেক্টরে। ইটনা ও করিমগঞ্জের বেশ কিছু হাওরে এই জাতের ধানে অস্বাভাবিক ফলন দেখা গেছে। কৃষি বিভাগ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান বলেন, ‘মাঠপর্যায় থেকে সমস্যার কথা শুনে কৃষি কর্মকর্তাদের সেখানে পাঠিয়েছি। তাঁরাও ব্রি-ধান ৮৮-এর বীজে মিশ্রণের বিষয়টি দেখেছেন। সেসব জমিতে কিছু ধান পেকেছে, কিছু ধান আধাপাকা আবার কিছু ধান এখনো কাঁচা। এর অর্থ হলো, বিএডিসির বীজের প্যাকেটে বিভিন্ন জাতের ধানের মিশ্রণ ছিল। এখন কতটুকু জমি বা কতজন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সেই তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। আমরা বিএডিসিকেও বিষয়টি জানিয়েছি। এতে বোরো ফলনে সব মিলিয়ে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না। তবে ব্যক্তিগতভাবে অনেক কৃষক ক্ষতির শিকার হবেন।’
ধান ৮৮ জাতের বীজ সরবরাহ করা হয়েছে। পরে আরও ৩১৮ মেট্রিক টন বীজ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মূল উৎস থেকে তাঁদের কাছে এই বীজ আসে। অভিযোগ পাওয়ার পর ঠিক কোথায় সমস্যা হয়েছে এবং এই বীজ কোথা থেকে এল, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) কিশোরগঞ্জের উপপরিচালক (বীজ বিপণন) মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘আমরাও সরেজমিনে গিয়ে এমন কিছু সমস্যা দেখতে পেয়েছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। কৃষকদের হাতে এই বীজ কোথা থেকে গেল, আমরা তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। কোনো বিক্রয় প্রতিনিধি যদি বিএডিসির প্যাকেটে নকল বীজ দিয়ে থাকেন, তবে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া কোন উৎস থেকে এমন মিশ্রণযুক্ত বীজ এল, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
বিএডিসির কিশোরগঞ্জের আরেক উপপরিচালক (বীজ উৎপাদন) হারুনুর রশীদ বলেন, ‘প্রাকৃতিক পরিবর্তনের কারণে একই ফসলের মধ্যে ভিন্নতা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়া সার ও সেচ ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি, বেশি বয়সের চারা লাগানো কিংবা বীজের উৎসে ত্রুটি থাকলেও এমন হতে পারে।’

Comments
Comments