[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

সরকার নির্ধারিত দামে মিলছে না এলপিজি, গুনতে হচ্ছে বাড়তি টাকা

প্রকাশঃ
অ+ অ-
বেড়েছে এলপিজি সিলিন্ডারের দাম। শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টায় চট্টগ্রাম নগরের ষোলশহর স্টেশন এলাকায় | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

৮ এপ্রিল রাতে হঠাৎ মোহাম্মদ ফারুকের বাসায় রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার শেষ হয়ে যায়। উপায় না দেখে তিনি দোকানের খোঁজে বের হন। কয়েক দোকান ঘোরার পর শেষ পর্যন্ত তাঁকে ২ হাজার টাকায় সিলিন্ডার কিনতে হয়। অথচ ১২ কেজির একটি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকারি দাম ১ হাজার ৭২৮ টাকা। প্রয়োজনের চাপে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ২৭২ টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনে বাড়ি ফিরতে হয় তাঁকে।

চট্টগ্রাম শহরের ২ নম্বর গেট এলাকার বাসিন্দা ফারুক। তাঁর অভিযোগ, সরকারি দামে কেউ সিলিন্ডার বিক্রি করছেন না। ২ এপ্রিল বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নতুন দাম ঘোষণা করে। প্রতি কেজিতে ৩২ টাকা ৩০ পয়সা বাড়ানো হলেও সেই দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না—এমন অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে।

ফারুকের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে শহরের হিলভিউ, টেকনিক্যাল মোড়, ষোলশহর, উত্তর কাট্টলি, এনায়েতবাজার ও ২ নম্বর গেট এলাকার কয়েকটি বড় দোকান ঘুরে দেখা যায়, ১২ কেজির সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮৫০ থেকে ২ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ নির্ধারিত দামের চেয়ে ১২২ থেকে ৩৭২ টাকা পর্যন্ত বেশি নিচ্ছেন বিক্রেতারা।

ষোলশহরের একটি দোকানে দাঁড়িয়ে ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই নিজের অবস্থার কথা তুলে ধরেন বিক্রেতা মো. সাহাব উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমরা ইচ্ছা করে বাড়তি দাম নিচ্ছি না। পরিবেশকের কাছ থেকেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তা না হলে সরকারি দামে বিক্রি করতে আপত্তি কোথায়?’

সাহাব উদ্দিনের দোকানের নাম মেসার্স আরমান এন্টারপ্রাইজ। তিনি জানান, ওমেরা ২ হাজার ১০০ টাকা, বেক্সিমকো ২ হাজার ৫০, ইউনিগ্যাস ২ হাজার এবং বিএম ১ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি করছেন তিনি।

শহরের পলিটেকনিক্যাল এলাকার পুরোনো প্রতিষ্ঠান মেসার্স মোহাম্মদীয়া ট্রেডিংয়ে প্রতিদিন দুই-তিন শতাধিক সিলিন্ডার বিক্রি হয়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মুহাম্মদ আলী আজম বলেন, পরিবেশক পর্যায়েই দাম ১ হাজার ৮০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায় উঠেছে। এর মধ্যে আবার বলা হচ্ছে, জাহাজভাড়া ও আমদানি খরচ বেড়েছে। এই অবস্থায় সরকারি দামে বিক্রি করা বাস্তবে সম্ভব হচ্ছে না।

পরিবেশকদের কাছ থেকেও একই কথা শোনা গেল। তাঁদের দাবি, কোম্পানি থেকেই বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। ৫ এপ্রিল বাড়তি দামের বিষয়টি নিয়ে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর এলপি গ্যাস ডিস্ট্রিবিউটরস-ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন। এতে বলা হয়েছে, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কোম্পানি থেকে ১ হাজার ৬৩৩ টাকায় পাওয়ার কথা। বাস্তবে কিনতে হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৯৪০ টাকায়, এমনকি আগের মতো কমিশনও পাচ্ছেন না পরিবেশকেরা। ফলে খুচরা পর্যায়ে এসে দাম আরও বেড়ে যাচ্ছে।

জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সাইফুল আলম বলেন, ‘আমাদের হিসাব মিলছে না। এই অবস্থায় ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাই কোম্পানি থেকে সরকার নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার না পেলে ১৮ এপ্রিল থেকে চট্টগ্রামে সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

৭ এপ্রিল জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসকদের বাড়তি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি বন্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে চিঠি দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এই চিঠির পর ৮ এপ্রিল আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর সংগঠন ‘এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠায়। তারা সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করতে সব পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাকে অনুরোধ জানায়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এলপিজি বোতলজাতকারী প্রতিষ্ঠান থেকে সরকার নির্ধারিত দামেই সিলিন্ডার সরবরাহ করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে এলপিজি অপারেটর অব বাংলাদেশের সভাপতি ও ডেল্টা এলপিজি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, তাঁরা ইতিমধ্যে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের সরকারি দামে বিক্রির অনুরোধ করেছেন। তিনি আশা করেন, সবাই যাঁর যাঁর জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবেন।

শহরের ২ নম্বর গেট এলাকায় চারতলা একটি ভবনে ১২টি ফ্ল্যাটের সব বাসিন্দাই এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। সেখানে ভাড়া থাকেন স্কুলশিক্ষক জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, একটি সিলিন্ডার এক মাসেই শেষ হয়, কখনো আবার ২০ দিনেই ফুরিয়ে যায়। দাম একটু বাড়লেই মাসের হিসাব মেলাতে কষ্ট হয়ে যায়।

একই ধরনের চাপের কথা বললেন আতুরার ডিপো এলাকার বাসিন্দা মাহবুব হাসান। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তিনি। মাসিক আয় সব মিলিয়ে ২৫ হাজার টাকা। তাঁর পরিবারের জন্য মাসে একটি সিলিন্ডার লাগে। তিনি বলেন, ঘরভাড়া, বাজার খরচ—সব মেলাতে গিয়ে এমনিতেই কষ্ট হয়। এখন গ্যাসের জন্য বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে, যা বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশে বছরে প্রায় ১৭ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে, যা ১৮টি দেশ থেকে আমদানি করা হয়। ২৮টি প্রতিষ্ঠান এই খাতে কাজ করলেও আমদানির বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে হাতে গোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

সরকার এলপিজির দাম নির্ধারণ করলেও বাস্তবে তার কোনো প্রভাব নেই বলে মনে করেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন। তিনি বলেন, খুচরা বিক্রেতা, পরিবেশক ও আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান—সবাই যেন দায় একে অপরের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। আর মাঝখানে পড়ে প্রতিদিন বাড়তি টাকা দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। এই অস্থিরতা কত দ্রুত কাটবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন