ভয় ও চাপে কমছে সাংস্কৃতিক আসর, অনিশ্চয়তায় লোকশিল্পীরা
![]() |
| সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলায় গত মাসে বাউলগানের আসর পণ্ড করে দেয় একদল ব্যক্তি | ছবি: সংগৃহীত |
সিলেটের বিশ্বনাথের ইব্রাহিম শাহের মাজার। প্রায় শত বছর ধরে এই মাজারের পাশে বাউলগানের আয়োজন করা হয়ে আসছে। এ বছরও গানের আসর শুরু হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ শতাধিক লোক মঞ্চে এসে হামলা চালায়। তাঁরা বাদ্যযন্ত্র, শব্দযন্ত্র এবং দর্শকদের বসার চেয়ার ভাঙচুর করেন। গত ২২ মার্চ রাতের এই হামলায় কয়েক মিনিটের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায় শত বছরের ঐতিহ্যবাহী গানের আসরটি। ভবিষ্যতে আবারও এমন আয়োজন করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকিও দেয় হামলাকারীরা।
বিশ্বনাথের এই চিত্র এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতির অনুষ্ঠানগুলোকে কেন্দ্র করে এটি এখন প্রায় নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রামীণ উৎসব ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ওপর এ ধরনের হামলার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। এতে ধীরে ধীরে অনেক উৎসব বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে এবং কমছে সাংস্কৃতিক আয়োজনের সংখ্যা।
যাত্রাপালা, পুতুলনাচ, বাউলগান ও পালাগান—এসব একসময় গ্রামীণ বিনোদনের প্রধান মাধ্যম ছিল। নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, গত দুই দশকে গ্রামবাংলার এই নিয়মিত উৎসবগুলো উল্লেখযোগ্য হারে বন্ধ হয়ে গেছে। লোকসংগীত ও লোকনাট্য এখন মূলত বিশেষ কোনো অনুষ্ঠান বা সরকারি সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
শিল্পী ও আয়োজকেরা জানিয়েছেন, গ্রামীণ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের পরিধি কমে যাওয়ার পেছনে হামলা, বাধা ও সামাজিক চাপের মতো ঘটনাগুলো বড় ভূমিকা রাখছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোথাও অনুষ্ঠান করতে গেলেই স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তি, সংগঠন, গোষ্ঠী এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে বাধা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
পুলিশের একটি শাখার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মাসে এই ধরনের ১৩৫টি ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাসেই ঘটেছে ৯৪টি ঘটনা। আর এ বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ঘটেছে ১৬টি ঘটনা।
এই বিষয়ে কথা হয় বাউলশিল্পী আরিফ দেওয়ানের সঙ্গে। ‘মা লো মা’ গানটি তিনিই গেয়েছিলেন। ঢাকার কেরানীগঞ্জে তাঁর পরিবার দুইশ বছরের বেশি সময় ধরে লোকসংস্কৃতির চর্চা করে আসছে।
আরিফ দেওয়ান বলেন, স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় লোকসংস্কৃতির চর্চায় এ ধরনের বাধা ছিল না। তবে পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে মাজারে হামলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আক্রমণের মধ্য দিয়ে একটি সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যা লোকসংস্কৃতির ওপর প্রভাব ফেলেছে। উগ্রবাদী ও সুযোগসন্ধানী একটি গোষ্ঠী এসব কাজ করছে। তবে সব ক্ষেত্রে শুধু বাইরের বাধাই একমাত্র কারণ নয়। কিছু শিল্পীর কেবল প্রচারের দিকে নজর দেওয়া এবং ধর্মীয় অনুভূতিকে গুরুত্ব না দেওয়াও সমস্যার সৃষ্টি করছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরের শাসনের শেষ দিক থেকেই সাংস্কৃতিক আয়োজন তুলনামূলকভাবে কমতে শুরু করে। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি অনুষ্ঠানের ওপর আঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বিএনপি সরকার গঠনের পরও এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। হামলা, বাধা এবং নিয়মিত চর্চার অভাবে এই আয়োজনগুলো কমে যাচ্ছে। তবে অনেকে মনে করেন, ডিজিটাল বিনোদনের বিস্তারও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কমার অন্যতম একটি কারণ।
উদাহরণ হিসেবে যাত্রাপালার হিসাব ধরলেই গ্রামীণ আয়োজন কমে যাওয়ার একটি চিত্র পাওয়া যায়। বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, শিল্পকলা একাডেমিতে নিবন্ধিত যাত্রাদলের সংখ্যা এখন ২০৫টির মতো। তবে এর মধ্যে নিয়মিত কাজ করছে মাত্র ৪০ থেকে ৫০টি দল। একসময় সারা দেশে মৌসুমজুড়ে ২০ থেকে ৫০টি মাঠে যাত্রাপালা হতো, যেখানে মাসব্যাপী মেলায় প্রতিদিন একাধিক দল পালাক্রমে অভিনয় করত। এখন সেই চিত্র প্রায় দেখাই যায় না।
চার বছর বয়স থেকে যাত্রার সঙ্গে যুক্ত লক্ষ্মী বণিকের কথায়ও হতাশার সুর ফুটে ওঠে। প্রায় ৩৪ বছর ধরে যাত্রাপালায় কাজ করছেন তিনি। তাঁর বাবা ছিলেন যাত্রাপালার ব্যবস্থাপক এবং মা ছিলেন নৃত্যশিল্পী। তিনি জানান, কয়েক বছর আগেও বছরে ৫০ থেকে ৬০ দিন কাজ থাকত। আর ছোটবেলায় কাজ পেতেন ১০০ থেকে ১৫০ দিন। এখন মাসে এক-দুই দিন কাজ পাওয়াকেও ভাগ্যের ব্যাপার বলে মনে করেন তিনি। অনেক জায়গায় গিয়ে আক্রমণের শিকার হওয়ার পাশাপাশি প্যান্ডেলে হামলা ও আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে তিনি জানান। তাঁর মতে, গত দেড় বছরে পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ হয়েছে।
যাত্রাশিল্পের শিল্পী ও কলাকুশলীদের সংগঠন যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদ জানিয়েছে, এই শিল্পের সঙ্গে সরাসরি জড়িত শিল্পীর সংখ্যা ৭ থেকে ৮ হাজার। এর মধ্যে পেশাদার শিল্পী ৫ হাজার এবং অপেশাদার বা শখের বশে অনিয়মিতভাবে যুক্ত আছেন আরও ২ থেকে ৩ হাজার মানুষ। এই শিল্পকে কেন্দ্র করে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষের পরিবার জীবিকা নির্বাহ করছে। কিন্তু আয়োজন কমে যাওয়ায় অনেকেই অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। ফলে নতুনরা যেমন এই পেশায় আসছেন না, তেমনি পুরোনোরাও পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।
বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি বেলায়েত হোসেন জানান, গত ছয় বছর ধরে যাত্রাপালা প্রদর্শনের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের কাছে আবেদন করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে অনুমতি পাওয়া যাচ্ছে না। আবার অনুমতি মিললেও নানারকম বাধা আসে। এর ফলে খোলা মাঠে বড় বড় আয়োজনগুলো প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। শিল্পীরা এখন স্থানীয় পর্যায়ে ছোট অনুষ্ঠান, মন্দিরভিত্তিক পালা বা বিভিন্ন ঋতুভিত্তিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে কোনোভাবে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।
লোকসংগীতের ক্ষেত্রেও চিত্রটি একই রকম। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, অঞ্চলভেদে বাংলাদেশে প্রায় ৫০ ধরনের লোকসংগীতের প্রচলন ছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, মুর্শিদি, মারফতি, বাউল, গম্ভীরা, কীর্তন, ঘাটু, ঝুমুর, বোলান, আলকাপ, লেটো, গাজন, বারমাসি, ধামালি, পটুয়া, সাপুড়ে ও খেমটার মতো শত শত ধারার গানের চর্চা দিন দিন কমে যাচ্ছে।
এসব গানে যেমন সাধারণ মানুষের জীবনধারা ফুটে ওঠে, তেমনি আধ্যাত্মিক ভাবনারও প্রকাশ ঘটে। গানের কথার মধ্য দিয়ে জাতির মনের গভীরের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার পরিচয় পাওয়া যায়। কিছু গানে ধর্মীয় আবেগ থাকলেও অধিকাংশ গানই মূলত বিনোদনের জন্য পরিবেশন করা হয়। আবার খেমটা, পটুয়া ও সাপুড়ে গানগুলোর সঙ্গে শিল্পীদের জীবিকা সরাসরি জড়িত। মেয়েলি গীত, সহেলি গীত ও হুদমা গীতের মতো ধারায় নারীদের মনের কথা, চাওয়া-পাওয়া ও সামাজিক অভিজ্ঞতার প্রতিফলন স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
তবে সময়ের পরিবর্তনে অঞ্চলভিত্তিক এই গানগুলো আর আগের মতো নেই। যেমন বাউলগানের কথাই ধরা যাক। জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেসকো) বাংলাদেশের বাউলগানকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ২০০৮ সালে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। অথচ সেই বাউলগানের অবস্থাও এখন বেশ নাজুক।
বাউলগানসহ লোকসংগীতের অন্যতম প্রধান জায়গা মানিকগঞ্জ জেলা। সরকারি তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী, মানিকগঞ্জের গ্রামীণ জীবনের পরতে পরতে জারিগান, সারিগান, বিচারগান, কবিগান, বাউলগান, মুর্শিদি, মারফতি, গাজীর গান, গাজনের গান, বেহুলার গান, ধুয়াগান, বারমাসি গীত, মেহেদি তোলার গীত, বিয়ের গীত, ঘেটু গান, মর্সিয়া, পাঁচালি, ওন্নি গান ও ব্যাঙের বিয়ের গানের মতো নানা আয়োজন মিশে আছে। দুই থেকে তিন দশক আগেও মানিকগঞ্জের গ্রামের বাড়ির আঙিনা, মাঠ আর বটগাছের ছায়ায় লোকসংগীতের প্রাণবন্ত আসর বসত।
তবে মানিকগঞ্জের লোকসংস্কৃতির সেই জৌলুস এখন হারিয়ে গেছে। এ বিষয়ে কথা হয় জেলার অন্যতম প্রবীণ লোকসংগীত শিল্পী সাইদুর রহমান বয়াতির সঙ্গে। ১৯৩২ সালে জন্ম নেওয়া এই শিল্পী ১০ বছর বয়স থেকে গান গাইছেন। তিনি জানান, দেশ স্বাধীনের আগেও মানিকগঞ্জ জেলায় ২০০ থেকে ২৫০ জন উঁচু মানের শিল্পী ছিলেন। ধীরে ধীরে সেই সংখ্যা কমে এখন হাতেগোনা কয়েকজনে এসে ঠেকেছে।
সাইদুর রহমান বয়াতি বলেন, ‘একসময় বাউল ও লোকসংগীত ছিল সাধনা ও দর্শনের বিষয়, কিন্তু এখন তা অনেকটাই পেশা ও ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে অনেকেই নিজেকে বাউল হিসেবে পরিচয় দিলেও প্রকৃত বাউল জীবনযাপন, দর্শন ও সাধনার সঙ্গে তাঁদের মিল নেই। ফলে গানের ভেতরের আধ্যাত্মিকতা ও গভীরতা কমে গেছে এবং সাধারণ মানুষের আগ্রহও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।’
কেবল সমতলেই নয়, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কমে যাওয়ার চিত্র দেখা গেছে পাহাড়েও। বান্দরবান প্রতিনিধি জানান, ২০১৮ সাল থেকে বন্ধ আছে পার্বত্য অঞ্চলের প্রায় দেড়শ বছরের পুরোনো রাজপুণ্যাহ উৎসব। জুমচাষিদের কাছ থেকে খাজনা আদায় এবং বার্ষিক মিলনমেলার মতো অনুষ্ঠানগুলো এই উৎসবকে কেন্দ্র করে আয়োজন করা হতো।
একইভাবে পরিবারের মঙ্গল কামনায় ম্রো সম্প্রদায়ের ‘চিয়াসদ পই’ বা গোহত্যা উৎসব এখন প্রায় বিলুপ্ত। মারমা সম্প্রদায়ের গীতিনাট্য ‘জ্যাত’ ও ‘কাপ্যা’—যা মূলত পৌরাণিক কাহিনী নিয়ে করা হতো—৩০ থেকে ৪০ বছর আগেও প্রায় প্রতিটি পাড়ায় নিয়মিত আয়োজন করা হতো। বর্তমানে এসব অনুষ্ঠান আর দেখা যায় না।
একইভাবে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী ‘গড়াইয়া’ নাট্যোৎসবও এখন আর আগের মতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে হয় না। এটি এখন কেবল আনুষ্ঠানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। চাকমা সম্প্রদায়ের ‘গেংহুলী’ পালাগানের আসরও প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় এই পালাগানের গায়কেরা রাতভর বেহালা বাজিয়ে গান গাইতেন এবং শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে সারা রাত সেই গান শুনতেন।
অন্যদিকে বম সম্প্রদায়ের ‘শেয়াকিডং’ বা শিকারের উৎসব এবং খুমি সম্প্রদায়ের যুদ্ধনৃত্যের উৎসবও এখন খুব কম দেখা যায়। সময়ের পরিবর্তন, সামাজিক রূপান্তর এবং উদ্যোগের অভাবের কারণে এসব ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক চর্চা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, গ্রামীণ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ‘তৌহিদি জনতা’ নামে বাধা দেওয়া হচ্ছে। অনেক সময় এসব অনুষ্ঠান বন্ধের জন্য অশ্লীলতা ছড়ানো এবং ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার মতো অভিযোগ তোলা হচ্ছে। আবার কখনো দেখা যায়, স্থানীয় প্রশাসন সমস্যা সমাধান করে অনুষ্ঠান চালু রাখার বদলে উল্টো তা বন্ধ করে দিচ্ছে।
যেমন, গত বছরের এপ্রিলে চৈত্রসংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রাজধানীর মহিলা সমিতি মিলনায়তনে টানা দুই দিন ‘প্রাঙ্গণেমোর’ নাট্যদলের ‘শেষের কবিতা’ নাটকের প্রদর্শনী হওয়ার কথা ছিল। সব প্রস্তুতি শেষ করে নাট্যকর্মীরা মঞ্চে ওঠার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু ‘তৌহিদি জনতার’ হুমকির চিঠি পেয়ে শেষ মুহূর্তে নাটকের প্রদর্শনী বাতিল করা হয়।
পুলিশের একটি শাখার হিসাব অনুযায়ী, গত ১৫ মাসে শুধু তৌহিদি জনতার ব্যানারেই অন্তত ১১টি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় কটূক্তির অভিযোগ তুলে বাধার মুখে পড়েছে ৩৬টি আয়োজন। এর বাইরে নাটক মঞ্চস্থ করাকে কেন্দ্র করে ভাঙচুর, বাউলগানের অনুষ্ঠানে বাধা এবং শহীদ মিনার ভাঙচুরের মতো ঘটনাও ঘটেছে।
শিল্পী ও কলাকুশলীরা জানিয়েছেন, যাত্রাপালার আয়োজন ঘিরে কিছু ক্ষেত্রে অশ্লীলতার ঘটনা ঘটেছে। আবার দু-একটি ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ভুল-বোঝাবুঝিও ছিল। তবে পুরো শিল্পের ওপর এর দায় চাপিয়ে দেওয়ার একটি প্রবণতা কাজ করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নারী যাত্রাশিল্পী নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ২০১২-১৩ সালের পর থেকে যাত্রার পরিবেশ দ্রুত খারাপ হতে শুরু করে। আয়োজকেরা শিল্পীদের খোলামেলা নাচের জন্য বাধ্য করতে থাকেন। এমনকি শিল্পীদের বাইরে শুধু নাচের জন্য আলাদাভাবে মেয়েদের নিয়ে আসা হতো। এভাবে যাত্রায় অশ্লীল নাচ ঢুকে পড়ে, যা প্রকৃত শিল্পীদের সম্মান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বদনামের ভয়ে তিনি বাধ্য হয়ে নাচ ছেড়ে দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, অশ্লীলতা বন্ধ করে প্রকৃত শিল্পীদের জন্য কাজের সুন্দর পরিবেশ তৈরি করলে যাত্রাশিল্প টিকে থাকত।
আবার উৎসবগুলোকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডও এসব অনুষ্ঠানকে হুমকির মুখে ফেলছে। গত ৩১ মার্চ চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় এমন একটি ঘটনা ঘটেছে। সেখানে সাত দিনব্যাপী এক মেলায় সাধক হজরত শাহ সোলায়মান (রহ.) ওরফে লেংটা বাবার মাজারের সেবক মতিউর রহমান ওরফে লাল মিয়াকে কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। মতিউর রহমান জানান, মাদক সেবন ও জুয়া খেলায় বাধা দেওয়ায় তাঁকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করা হয়েছে।
এমন ঘটনার পাশাপাশি আধিপত্য বজায় রাখতে স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরোধিতা, লোকসংস্কৃতির ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে অসচেতনতা এবং কোথাও কোথাও রাজনৈতিক কারণেও বাধা দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। যেমন, গত বছরের ৭ অক্টোবর সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ১৬৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ‘নাচ-গান হওয়ার খবর শুনে’ একদল ব্যক্তি বাধা দিতে যান। পরে শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে তাঁদের জানানো হয় যে, সেখানে নাচ-গান নয়, বরং ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর স্মরণে অনুষ্ঠান হবে। এটি শোনার পর তাঁরা চলে যান।
মঞ্চ নাটকসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক আয়োজনে শিল্পীরা কী ধরনের বাধার মুখে পড়ছেন, তা উঠে এসেছে নাট্যকর্মী পলি পারভীনের বক্তব্যে। নাট্যদল আরশিনগরের এই সদস্য বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে অনেক জায়গায় নাটক মঞ্চস্থ করার প্রশাসনিক অনুমতি পেতে আগেভাগেই নাটকের পান্ডুলিপি জমা দিতে হচ্ছে। ময়মনসিংহে এভাবে পান্ডুলিপি জমা দিয়ে অনুমতি পাওয়ার পরেও দলবদ্ধ হামলার হুমকি আসায় শেষ পর্যন্ত নাটকের আয়োজন বাতিল করতে হয়েছে।
শিল্পী ও আয়োজকেরা বলছেন, লোকসংস্কৃতি শুধু বিনোদন নয়; এটি গ্রামীণ সমাজের স্মৃতি, বিশ্বাস ও পরিচয়ের বাহক। কিন্তু হামলা, বাধা, সামাজিক চাপ ও প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার কারণে সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ছে। মাঠ ফাঁকা হচ্ছে, মঞ্চের আলো নিভছে এবং শিল্পীরা পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও নাট্যকর্মী সামিনা লুৎফা বলেন, লোকসংস্কৃতির ওপর বাড়তে থাকা হামলা ও বাধার পেছনে মূলত সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের দ্বন্দ্ব কাজ করছে। বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত সংস্কৃতি ছিল বহুমুখী ও সবার জন্য উন্মুক্ত। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভিন্ন ধরনের ধর্মীয় ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সেই ধারার সংঘাত তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সুফি ঐতিহ্যভিত্তিক গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন একধরনের ধর্মীয় ব্যাখ্যার বিরোধ অনেক ক্ষেত্রে মাজার, ওরস বা লোকজ আয়োজনের ওপর আক্রমণে রূপ নিচ্ছে। এর সঙ্গে জায়গা দখল, আধিপত্য ও রাজনৈতিক স্বার্থও যুক্ত হয়েছে, যার ফলে একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অনেকগুলো হামলার ঘটনা কার্যকরভাবে দমন না করায় তা সহিংসতাকে উৎসাহিত করেছে—এমন মন্তব্য করে সামিনা লুৎফা বলেন, বর্তমান সরকারের কাছে হামলা বন্ধে আইনের শাসন জোরদারের প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে কথার সঙ্গে কাজের মিল এখনো স্পষ্ট নয়। রাষ্ট্র সক্রিয় না হলে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এই ভয়ের পরিবেশ কাটবে না।

Comments
Comments