[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

গাফিলতিতে ফুরিয়েছে টিকার মজুত, সিরিঞ্জ সংকটে থমকে আছে টিকাদান

প্রকাশঃ
অ+ অ-
হামে আক্রান্ত শিশুদের কাউকে কাউকে করতে হচ্ছে নেবুলাইজ। মঙ্গলবার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট পাবনা জেনারেল হাসপাতালে। গত ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত ৬টি শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে এ হাসপাতালে। এ নিয়ে এখানে হামে আক্রান্ত মোট ভর্তি শিশুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫–এ  | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নেওয়া কিছু সিদ্ধান্তের কারণে সব ধরনের টিকা কেনায় বিলম্ব হয়েছে। সম্প্রতি হাম-রুবেলার টিকা পাওয়া গেছে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় হাম-রুবেলা ক্যাম্পেইনের জন্য টিকা হাতে এসেছে, কিন্তু সিরিঞ্জ এখনও আসেনি। তাই দেশব্যাপী ক্যাম্পেইন শুরু করতে দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগবে।

শিশুদের নিয়মিত টিকা নিশ্চিত না করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং দাতা সংস্থা সময় ব্যয় করেছে টিকা কেনার প্রক্রিয়া ঠিক করতে—সরকার সরাসরি কিনবে নাকি ইউনিসেফের সহায়তা নেবে, আর্থিক লাভ-লোকসান কী হবে—এসব বিষয় নিয়ে। ফলে টিকার মজুত ফুরিয়ে গেছে এবং জাতীয় ক্যাম্পেইনের সময় পিছিয়ে গেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকা কেনার দেরি আসলে গাফিলতি।

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, বরিশাল এবং ময়মনসিংহ—এই ছয় জেলায় হাম বেশি ছড়িয়েছে। ইতিমধ্যে ৭০টির বেশি মানুষ হামে আক্রান্ত হয়েছেন। মারা গেছেন পঞ্চাশের বেশি। অন্যদিকে ইপিআই কার্যালয় জানিয়েছে, হামের সঙ্গে সঙ্গে অন্তত ২১ জন রুবেলায় আক্রান্ত হয়েছে।

 
জনস্বাস্থ্যবিদেরা ঝুঁকির কথা আগেই বলে আসছিলেন। কর্তৃপক্ষ কথা কানে নেয়নি, গাফিলতি দেখিয়েছে।
মুশতাক হোসেন, জনস্বাস্থ্যবিদ ও আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখন বিলম্ব না করে সরকারের ত্বরিত কর্মসূচি হাতে নেওয়া উচিত। গুরুত্ব না দিলে হাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আছে। একজন রোগী ১৬ থেকে ১৮ জনের মধ্যে হাম ছড়াতে পারে।

দেশে হামের টিকা সাধারণত দুইভাবে দেওয়া হয়। দেশের প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টিকাকেন্দ্রে নিয়মিত এই টিকা দেওয়া হয়। গ্রামাঞ্চলে সরকারের মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা এই টিকা দেন। সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য শহরে টিকা দেন সিটি করপোরেশনের কর্মী ও এনজিও কর্মীরা।

এর বাইরে কয়েক বছর পরপর জাতীয় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে দেশব্যাপী কয়েক দিনের মধ্যে সব শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। নিয়মিত কর্মসূচিতে ৯ মাস বয়সী শিশুকে হামের প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সী শিশুকে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। জাতীয় ক্যাম্পেইনের সময় ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়স পর্যন্ত সব শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। দেশে সর্বশেষ জাতীয় ক্যাম্পেইন হয়েছিল ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে।

টিকার সার্বিক বিষয় জানার জন্য প্রতিবেদক বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান, সাবেক স্বাস্থ্যসচিব মো. সাঈদুর রহমান, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক আবু জাফর, ইপিআইয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদসহ আরও কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেন। কেউ কেউ নাম প্রকাশ করতে চাননি, কেউ কেউ শর্তে কথা দিয়েছেন।

দেশের স্বাস্থ্য খাতের বড় কর্মসূচি ছিল স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচি। দাতা সংস্থার সহায়তায় পাঁচ বছর মেয়াদি এই কর্মসূচি শুরু হয়েছিল ১৯৯৮ সালে। এটি ‘সেক্টর প্রোগ্রাম’ নামে বেশি পরিচিত। কর্মসূচিটি বাস্তবায়িত হতো অপারেশন প্ল্যান বা ওপির মাধ্যমে। চতুর্থ কর্মসূচি (২০১৭-২০২২) শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২২ সালে। পরে তা টেনে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত আনা হয়। এই উন্নয়ন কর্মসূচির পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব খাতের কর্মকাণ্ডও চলত।

সেক্টর প্রোগ্রামের মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য অপারেশন প্ল্যানের আওতায় ইপিআই পরিচালিত হতো। গ্যাভির আর্থিক সহায়তায় ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা হতো। কোভিডের সময়ও একইভাবে টিকা কেনা হয়েছে। সেই সময় টিকা কেনায় সময় ও জটিলতা তুলনামূলকভাবে কম ছিল।

২০১৭ সালের দিকে চতুর্থ সেক্টর প্রোগ্রাম শুরু হওয়ার আগে একটি আলোচনা হয়েছিল, বাংলাদেশের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ছে, দাতানির্ভরতা কমছে। তাই সেক্টর প্রোগ্রামের আর প্রয়োজন নেই, ধীরে ধীরে বের হয়ে আসা উচিত এবং সবকিছু রাজস্ব খাতে চলে আসবে। যদিও সেই আলোচনা পূর্ণভাবে এগোয়নি। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে পঞ্চম সেক্টর প্রোগ্রামের বিভিন্ন অপারেশন প্ল্যান তৈরির কাজ শুরু হয়।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেক্টর প্রোগ্রাম বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেয়। বেশ কয়েকটি সভা শেষে ২০২৫ সালের ৬ মার্চ অনুষ্ঠিত সভায় সেক্টর প্রোগ্রাম চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়। ওপির মাধ্যমে টিকা কেনার ব্যবস্থা বন্ধ করা হয়। মন্ত্রণালয় একবার সিদ্ধান্ত নেয়, ইউনিসেফকে বাদ দিয়ে সরাসরি টিকা কিনবে। এতে অর্থ মন্ত্রণালয় নানা প্রশ্ন তোলে। পরে মন্ত্রণালয় আবার টিকা কেনায় ইউনিসেফকে যুক্ত করে। এসব করতে গিয়ে কয়েক মাস সময় চলে যায়।

একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে একবার জানানো হয়, ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কিনলে ১৭.৫ শতাংশ চার্জ দিতে হয়—এর মধ্যে ১২ শতাংশ পরিবহন এবং ৫.৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জ। মন্ত্রণালয় নিজে কিনলে অর্থ সাশ্রয় হবে। মন্ত্রণালয় যদি সরাসরি কেনার উদ্যোগ নিত, তখন অর্থ মন্ত্রণালয় আপত্তি জানিয়েছিল যে, এ বিষয়ে অনুমোদন লাগবে। অনুমোদন চূড়ান্ত হওয়ার আগেই মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় জানিয়েছে, ২০২২–২৩ ও ২০২৩–২৪ অর্থবছরের কিছু আর্থিক বিষয়ে নিষ্পত্তি হয়নি। এরপর আবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, ইউনিসেফের মাধ্যমেই টিকা কেনা হবে। এ ধরনের জটিলতা চলেছে দীর্ঘ সময় ধরে।

এবার দেখা যাচ্ছে, প্রস্তুতিতেও ঘাটতি রয়েছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, জাতীয় ক্যাম্পেইন হবে এপ্রিল মাসে। এখন সেটি পেছানো হচ্ছে।

এসব বিষয়ে জানতে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মতামত দিতে অস্বীকার করেন এবং বলেন, ‘গণমাধ্যমগুলো সঠিক তথ্য তুলে ধরছে না। আমার বা বিশেষ সহকারীর সঙ্গে কথা বলে রিপোর্ট করা উচিত ছিল।’ সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান কোনো মন্তব্য করতে অক্ষমতা প্রকাশ করেন। দায়িত্বে থাকা সাবেক স্বাস্থ্যসচিব মো. সাঈদুর রহমান বলেন, ‘আমরা টিকার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছি। সময় নষ্ট হওয়ার কোনো কারণ ছিল না।’

কোন টিকা আছে, কোন টিকা নেই—এ নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা দেখা দিয়েছে। রোববার ইপিআই থেকে দেওয়া তথ্যে দেখা যায়, হামসহ শিশুদের ১০টি রোগ প্রতিরোধে ব্যবহৃত কিছু টিকার মজুত নেই। এসব টিকার মধ্যে রয়েছে—বিসিজি, পেন্টা, বিওপিভি, পিসিভি, এমআর ও টিডি।

ইপিআইয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, ক্যাম্পেইনের জন্য পর্যাপ্ত হামের টিকা রয়েছে।

একটি সূত্র জানিয়েছে, টিকা কেনার প্রক্রিয়া শুরুতে দেরি হলেও ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা দেশে আসছে। ক্যাম্পেইন পরিচালনার জন্য প্রায় দুই কোটি ডোজ টিকা এখন দেশে রয়েছে।

টিকাবিষয়ক জাতীয় কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপের সভা হয়েছে। এই গ্রুপের এক সদস্য জানান, জুনের মধ্যে হামের টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ৫৮ জেলায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী সব শিশুকে এবং বাকি ৬টি জেলায় ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী সব শিশুকে টিকা দেওয়া হবে। এই ছয় জেলায় টিকাদানের হার কম। জেলাগুলো হলো—ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, চাঁদপুর, পটুয়াখালী ও বাগেরহাট।

হাতে টিকা থাকার পরও ক্যাম্পেইন শুরুতে দেরি কেন—এ প্রশ্নের জবাবে ইপিআইয়ের উপপরিচালক বলেন, টিকার সিরিঞ্জ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের জন্য আর্থিক সহায়তা দেয় গ্যাভি, কিন্তু সেই অর্থ এখনো পাওয়া যায়নি। মে মাসে ৭২ লাখ, জুনে ৮০ লাখ এবং জুলাইয়ে ৫৬ লাখ সিরিঞ্জ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। দ্রুত সিরিঞ্জ কেনার জন্য গ্যাভির কাছে জরুরি সহায়তা চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় ক্যাম্পেইনের আগে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় সভা, প্রচার-প্রচারণাসহ কিছু প্রস্তুতিমূলক কাজ রয়েছে। পাশাপাশি এসএসসি পরীক্ষা সামনে থাকায় সব দিক বিবেচনা করে চূড়ান্ত সময় নির্ধারণ করা হবে।

গত এক সপ্তাহে বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজখবর নিয়ে জানা গেছে, মার্চ মাসে সারা দেশে হামে ৫৬টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মৃত্যুর কারণ বা হাম কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, তা নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে এখনও অনেক শিশু টিকা থেকে বঞ্চিত।

জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন জানিয়েছেন, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আগেই ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করে আসছিলেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তা আমলে নেননি, যা গাফিলতিরই প্রমাণ। তিনি আরও বলেন, যারা আক্রান্ত হয়েছে এবং যাদের অবস্থা জটিল, তাদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত টিকার ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি সংস্পর্শের হিসাব (কনটাক্ট ট্রেসিং) করতে হবে, নতুন রোগী চিহ্নিত করতে হবে এবং আক্রান্ত শিশুদের সঙ্গে সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের আলাদা করে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন