মানবাধিকার কমিশন ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে’ শূন্য, বিদায়ী কমিশনারদের খোলাচিঠি
| জাতীয় মানবাধিকার কমিশন |
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় পদত্যাগ করেছেন কমিশনের সদস্যরা। পদত্যাগের পর তাঁরা একটি খোলাচিঠিও লিখেছেন।
বিদায়ী কমিশনের সদস্য নূর খান অবশ্য বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের পদত্যাগের কথা বলা হয়নি। তবে পুরো বিষয়টি একধরনের অস্পষ্টতার মধ্যে রাখা হয়েছে। তিনি জানান, যেহেতু তাঁরা আগের অধ্যাদেশের ভিত্তিতে দায়িত্ব পেয়েছিলেন এবং এখন সেটি কার্যকর নেই, তাই পদত্যাগ করাকেই সঠিক মনে করেছেন।
এদিকে মানবাধিকার কমিশনের সচিব কুদরত-এ-ইলাহী জানান, অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ায় আগের কমিশন আর নেই। তবে কমিশন সদস্যদের ‘খোলাচিঠি’ তিনি এখনও পড়েননি বলে উল্লেখ করেন।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (বাতিল ও পুনর্বহাল) বিল কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলটি দ্রুত কার্যকর হবে বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই এটি কার্যকর হবে।
বিরোধী দলের আপত্তি নাকচ করে ওই অধ্যাদেশ বাতিল এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ সালে করা ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন’ আবার চালু করতে সংসদে এই বিল পাস হয়।
চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের একেবারে শেষ দিকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কমিশনের সভাপতি হিসেবে নিয়োগ পান উচ্চ আদালতের সাবেক বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী। বাছাই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি এই নিয়োগ দেন। কমিশনের সদস্য হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত গুম কমিশনের সদস্য মো. নূর খান, নাবিলা ইদ্রিস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মো. শরিফুল ইসলাম ও মানবাধিকারকর্মী ইলিরা দেওয়ান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই সময়ে গঠিত কমিশন নভেম্বর মাস পর্যন্ত টিকে ছিল। ৭ নভেম্বর সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তা কারওয়ান বাজারে কমিশনের কার্যালয়ে যান। তাঁরা দিনভর সেখানে অবস্থান করেন। এরপর সন্ধ্যার দিকে পদত্যাগ করেন তৎকালীন চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমদ, সার্বক্ষণিক সদস্য মো. সেলিম রেজা এবং অন্য চার সদস্য বিশ্বজিৎ চন্দ, অধ্যাপক তানিয়া হক, আমিনুল ইসলাম ও কংজুরী চৌধুরী। আরেক সদস্য কাওসার আহমেদ এর আগেই পদত্যাগ করেছিলেন। কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা তখন জানান, এসব সদস্যকে ‘জোর করে’ পদত্যাগ করানো হয়েছিল।
এরপর দীর্ঘদিন মানবাধিকার কমিশনের নিয়োগ বন্ধ রাখে তৎকালীন সরকার। পরবর্তীতে জারি করা হয় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫। ওই বছরের ৩০ অক্টোবর উপদেষ্টা পরিষদে এটি চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। সেই অধ্যাদেশের ভিত্তিতেই চলতি বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি বিদায়ী সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
খোলাচিঠি
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা অধ্যাদেশ বাতিল হওয়ায় ওই কমিশনের সদস্যরা পদত্যাগ করে যে খোলাচিঠি দিয়েছেন, তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই পাওয়া যাচ্ছে।
‘সদ্য বিদায়ী জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কমিশনারদের খোলাচিঠি’ শিরোনামে চিঠিটিতে ‘সংসদে উপস্থাপিত ভুল তথ্যের জবাব’, ‘অধ্যাদেশগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের প্রকৃত আপত্তিসমূহ’ এবং ‘ভবিষ্যৎ আইনের গুণগত মান বিচারের প্রস্তাবনা’—এমন তিন উপশিরোনামে নিজেদের অবস্থান এবং অধ্যাদেশ রহিত হওয়ার বিষয়ে বিভিন্ন মতামত তুলে ধরা হয়।
চিঠির শুরুতে বলা হয়েছে, ‘সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলো সংসদে পাস না হওয়ায়, ভুক্তভোগীরা আমাদের বারবার প্রশ্ন করছেন, “এখন আমাদের কী হবে?” তাঁদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই এই খোলাচিঠি।
‘আমরা পাঁচজন সদ্য বিদায়ী মানবাধিকার কমিশনার। স্ব-স্ব ক্ষেত্রে আমাদের কর্মজীবন মানবাধিকার সুরক্ষায় নিবেদিত ছিল। এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতার দরুন, ভুক্তভোগীদের বেদনা, আইন প্রয়োগকারীদের দৈনন্দিন প্রতিকূলতা এবং আইনাঙ্গনের জটিলতার সাথে আমরা সুপরিচিত। তাই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিস্বার্থে নয়, ভুক্তভোগীদের প্রতি কর্তব্যবোধ থেকে আজ আমরা কলম হাতে নিয়েছি।’
Comments
Comments