অধ্যাদেশ ও সংস্কার নিয়ে সরকারের অবস্থানে পরিবর্তন
| জাতীয় সংসদ ভবন | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের ভাগ্য নির্ধারণ হলো জাতীয় সংসদে। সংসদের চলতি প্রথম অধিবেশনে গত শুক্রবার পর্যন্ত এসব অধ্যাদেশের মধ্যে ১২০টির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৯১টি বিল পাসের মাধ্যমে অধ্যাদেশগুলো কার্যকর করা হয়। তবে বিরোধী দলের আপত্তি সত্ত্বেও ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। মজার বিষয় হলো, নির্বাচনের আগে বিএনপি এগুলোর কয়েকটির পক্ষে থাকলেও সংসদে তারা এই অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপান্তরের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
সরকারি দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যেসব অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে, সেগুলো সময়োপযোগী করে নতুন বিল হিসেবে আনা হবে। অন্যদিকে বিরোধী দল বলছে, এসব অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে স্বৈরাচারের ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হলো, যার দায় তারা নেবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি গণভোটসহ কয়েকটি অধ্যাদেশের পক্ষে থাকলেও সংসদে সেগুলো পাস না হওয়ায় গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে সন্দেহ থেকে যাচ্ছে।
শুক্রবার পর্যন্ত টানা ছয় দিন সংসদে ১২০টি অধ্যাদেশের নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে বহুল আলোচিত গণভোট অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিল করেছে সংসদ। বাতিল বিল পাসের মাধ্যমে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগসহ সাতটি অধ্যাদেশের অধীনে নেওয়া কার্যক্রমের বৈধতা দেওয়া হয়েছে। তবে গণভোট, দুদক ও গুমসহ ১৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে কোনো সুরাহা হয়নি। এর ফলে এসব অধ্যাদেশের অধীনে অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো বৈধ থাকবে কি না, তা নিয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে। এমনকি গণভোট অধ্যাদেশের অধীনে হওয়া ‘গণভোট’সহ অন্যান্য কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানিম হোসেইন শাওন বলেন, যেসব অধ্যাদেশ সরকারের পছন্দ হয়নি, সেগুলোর সুরক্ষা দেওয়া হয়নি। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং সচিবালয় অধ্যাদেশের অধীনে বেশ কিছু কাজ হয়েছে। নিয়োগপ্রাপ্ত ২৫ জন বিচারকের বিষয়ে সরকারি দল সন্তুষ্ট, আবার সচিবালয় অধ্যাদেশের কাজগুলো রক্ষা না করলে বিশৃঙ্খলা হতে পারে। এ কারণেই সরকার এই অধ্যাদেশগুলোকে হেফাজত বা সুরক্ষা দিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আইনজীবীদের মতে, নির্বাচনের আগে বিএনপির শীর্ষ নেতারা গণভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। কিন্তু সংসদে গণভোট অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত না করে বাতিল করা হয়েছে। এতে মনে হচ্ছে, নির্বাচনের পর গণভোট নিয়ে বিএনপির অবস্থান বদলে গেছে। দলটির সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। যদি তাঁরা গণভোটের সুরক্ষা দিতে চাইতেন, তবে গণভোটের রায় অনুযায়ী তাঁরা শপথ নিতেন।
তবে ব্যারিস্টার তানিম হোসেইন শাওন মনে করেন, গণভোটের সময় অধ্যাদেশটি কার্যকর ছিল, তাই ওই ভোট বৈধ ছিল। যেহেতু অধ্যাদেশটির কাজ ছিল শুধু গণভোট করা এবং তা সম্পন্ন হয়েছে, তাই এটি এখন বাতিল হলেও গণভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠার সুযোগ নেই।
অন্যদিকে, 'জুলাই জাতীয় সনদে' সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় করার বিষয়ে বিএনপির কোনো আপত্তি ছিল না। এমনকি এটি দলটির নির্বাচনী ইশতেহারেও ছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে বিএনপি ও জামায়াতসহ ২৫টি দলের সম্মতির ভিত্তিতেই অন্তর্বর্তী সরকার এই সচিবালয় স্থাপনের অধ্যাদেশ জারি করেছিল। কিন্তু এখন সরকারি দল সেই অধ্যাদেশটিও বাতিল করেছে।
এছাড়া ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ এবং ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন)’ অধ্যাদেশ পাসের বিষয়ে সংসদীয় কমিটিতে বিএনপি ও জামায়াত একমত হয়েছিল। তবে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের অভিযোগ, সন্ত্রাসবিরোধী আইনটি হুবহু বিল আকারে পাসের ঠিক আগ মুহূর্তে কপি দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার জাদুঘর বিলে বিএনপির এক সংসদ সদস্য সংশোধনী আনলে বিরোধী দলের সদস্যরা আপত্তি জানান। তাঁরা অভিযোগ করেন যে, সরকারি দল রাজনৈতিক সমঝোতা ভেঙেছে। জবাবে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, সমঝোতা হয়েছিল বিশেষ কমিটিতে, আর সংশোধনী এনেছেন একজন ব্যক্তিগত সদস্য; যা তিনিও আগে জানতেন না। তবে তিনি সংশোধনীর কিছু যৌক্তিকতা তুলে ধরেন।
সংসদে বিতর্কের একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বিভিন্ন ব্যাখ্যা দিলেও তা বিরোধী দলকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। সরকারি দলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগ তুলে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন বিরোধী সদস্যরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মনে করেন, যেসব আইনে কোনো বিতর্ক ছিল না, সেগুলো পাস করা সরকারি দলের জন্য ভালো হতো। এতে বিরোধী দলসহ পুরো জাতির কাছে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ত। রাজনৈতিক ঐকমত্য হওয়া বিষয়গুলো আইনে পরিণত না করায় ভবিষ্যতে বিএনপির দেওয়া আশ্বাস নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ এবং রাজস্ব নীতি সংক্রান্ত অধ্যাদেশের অধীনে কোনো কাজ শুরু না হওয়ায় সেগুলোকে বিশেষ সুরক্ষা দেওয়া হয়নি। রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দুটি আলাদা বিভাগে ভাগ করার যে বিধান আগের সরকার করেছিল, তা নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ ছিল। এখন অধ্যাদেশটি বাতিল হওয়ায় এনবিআর আর বিভক্ত হচ্ছে না।
একইভাবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংশোধন অধ্যাদেশের অধীনে নতুন কোনো কমিশন নিয়োগ না হওয়ায় এটি বাতিল করা হয়েছে এবং দুদক এখন আগের পুরনো আইনেই পরিচালিত হবে।
এছাড়া পুলিশ কমিশন ও তথ্য অধিকার সংশোধনসহ বাতিল হওয়া আরও কয়েকটি অধ্যাদেশের বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর আপত্তি ছিল। তারা এগুলো সংসদে আলোচনার জন্য তোলার দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা করা হয়নি। এর প্রতিবাদে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, এই অধ্যাদেশগুলো বাতিলের ফলে স্বৈরাচারের পুনর্জন্মের সুযোগ তৈরি হবে, যার দায় তারা নেবেন না।
তবে সরকারি দল জানিয়েছে, গুম প্রতিরোধসহ বাতিল হওয়া গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো আরও যুগোপযোগী করে নতুন বিল হিসেবে আনা হবে। সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম জানান, আগামী বাজেট অধিবেশনে সব বিল উত্থাপন করা হবে এবং তখন বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ থাকবে।
Comments
Comments