‘বাবা হাতজোড় করেছিল, কথা বলার সুযোগ চেয়েছিল’
![]() |
| ঘটনার পর থেকে এলাকায় বিপুল পরিমানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
‘দুপুরের দিকে আমি দরবারের গেটের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। দেখলাম বেশ কয়েকজন মানুষ রড ও লাঠি নিয়ে মিছিল করছে। এরপর দরবারের গেট ভাঙচুর শুরু করল। তারা স্লোগান দিতে দিতে দরবারের ভেতরে ঢুকে গেল। কয়েকজন ভাঙচুর শুরু করে। দরবারের দোতলায় বাবার (পীর) ঘরের সামনে যায় তারা। দরজা লাথি দিয়ে ভেঙে ভেতরে ঢুকে বাবাকে গলা ধরে টেনে বের করে। এরপর হাতে থাকা রড দিয়ে তাঁকে মারতে থাকে। এলোপাতাড়ি মাথায় আঘাত করে এবং টেনেহিঁচড়ে নিচে নামায়। সেখানে একজন বলছিল, এখনো বেঁচে আছে, মার ওকে।’
কথাগুলো বলছিলেন কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগরে নিহত পীর আবদুর রহমানের ভক্ত জামিরন। তাঁর পাশে বসে ছিলেন আরেক ভক্ত রিমা খাতুন। হামলার সময় জামিরন তাঁর ডান হাতের মাঝখানের আঙুলে আঘাত পেয়েছেন। তিনি দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন।
রোববার বেলা ১১টার দিকে দরবারের সামনে একটি বাড়িতে বসে জামিরনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে থাকেন, বাবাকে মারতে মারতে নিচে নিয়ে আসা হয়। প্রথম যখন বাবাকে বের করা হয়, তখন বাবা হাতজোড় করেছিলেন। তিনি কথা বলার সুযোগ চেয়েছিলেন। কিন্তু যেভাবে এলোপাতাড়ি মারা হচ্ছিল, কেউ তাঁর কথা শোনেনি। নিচে নামিয়ে যখন রড দিয়ে মাথায়, মুখে ও নাকের ওপর আঘাত করা হচ্ছিল, তখন একবার শুধু তাঁকে বলতে শোনা গেছে ‘ইয়া মুরশিদ’; এরপর বাবা আর কোনো কথা বলতে পারেননি।
জামিরন আরও বলেন, যাঁরা লাঠিসোঁটা নিয়ে এসেছিলেন, তাঁরা সংখ্যায় প্রায় ৮০ থেকে ৯০ জন। তাঁদের বয়স ১৫ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে, কেউ কেউ বয়সে বড় ছিলেন। তিনি আরও বলেন, ‘তাদের আসা দেখে আমরা ভেবেছিলাম হয়তো কোনো আলোচনা করতে আসছে। কিন্তু তারা যে ভাঙচুর ও হামলা করবে এবং বাবাকে মেরে ফেলবে, তা বুঝতে পারিনি। পরে বুঝেছি তারা প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিল। পরিকল্পনা করেই বাবাকে হত্যা করা হয়েছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীম পবিত্র কোরআন সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন—কয়েক বছর আগের ৩০ সেকেন্ডের এমন একটি ভিডিও গত শুক্রবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। এর জেরে গতকাল সকালে শামীমের দরবার থেকে আধা কিলোমিটার দূরে আবেদের ঘাট এলাকায় শতাধিক মানুষ জড়ো হয়। এরপর দুপুরের দিকে তাঁরা ওই দরবারে হামলা চালায় এবং পুলিশের উপস্থিতিতেই শামীমকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১৮ মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, গ্রামের পাকা সড়কে শতাধিক মানুষ স্লোগান দিয়ে শামীমের দরবারের দিকে যাচ্ছেন। মিছিলে থাকা লোকজনের একটি অংশ তাঁর দরবারের একতলা দুটি পাকা ভবন ও একটি টিনশেড ঘরে ঢুকে পড়ে। তাঁরা ভবনের ছাদসহ ঘরগুলোতে ভাঙচুর চালান এবং আগুন ধরিয়ে দেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, হামলার সময় ওই দরবারের ভেতরে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে পাঁচ থেকে সাতজন আহত হয়েছেন। অন্যরা দৌড়ে পালিয়ে যান। দমকল বাহিনীর সদস্যরা এসে আগুন নেভান।
কুষ্টিয়ায় হত্যার শিকার পীর আবদুর রহমানের লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। রোববার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে এই ময়নাতদন্ত হয়। হাসপাতালের একজন চিকিৎসক ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন।
জানতে চাইলে জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা হোসেন ইমাম বলেন, নিহত আবদুর রহমানের মুখমণ্ডলে ১৫ থেকে ১৮টি এলোপাতাড়ি কোপের দাগ দেখা গেছে। এ ছাড়া শরীরের অন্যান্য জায়গায় জখম রয়েছে। মূলত মুখমণ্ডলের আঘাতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে পুলিশ লাশ নিয়ে গেছে।
কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ বলেন, লাশ দৌলতপুরের ফিলিপনগর গ্রামে নেওয়া হয়েছে। গ্রামবাসী এবং পরিবারের সম্মতিতে লাশ ফিলিপনগর গ্রামের কবরস্থানে দাফনের প্রস্তুতি চলছে। দাফন শেষ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পুরো গ্রামে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।

Comments
Comments