চিকিৎসক কামরুলের হাসপাতালে ‘চাঁদাবাজি’, ছুটে গেলেন যুবদল নেতারা
![]() |
| অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলামের হাসপাতালে যুবদলের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
ঢাকার শ্যামলীতে আলোচিত কিডনি চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলামের হাসপাতালে যুবদল নেতা পরিচয়ে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। এই খবর পাওয়ার পর গভীর রাতে সেখানে গিয়ে কথা বলেছেন যুবদলের শীর্ষ নেতারা।
যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়নসহ একটি প্রতিনিধিদল শুক্রবার রাত দেড়টার দিকে সিকেডি ইউরোলজি হাসপাতালে গিয়ে অধ্যাপক কামরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করেন।
স্বল্প খরচে কিডনি চিকিৎসা ও প্রতিস্থাপনের জন্য অধ্যাপক কামরুলের বেশ পরিচিতি রয়েছে। চিকিৎসা বিদ্যায় অবদান রাখার জন্য ২০২২ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন। তাঁর হাসপাতালে যুবদল পরিচয়ে স্থানীয় মঈন নামে এক ব্যক্তি ৫ লাখ টাকা দাবি করেছেন বলে সন্ধ্যায় দৈনিক কালের কণ্ঠের ফেসবুক পাতায় একটি সংবাদ প্রচার করা হয়। এরপর রাতেই যুবদল নেতারা শ্যামলীর ওই হাসপাতালে যান। তাঁরা অধ্যাপক কামরুল ইসলামের কাছে পুরো ঘটনা জানতে চান এবং তাঁকে আশ্বস্ত করেন।
অধ্যাপক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘৫ আগস্টের পর শ্যামলীর চার নম্বর সড়কের বাসিন্দা মঈন নামে এক ব্যক্তি হাসপাতালে খাবার সরবরাহের ঠিকাদারি কাজ নেন। কিন্তু মঈন খাদ্যপণ্যের অনেক বেশি দাম ধরছিলেন দেখে তাঁকে সম্প্রতি বাদ দেওয়া হয়।’
অধ্যাপক কামরুল ইসলাম যুবদল নেতাদের বলেন, ‘আমি আমার রোগীদের খাবারের কোনো বিল ধরি না। এখানকার কর্মীরাও হাসপাতালে খাবার খান। খুব সামান্য লাভে আমরা হাসপাতালটি চালাই। সে খাবারদাবারের অনেক বেশি দাম ধরছিল বলে তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি নিজে কৃষি মার্কেটে গিয়ে তদারকি করে জিনিসপত্র কিনে আনি। এরপর সে লোকজন নিয়ে এসে হাসপাতালের কর্মীদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার শুরু করে এবং টাকা চায়।’
ওই ব্যক্তি কি নিজেকে যুবদল নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন কি না, তা জানতে চান সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি মুন্না।
এ সময় অধ্যাপক কামরুল বলেন, ‘সে বলছে সে যুবদলের নেতা, কমিশনার নির্বাচন করতে চায়। আমি বিষয়টি নিয়ে সাধারণ ডায়েরি করেছি, এখানকার নেতাদেরও জানিয়েছি। কিন্তু তার এত বেশি প্রভাব যে কেউ কিছু করেনি।’
পরে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম নয়ন বলেন, ‘আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি সে আসলে আমাদের সংগঠনের কেউ না। এরা আমাদের সংগঠনের নাম ব্যবহার করে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলে দিয়েছেন এসব বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এমন ঘটনা ঘটলে আমরা কাউকে ছাড় দিই না।’
নয়ন আরও বলেন, ‘আগের সময়ে যেভাবে এ ধরনের ঘটনা অস্বীকার করা হতো, আমরা তেমনটি করি না। আমরা আমাদের অনেক নেতা-কর্মীকে শাস্তি দিয়েছি, প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছি, এমনকি কাউকে কাউকে পুলিশেও ধরিয়ে দিয়েছি।’
পরে নয়ন তাঁর ফোন থেকে র্যাবের একজন কর্মকর্তাকে ফোন করে মঈন নামের ওই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের অনুরোধ জানান। স্পিকারে রাখা নয়নের ফোন থেকেই র্যাব কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন কামরুল ইসলাম।
পরে অধ্যাপক কামরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার এখানে কর্মীরা তিন বেলা খাবার খান, রোগীদেরও তিন বেলা খাবার দেওয়া হয়। আমি রোগীদের কাছ থেকে খাবারের জন্য বাড়তি কোনো বিল নিই না; ওটা শয্যা ভাড়ার সঙ্গেই সমন্বয় করে দেওয়া হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের রোগীদের বেশির ভাগই গ্রাম থেকে আসা। তাদের যে খাবার দিতে আমার হয়তো ২০০ টাকা খরচ হয়, সেই খাবার বাইরে কিনে খেতে গেলে তাঁদের হাজার টাকা খরচ হতো। সেই চিন্তা থেকেই এই ব্যবস্থা করা। হাসপাতালের একটি কেনাকাটা কমিটি আছে, যারা সবচেয়ে কম দামে যার কাছে পায়—তার কাছ থেকেই কেনাকাটা করে।’
অধ্যাপক কামরুল বলেন, ‘কিন্তু এই ছেলেটা এসে ৬৬ টাকা কেজির চালের দাম ধরছিল ৭৭ টাকা। ১০০০ ডিমের দাম নিচ্ছিল সাড়ে নয় হাজার টাকা, যা আমি নিজে গিয়ে ওই দোকান থেকেই ৮ হাজার ১০০ টাকায় নিয়ে এসেছি। এভাবে সাশ্রয় না করলে তো আমার পক্ষে হাসপাতাল চালানো সম্ভব না।’
অধ্যাপক কামরুল আরও বলেন, ‘আমার কর্মীরা যখন তার কাছ থেকে কেনাকাটা বন্ধ করে দিতে চাইল, তখন থেকেই শুরু হলো হুমকি। তাকে তুলে নিয়ে যাবে, এই করবে, সেই করবে—এসব বলা হতো। হঠাৎ একদিন বলা শুরু করল, একজনের কাছে সে পাঁচ লাখ টাকা পায়, সেই টাকা দিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘আমার হাসপাতালের সবাই তাকে ভয় পেত। সে বেশ লম্বা-চওড়া, সাথে কয়েকজনকে নিয়ে আসত। আবার বলত সে যুবদল কর্মী; যে কারণে তাকে কিছু বলাও যেত না। হাসপাতালের নিরাপত্তা কর্মীরাও তাকে ভয় পেত।’
তিনি বলেন, ‘সে আজ যেটা করেছে, আমার এক কর্মীর বাসায় গিয়ে ভোরে তাঁকে টাকা দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছে। আমার ওই কর্মী একটি ঘরে লুকিয়ে ছিলেন। আমি পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে ফোন করেছি। শুধু পুলিশ এসেছিল।’
অধ্যাপক কামরুল আরও বলেন, ‘ওর নামে আগেও সাধারণ ডায়েরি করা ছিল। কিন্তু পুলিশ যে তাকে ধরবে বা নিয়ে যাবে—এমন কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। তারা কি তাকে ভয় পায় কি না, জানি না।’
চিকিৎসক কামরুল ইসলাম বলেন, ‘হাসপাতালের যে কর্মীর সঙ্গে এমন আচরণ করা হচ্ছিল, তিনি এখানে ৩০ বছর ধরে কাজ করছেন। অস্ত্রোপচার কক্ষের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কর্মী তিনি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন মঈনের দাবি হচ্ছে, হয় ওই কর্মীকে চাকরি থেকে বের করে দিতে হবে, না হয় তাকে পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে। আর তা না হলে তাকে আবার ঠিকাদারি কাজ ফিরিয়ে দিতে হবে।’
চিকিৎসক কামরুল বলেন, ‘যুবদল পরিচয় দেওয়া ছেলেটা ৫ আগস্টের পর থেকে এখানে মালামাল সরবরাহ করছিল। তবে তখন সে এত উগ্র ছিল না। গত এক মাস ধরে সে হঠাৎ খুব হিংস্র হয়ে ওঠে।’
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘দেখেন, আমি কতজনকে বলেছি। আমি এখানকার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পুলিশ সুপার, একজন উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এবং একজন অতিরিক্ত আইজিপিকেও বলেছি। কিন্তু সে নাকি কারও কথা শোনে না।’
জানতে চাইলে শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম শনিবার সকালে বলেন, ‘এ বিষয়ে তাঁদের একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে অভিযোগ না পেলেও আমরা অভিযুক্ত মঈন উদ্দিনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

Comments
Comments