দেশে বেড়েছে আর্থিক অপরাধ, মানব পাচার ও অস্ত্র চোরাচালান
| গ্রাফিক্স: পদ্মা ট্রিবিউন |
মেহেরপুরের মুজিবনগর সীমান্ত। গত বছরের ১৫ আগস্ট বাইসাইকেলে করে ঘাসভর্তি একটি বস্তা নিয়ে যাচ্ছিলেন এক ব্যক্তি। সন্দেহ হওয়ায় তাঁকে আটক করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। তল্লাশি চালিয়ে তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমাণ ডলার, যা পাচারের উদ্দেশ্যে সীমান্তে আনা হয়েছিল। এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দেশের বাড়তে থাকা আর্থিক অপরাধের এক বড় নিদর্শন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থ পাচারের এই প্রবণতা এখন আর কেবল সীমান্ত এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশত্যাগী কিছু ব্যক্তি হুন্ডি ও অন্যান্য উপায়ে বিপুল পরিমাণ টাকা বিদেশে সরিয়ে নিচ্ছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই পাচার দেশের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, অর্থ পাচারের পাশাপাশি সংঘবদ্ধ অপরাধও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ‘অর্গানাইজড ক্রাইম ইনডেক্স-২০২৫’ অনুযায়ী, ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছয় ধাপ এগিয়ে এখন ৮৩তম। এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এগিয়ে যাওয়া মানে দেশে অপরাধের বিস্তার বৃদ্ধি পাওয়া।
একই সঙ্গে দেশে মানব পাচার ও চোরাচালানের বাজারও বড় হয়েছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে এসব অপরাধ বেশি হলেও এর প্রভাব পড়ছে পুরো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। ফলে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা—উভয় ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থ পাচার দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমিয়ে দেয়, বিনিয়োগের পরিবেশ নষ্ট করে এবং আর্থিক খাতে অস্থিরতা তৈরি করে। পাশাপাশি হুন্ডি ব্যবস্থার কারণে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্য দেশে অপরাধের মাত্রা এবং তা ঠেকানোর ক্ষমতা পরিমাপের একটি আন্তর্জাতিক সূচক হলো ‘গ্লোবাল অর্গানাইজড ক্রাইম ইনডেক্স’। এই সূচকে ১ থেকে ১০ স্কেলের মধ্যে স্কোর নির্ধারণ করা হয়। ২০২৫ সালের সর্বশেষ সূচক অনুযায়ী, অপরাধের বিস্তারে ৫.৩০ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ ১৯৩টি দেশের মধ্যে ৮৩তম স্থানে রয়েছে। ৮.০৮ স্কোর নিয়ে এই তালিকার শীর্ষে আছে মিয়ানমার। এরপরই রয়েছে কলম্বিয়া, মেক্সিকো, ইকুয়েডর ও প্যারাগুয়ে।
এশিয়ার ৪৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ২৪তম। এর আগে ২০২৩ সালের সূচকে ৫.১২ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশ ৮৯তম অবস্থানে ছিল। অর্থাৎ গত দুই বছরে বাংলাদেশ ছয় ধাপ এগিয়েছে, যা দেশে সংঘবদ্ধ অপরাধ বাড়ারই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এই বৈশ্বিক সূচক অনুযায়ী, ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে আর্থিক অপরাধ, মানব পাচার, অস্ত্র চোরাচালান, মাদক ব্যবসা ও নকল পণ্যের বিস্তার—সব ক্ষেত্রেই অপরাধের মাত্রা বেড়েছে। বিশেষ করে মানব পাচারের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। জোরপূর্বক শ্রম ও যৌন শোষণের উদ্দেশ্যে অনেক নারী ও কন্যাশিশুকে পাচার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া বিয়ের টোপ দিয়েও তাদের বিদেশে পাচার করা হয়। এছাড়া ঋণের ফাঁদে ফেলে জোরপূর্বক কাজ করানো এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঘটনাও বেড়েছে।
অসহায় ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে সংখ্যালঘু এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীরাই এখন মানব পাচারের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে চাকরির প্রলোভন ও অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কেনাবেচার উদ্দেশ্যেও মানব পাচারের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
আর্থিক অপরাধের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের উত্থান দেখা গেছে, যার বেশিরভাগই ঘটছে বেসরকারি খাতে। একই সময়ে দেশের সীমান্ত দিয়ে নিয়মিত অস্ত্র চোরাচালান চলায় জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে। এছাড়া বাজারে নকল পণ্যের উৎপাদন ও বিক্রি অতীতের চেয়ে অনেক বেড়েছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এসব অপরাধের বিস্তার দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর অনেকেই হুন্ডি ও অন্যান্য উপায়ে বিদেশে টাকা পাচার করেছেন। এর ফলে বিগত সময়ের তুলনায় আর্থিক অপরাধ বেড়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন সংস্কারমূলক কাজে অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে হয়েছে। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পুরোপুরি গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব হয়নি, যার প্রভাবে মাদক, অস্ত্র ও মানব পাচারের মতো সীমান্তকেন্দ্রিক অপরাধ বেড়েছে। তবে বর্তমানে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্বে থাকায় দ্রুতই এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
‘গ্লোবাল অর্গানাইজড ক্রাইম ইনডেক্স’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে অপরাধের প্রধান চারটি উৎস হলো মানব পাচার, মাদক পাচার, চোরাচালান ও আর্থিক অপরাধ। এই অপরাধগুলো মূলত সীমান্তবর্তী এলাকা ও শহরকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ঘিরে আবর্তিত হয়। সূচকে স্কোর বাড়ার অর্থ হলো, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা থাকলেও অপরাধী চক্রগুলো নতুন প্রযুক্তি ও কৌশল ব্যবহার করে তাদের নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অপরাধের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ঠেকাতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো, বৈশ্বিক সহযোগিতা এবং অপরাধীদের তালিকা করে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, বাংলাদেশে সংঘবদ্ধ অপরাধের প্রবণতা বাড়ছে এবং তা ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বৈশ্বিক প্রতিবেদনগুলোতে অপরাধ সূচক বাড়ার যে তথ্য এসেছে, তা অত্যন্ত গুরুতর। এ ধরনের অপরাধ সাধারণত শক্তিশালী চক্রের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে ঘটে থাকে।
তিনি আরও জানান, মানব পাচার, চোরাচালান ও আর্থিক অপরাধ শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য হুমকি নয়, বরং দেশের অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে এবং প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধী চক্রগুলোকে শনাক্ত করে দ্রুত অভিযান চালাতে হবে।
একই সঙ্গে এই অপরাধ বিশ্লেষক জোর দিয়ে বলেন, ‘অপরাধ দমনে কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা করা যাবে না। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষভাবে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।’
তবে সংঘবদ্ধ অপরাধ বিষয়ক এই বৈশ্বিক সূচকে অবস্থানের পরিবর্তনকে সরাসরি অপরাধ বৃদ্ধির প্রমাণ হিসেবে মানতে নারাজ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (গণমাধ্যম ও জনসংযোগ) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন বলেন, ‘সূচকে অবস্থানের পরিবর্তন মানেই অপরাধ বেড়েছে—এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সবসময় সঠিক নয়। এটি পদ্ধতিগত মূল্যায়ন ও তথ্য সংগ্রহের ওপর নির্ভর করে।’
তিনি আরও জানান, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ এরই মধ্যে গোয়েন্দা তৎপরতা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়েছে। অপরাধী চক্র শনাক্ত করে তাদের বিচারের আওতায় আনতে প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তও জোরদার করা হয়েছে। মূলত সমন্বিত উদ্যোগ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।
Comments
Comments