দেনার চাপে কোণঠাসা উদ্যোক্তারা
| প্রতীকী ছবি |
দেশের তৈরি পোশাকশিল্প অনেক বছর ধরে দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত। কোটি মানুষের কর্মসংস্থান, বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং শিল্পায়নের বিস্তারে এ খাতের অবদান অনেক। কিন্তু সম্প্রতি ব্যাংকঋণ, আর্থিক সংকট ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে উদ্যোক্তারা কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়ছেন। কোথাও কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, কোথাও ঋণের বোঝা বাড়ছে, আবার কোথাও মানসিক চাপে ভেঙে পড়ছেন অনেকে। কিছু ক্ষেত্রে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে, যা ব্যবসায়ী মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সাময়িক আর্থিক সংকটে পড়া শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যাংকগুলো অনেক সময় প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না দিয়ে উল্টো কঠোর অবস্থান নেয়। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকতে পারে না।
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা পুলিশ লাইন এলাকায় অবস্থিত রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানা ডেনিসন অ্যাটায়ার্স লিমিটেড এর একটি উদাহরণ। প্রতিষ্ঠানটির মালিক সাইদুল হক।
তিনি বলেন, ‘মহামারির সময় বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানই আর্থিক সংকটে পড়ে। সেই সময় সামান্য আর্থিক সহায়তা পেলে তাঁর প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব ছিল।’ তাঁর ভাষায়, ‘শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার জন্য মাত্র দুই কোটি টাকা ঋণ পেলে কারখানাটি চালু রাখা যেত। কিন্তু ব্যাংক থেকে সেই সহযোগিতা পাইনি।’
সাইদুল হক জানান, তিনি স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক থেকে মোট ২১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। ব্যবসার বিভিন্ন সময়ে তিনি ঋণের একটি অংশ পরিশোধও করেছেন। তবে তাঁর অভিযোগ, ব্যাংক সুদ ও বিভিন্ন ফি বাবদ ১৫ কোটি টাকার বেশি অর্থ আদায় করলেও সেই টাকা মূল ঋণের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়নি। বরং পুরো অর্থকে সুদ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ঋণের বিপরীতে আমরা নিয়মিত টাকা পরিশোধ করেছি। কিন্তু ব্যাংকের হিসাব পদ্ধতির কারণে মূল ঋণ কমেনি। এতে ব্যাংকের আয় বাড়লেও শেষ পর্যন্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।’
সাইদুল হকের অভিযোগ অনুযায়ী, সংকটের সময় ব্যাংক তাঁর প্রতিষ্ঠানের এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) সুবিধা বন্ধ করে দেয়। ফলে বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে পাওয়া বেশ কিছু ক্রয়াদেশ বাতিল হয়ে যায়।
রপ্তানিমুখী শিল্পে এলসি সুবিধা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কাঁচামাল আমদানি থেকে শুরু করে উৎপাদন ও রপ্তানি—সব ক্ষেত্রেই ব্যাংকিং সহায়তা প্রয়োজন হয়। এলসি বন্ধ হয়ে গেলে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সাইদুল হক আরও অভিযোগ করেন, সংকটের সময় সহযোগিতা করার বদলে ব্যাংক নানা ধরনের চাপ ও হয়রানি করেছে। তাঁর ভাষায়, ‘সংকটের সময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বাঁচানোর চেষ্টা করার কথা। কিন্তু বাস্তবে আমরা উল্টো চাপের মুখে পড়েছি।’
ব্যবসায়ী মহলের অনেকের মতে, করোনার ধাক্কা সামাল দিতে গিয়ে বহু প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু সেই সময় ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারেনি।
শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, ব্যাংকঋণের কাঠামো, সুদের হিসাব ও বিভিন্ন চার্জের কারণে অনেক সময় ঋণগ্রহীতাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রশাসনিক জটিলতা এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের নিয়মকানুন। ফলে ব্যবসা পরিচালনা করা অনেক ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
ঋণের চাপ ও প্রশাসনিক জটিলতায় বিপর্যস্ত হয়ে এক প্রবীণ পোশাকশিল্প উদ্যোক্তার মৃত্যুর ঘটনাও সামনে এসেছে। মৃত ব্যবসায়ীর নাম মহিউদ্দিন। তিনি রাজধানীভিত্তিক মুনলাক্স নামের একটি পোশাক কারখানার মালিক ছিলেন এবং প্রায় চার দশক ধরে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
ব্যবসাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য অনুযায়ী, করোনাভাইরাস মহামারির সময় তাঁর কয়েকটি রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়ে যায়। এতে প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়ে। পরে ব্যাংকের পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়ায় তিনি কারখানাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।
সূত্র জানায়, গত প্রায় তিন বছর ধরে তিনি ভ্যাট অফিস, কাস্টমস বন্ড ও ব্যাংকসহ বিভিন্ন দপ্তরে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু পাওনাদারদের চাপ ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তিনি চরম মানসিক সংকটে পড়েন।
ঘনিষ্ঠজনরা জানান, ক্রমাগত দুশ্চিন্তা ও চাপের মধ্যে থাকায় তাঁর শারীরিক অবস্থারও অবনতি হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত গত ১৩ মার্চ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। ব্যবসায়ী মহলে এই ঘটনা গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
শিল্প খাতের ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো নানা কারণে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে বিশ্ববাজারের চাপ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যাংকঋণের জটিলতাই মূল কারণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি সময়মতো উপযুক্ত সহায়তা দেওয়া হতো, তবে অনেক প্রতিষ্ঠানই আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারত। কিন্তু ব্যাংকিং খাতের কঠোরতা এবং নীতিগত অনমনীয়তার কারণে সেই সুযোগ অনেকেই পাচ্ছেন না।
দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপগুলো, যারা লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং সরকারকে বড় অঙ্কের রাজস্ব দিয়েছে, তারাও বিপদে পড়লে ব্যাংকগুলোর পর্যাপ্ত সহায়তা পাচ্ছে না।
২০২৫ সালের ৭ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষণা করেছিল, যাঁরা অনিচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হয়েছেন, তাঁদের ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিলের সুযোগ দেওয়া হবে। কিন্তু ব্যাংকগুলো নানা শর্তের জালে উদ্যোক্তাদের আটকে দিচ্ছে। এতে ব্যাংকও লাভবান হচ্ছে না, শিল্প গ্রুপগুলোও টিকে থাকতে পারছে না। ফলে লাখো শ্রমিকের চাকরি ঝুঁকিতে পড়ছে এবং সরকারের রাজস্ব আয়ও কমছে।
কয়েকটি ব্যাংকের স্বেচ্ছাচারিতার শিকার হয়েছে দেশের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিমুখী শিল্প গ্রুপ—থার্মেক্স গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ ও রূপায়ণ গ্রুপ। এই গ্রুপগুলো সরকারের রাজস্বে বড় অবদান রাখার পাশাপাশি কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। কিন্তু বর্তমানে তাদের ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টের সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো ইচ্ছামতো আচরণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে গ্রুপগুলো ব্যবসা সচল রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।
এক শিল্প গ্রুপের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যস্থতায় ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ঋণ পুনঃতফসিল সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু এসআইবিএল (সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক), ব্যাংক এশিয়াসহ কয়েকটি ব্যাংক তা মানছে না। ফলে ব্যবসা সচল রাখা ও শ্রমিকদের চাকরি রক্ষা করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পক্ষপাতমূলক আচরণ দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করছে বলে তিনি দাবি করেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে শুধু উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন না, এর বড় প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থান, রপ্তানি আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে কর্মরত শত শত শ্রমিকের জীবিকাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, নীতি-সহায়তা কমিটি এখন কার্যকর নেই। বর্তমানে ব্যাংকগুলো নিজ নিজ পর্ষদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে গ্রাহকদের স্বল্প ডাউন পেমেন্টে পুনঃতফসিল সুবিধা দিতে পারবে।
ব্যবসায়ী মহলের অনেকেই মনে করেন, শিল্প খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য ব্যাংকিং ব্যবস্থার আরও সহায়ক ভূমিকা প্রয়োজন। বিশেষ করে সাময়িক সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে ঋণ পুনঃতফসিল, ঋণ পুনর্গঠন বা স্বল্পমেয়াদি আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। এটি না হলে অনেক সম্ভাবনাময় শিল্প অকালেই বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এদিকে ব্যাংকিং খাতের ভেতরেও নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে। বিশেষ করে ভুয়া রপ্তানি দেখিয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাতের মতো ঘটনাগুলো নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এসব অনিয়ম একদিকে যেমন ব্যাংকিং খাতের ওপর মানুষের আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃত ও সৎ উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে শিল্পের প্রকৃত বন্ধু হিসেবে ভূমিকা পালন করতে হবে।
Comments
Comments