[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

মৌসুম শেষ, তবুও জালে নেই মাছ: ঋণ শোধের চিন্তায় জেলেরা

প্রকাশঃ
অ+ অ-
কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর ফিশারিঘাটে পড়ে আছে মাছ ধরার ট্রলার। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন 

কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর তীরে ফিশারিঘাটে নোঙর করা নৌকায় বসে দুপুরের খাবার খাচ্ছিলেন কয়েকজন জেলে। নৌকার পাটাতনে গোল হয়ে বসা জেলেদের সঙ্গে আলাপ জমে ওঠে। খাবারের তালিকায় ছিল ডাল, ভাত ও সবজির তরকারি। জেলে আনোয়ার জানালেন, গত এক সপ্তাহ সাগরে গিয়েও প্রায় খালি হাতে ফিরেছেন তাঁরা। কিছু ছোট মাছ পেলেও সেগুলো বিক্রি করে দিয়েছেন। অন্য সময় ভালো মাছ ধরা পড়লে তাঁরা খাওয়ার জন্য কিছু রেখে দেন। এবার মাছ না পাওয়ায় সবজি আর ডাল দিয়েই খেতে হচ্ছে।

তবে খাবার নিয়ে কারও মধ্যে কোনো আক্ষেপ দেখা গেল না। জেলেরা জানালেন, নিজেদের নিয়ে তাঁদের ভাবনা নেই। পরিবার নিয়ে সামনের কয়েক মাস কীভাবে চলবেন, সেটিই এখন তাঁদের প্রধান চিন্তা। আনোয়ার হোসেন (২৫) বললেন, গত পাঁচ মাস ধরে ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছেন। এই মৌসুমে মাছ বিক্রি করে সেই ঋণ শোধ দেবেন ভেবেছিলেন। কিন্তু মৌসুম শেষ হতে চলেছে। আগামী ১৫ এপ্রিল থেকে ৫৮ দিন অর্থাৎ প্রায় দুই মাসের জন্য মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা শুরু হবে।

আনোয়ারের কথার পিঠে সঙ্গী এক জেলের রসিকতায় সবাই হেসে উঠলেন। হাসিঠাট্টার মাঝেও তাঁদের কথায় কঠিন বাস্তবতার ছাপ ফুটে উঠছিল। জেলে খলিল উল্লাহ (৪৫) ভাত খেতে খেতে বলেন, ‘আমরা সাগরের ৭০-৮০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে জাল ফেলি, কিন্তু মাছের দেখা পাই না। আমরা চলব কীভাবে? আমাদের দুঃখ কেউ বোঝে না।’

কক্সবাজার জেলায় অন্তত এক লাখ জেলে ও কয়েক হাজার ট্রলারমালিক রয়েছেন বলে ফিশিং বোট মালিক সমিতির সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে মাত্র ২৫০টি ট্রলার এখন সাগরে আছে। ফিশিং বোট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সদর, পেকুয়া, চকরিয়াসহ জেলাতে ৯টি উপজেলাতে মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে ৫ হাজার ২৫০টি। জ্বালানি সংকটের কারণে ৯৫ শতাংশ ট্রলার দুই সপ্তাহ ধরে ঘাটে পড়ে আছে।

কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীর তীরের ফিশারিঘাটে কয়েক শ মাছ ধরার নৌকা পাশাপাশি নোঙর করে রাখা হয়েছে। মাছ ধরার এই মৌসুমে ট্রলারগুলোর এখন সাগরে ব্যস্ত সময় কাটানোর কথা। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ফিশারিঘাটের কয়েকটি ট্রলারের মাঝিমাল্লাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বারবার খালি হাতে ফিরে আসায় মালিকেরা তাঁদের সাগরে পাঠাতে চান না। অনেকে লোকসানের বোঝা আর বইতে পারছেন না।

জেলেরা বললেন, অনেক সময় দু-একটি ট্রলারে একসঙ্গে প্রচুর মাছ ধরা পড়ে। আবার অনেক সময় দিনের পর দিন সাগরে কাটিয়েও মাছ মেলে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ইরান যুদ্ধ। যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। অনেকে প্রয়োজনমতো তেল পাননি।

জেলে মো. আলমগীর (৪৫) বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে ১২ দিন ধরে তাঁরা মাছ ধরতে সাগরে যেতে পারছেন না। প্রতি দফায় ৫-৬ লাখ টাকা করে লোকসান হওয়ার পর সাগরে ট্রলার পাঠাতে মালিকেরা অনীহা দেখাচ্ছেন। তাই ট্রলার ঘাটে পড়ে আছে। তিনি ট্রলার পাহারা দিচ্ছেন আর বাকি ১৯ জন জেলে বাড়িতে বেকার সময় কাটাচ্ছেন।

সাগর থেকে আহরণ করা ছোট মাছ। টেকনাফ সৈকতে। সম্প্রতি তোলা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

মাছ ধরার নৌকা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, চার সংকটে ভুগছেন কক্সবাজারের জেলেরা। এগুলো হলো জ্বালানি সংকট, সাগরে মাছের অভাব, জলদস্যুদের লুটপাট এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ।

জেলায় অন্তত এক লাখ জেলে ও কয়েক হাজার ট্রলার মালিক রয়েছেন বলে মালিক সমিতি সূত্রে জানা গেছে। এর মধ্যে মাত্র ২৫০টি ট্রলার এখন সাগরে আছে বলে জানান দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, সদর, পেকুয়া ও চকরিয়াসহ জেলার ৯টি উপজেলায় ৫ হাজার ২৫০টি মাছ ধরার ট্রলার রয়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে ৯৫ শতাংশ ট্রলার দুই সপ্তাহ ধরে ঘাটে পড়ে আছে। ২৫০টি ট্রলার মাছ ধরতে সাগরে নামলেও বেশির ভাগ ট্রলারের জালে মাছ ধরা পড়ছে না। কিছু ট্রলারে মাছ ধরা পড়লেও জলদস্যুরা তা লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে অন্তত ১ লাখ জেলে শ্রমিক বেকার জীবন কাটাচ্ছেন। ১৫ এপ্রিল থেকে সাগরে মাছ ধরার ওপর ৫৮ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা শুরু হচ্ছে। তখন জেলে পরিবারগুলোতে বড় বিপদ নেমে আসবে। জেলায় জেলে শ্রমিকের সংখ্যা ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি।

এ প্রসঙ্গে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞার সময়ে মৎস্য বিভাগের নিবন্ধিত ৬৪ হাজার ২৩ জন জেলেকে ৭৭ দশমিক ৩৩ কেজি করে চাল দেওয়া হবে। তবে অনিবন্ধিত জেলেরা এই সহায়তা পাবেন না।

কয়েকজন জেলে জানান, জেলার ৪৫টির বেশি জেলে পল্লিতে এখন তীব্র খাদ্যসংকট চলছে। মাছ ধরা ছাড়া জেলে শ্রমিকদের অন্য কোনো আয়ের পথ না থাকায় বহু পরিবার অনাহারে বা আধা পেটে দিন কাটাচ্ছে। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় পরিবারগুলো টিকে থাকতে হিমশিম খাচ্ছে।

ট্রলার মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন বলেন, গত বছর কক্সবাজার উপকূলে একটি ঘূর্ণিঝড় ও ১৫টির মতো লঘুচাপ ও নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়েছিল। এর প্রভাবে সাগর প্রচণ্ড উত্তাল থাকা এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে অন্তত ২০০ দিন জেলেরা সাগরে মাছ ধরতে পারেননি। চলতি বছরের তিন মাসেই চারটি লঘুচাপ ও নিম্নচাপ তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া মাছ ধরার ওপর ২২ ও ৫৮ দিনের (আগে যা ছিল ৬৫ দিন) সরকারি নিষেধাজ্ঞা জেলেদের মেনে চলতে হয়েছে। বছরের বাকি সময় সাগরের পরিবেশ ঠিক থাকলেও মাছ পাওয়া যাচ্ছে না।

প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি যোগ হয়েছে জলদস্যুদের উৎপাত। কক্সবাজার ফিশিংবোট মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫-২০ দিনে বঙ্গোপসাগরে ১৫টির বেশি ট্রলার জলদস্যুদের কবলে পড়েছে। একাধিক ট্রলার নিয়ে জলদস্যুরা সাগরে ওত পেতে থাকে—কখন গভীর সাগর থেকে মাছ ধরে ট্রলার ঘাটে ফিরবে। তখন মাছ ধরার ট্রলার ও জেলেদের জিম্মি করে ধরা মাছ, জাল, জ্বালানি ও ইঞ্জিন লুট করে জেলেদের সাগরে ভাসিয়ে দেওয়া হয়। দস্যুদের গুলি ও পিটুনিতে ২৮ জন জেলে আহত হয়েছেন। গত দুই সপ্তাহে নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড পৃথক অভিযান চালিয়ে অন্তত ৪৫ জন জেলেকে উদ্ধার করেছে।

ফিশিংবোট মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাক আহমদ বলেন, ২০২৩ সালের মার্চ মাসে সাগরে ডাকাতি করতে গিয়ে ১০ জলদস্যুর মৃত্যু হয়। এরপর কয়েক মাস দস্যুদের তৎপরতা বন্ধ ছিল। বর্তমানে কক্সবাজার, টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপকূলে সাতটি দস্যু বাহিনী লুটপাটে জড়িয়েছে।

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন