সব দুশ্চিন্তার কেন্দ্রে এখন ডিজেল
মার্চে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হলেও মজুত প্রায় শেষের দিকে চলে এসেছে। এপ্রিলে সরবরাহ ধরে রাখতে হলে সূচি মেনে আমদানি নিশ্চিত করতে হবে। অকটেন তেলের চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা মিলেছে। তবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডিজেল নিয়ে উদ্বেগ বেশি। সরকার বিকল্প উৎস থেকে ডিজেল আনার চেষ্টা করছে।
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জ্বালানি তেল আমদানির কাজ করছে। সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২৯ মার্চ সরবরাহ শেষ হওয়ার পর ডিজেলের মজুত আছে ১ লাখ ৩৩ হাজার টন। বর্তমান চাহিদা অনুযায়ী এটি প্রায় ১০ দিনের মজুত। এপ্রিলে ডিজেলের চাহিদা প্রায় ৪ লাখ টন। আগামী ১৫ দিনে ৯৫ হাজার টন ডিজেল আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জ্বালানি তেল নির্ধারিত সময়ে আসছে না। মার্চে ১৬টি জাহাজ জ্বালানি তেল আনার কথা ছিল, এর মধ্যে এসেছে ১০টি। বাকি ৬টি ডিজেলের জাহাজের সময়সূচি এখনো নিশ্চিত হয়নি। এসব জাহাজে ১ লাখ ৫৫ হাজার টন ডিজেল আসার কথা। এর মধ্যে একটি জাহাজে ২৫ হাজার টন জেট ফুয়েলও আসার কথা ছিল। উড়োজাহাজের জ্বালানি জেট ফুয়েলের মজুত নিয়েও উদ্বেগ আছে; বর্তমানে মজুত আছে প্রায় ১৬ দিনের।
দেশে দুই ধরনের জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। পরিশোধিত জ্বালানি হিসেবে ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস তেল ও জেট ফুয়েল বিভিন্ন দেশ থেকে আনা হয়। অপরিশোধিত তেল আসে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। এসব তেল দেশের একমাত্র সরকারি পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল) শোধন করা হয়, যেখানে ডিজেল, পেট্রল, ফার্নেস তেলসহ বিভিন্ন জ্বালানি পাওয়া যায়। ইআরএল থেকে মাসে গড়ে ৬০ হাজার টন ডিজেল পাওয়া যায়। তবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে অপরিশোধিত তেল আসা বন্ধ। বর্তমানে ইআরএলে ব্যবহারযোগ্য মজুত আছে ২৬ হাজার টন, যা দিয়ে ৬–৭ দিন উৎপাদন চালানো যাবে।
জাতীয় সংসদে জ্বালানি তেলের পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তিনি বলেন, এখনো জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। গত বছরের তুলনায় সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। প্রয়োজনের বেশি জ্বালানি কেনার প্রবণতায় কৃত্রিমভাবে সংকট তৈরি হচ্ছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, গতরাতে ২৭ হাজার ৩০০ টন ডিজেল নিয়ে একটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাবে। আগামী ৩ এপ্রিল আরও ৩০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে একটি জাহাজ আসার কথা। এর মধ্যে ভারত থেকে ৭ হাজার টন ডিজেল পাইপলাইনের মাধ্যমে যোগ হবে। দেশীয় উৎস থেকে পাওয়া যাবে ১১ হাজার টন।
এ মাসে চীন, ইন্দোনেশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে আরও প্রায় দেড় লাখ টন ডিজেল যোগ হওয়ার কথা রয়েছে। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া থেকে শিগগিরই ৬০ হাজার টন ডিজেল নিয়ে দুটি জাহাজ আসার আশা করা হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে অতিরিক্ত ডিজেল আমদানির বিষয়ে ইতিমধ্যে সফল আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র (যুগ্ম সচিব) মনির হোসেন চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত আছে, কোনো সংকট নেই। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের কাছে কৃষকের তালিকা আছে, তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ডিজেল সরবরাহ করা হবে।
তবে বিপিসি সূত্র জানায়, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আমদানিতে সমস্যা হতে পারে। বিভিন্ন দেশ ডিজেল সরবরাহ করলেও, তাদের সরবরাহ ধরে রাখা কঠিন। অধিকাংশ দেশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেল আনে, শোধনের পর রপ্তানি করে। তাই সময়মতো ডিজেল পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল আনার প্রস্তাব আসলেও সরবরাহ নিশ্চিত নয়।
বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, গত বছরের মার্চের তুলনায় এবার অকটেন বিক্রি বাড়েছে। মজুত কমে যাওয়ায় তা প্রায় ৭ দিনে শেষ হয়ে আসছে। তবে অকটেন নিয়ে কোনো উদ্বেগ নেই। এপ্রিলে অকটেনের চাহিদা প্রায় ৩৭ হাজার টন। এর মধ্যে দেশের বেসরকারি শোধনাগার থেকে ৩০ হাজার টন পাওয়া যাবে। এছাড়া এ মাসে ৫০ হাজার টন অকটেন আমদানি হচ্ছে। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই ২৫ হাজার টন অকটেন নিয়ে একটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে।
মাসের শেষ দিন জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের কথা রয়েছে। বিপিসি সূত্র জানায়, বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকায়। বর্তমান আমদানি মূল্যের সঙ্গে সমন্বয় করলে ডিজেলের দাম দাঁড়াবে প্রায় ২০০ টাকা। দাম বাড়ানো না হলে এক মাসে সরকারের পাঁচ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি দিতে হবে।
জ্বালানিমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, এক মাসে বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম বেড়েছে ৯৮ শতাংশ। প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে খরচ হচ্ছে ১৯৮ টাকা। ১২০ টাকায় অকটেন বিক্রি হলেও সরকারের খরচ হচ্ছে ১৫০ টাকা ৭২ পয়সা।
মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে জ্বালানি বিভাগের মুখপাত্র বলেন, প্রতি মাসে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা হয়। আগামী মাসের জন্য মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব এসেছে। এতে দেখানো হয়েছে, প্রতি লিটার কত টাকা বাড়ালে সরকারের কত ভর্তুকি লাগবে। এখন এগুলো মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি বিভাগের উপস্থাপনায় বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ চতুর্থ সপ্তাহ পার করছে। এতে বিশ্বে নজিরবিহীন জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছে। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তান জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি হলো ডিজেল। তাই ডিজেল আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। একই সঙ্গে ঘাটতি বিবেচনায় রেখে প্রস্তুতি নিতে হবে। সেচ ও পণ্য পরিবহনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো খাতে সরবরাহ কমানোর আগে পূর্বেই জানাতে হবে। সাশ্রয়ে নানা উদ্যোগ নিতে হবে। এটি বৈশ্বিক সংকট, উন্নত দেশও সমস্যায় পড়ছে। কাউকে দায়ী করার সুযোগ নেই, সবাই মিলে সহায়তা করতে হবে।

Comments
Comments