[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

পরিকল্পিতভাবেই পীর হত্যা: সকালে সিদ্ধান্ত, দুপুরে মিছিল নিয়ে হামলা

প্রকাশঃ
অ+ অ-
কুষ্টিয়ায় ‘পীরের’ আস্তানা ভাঙচুর করে আগুন দেওয়া হয়। শনিবার দুপুরে দৌলতপুর উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের ফিলিপনগর গ্রামে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

গ্রামের পাকা রাস্তা দিয়ে শতাধিক মানুষ দ্রুত পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন। এ সময় অনেককে স্লোগান দিতে দেখা যায়। এর কয়েক মিনিট পরই মিছিল নিয়ে আসা ব্যক্তিরা আস্তানায় পৌঁছে হামলা চালায়। শুরু হয় ভাঙচুর। পাকা ঘরের ভেতরে ঢুকে আসবাবপত্র ভাঙার পর সেখানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আস্তানায় হামলা চালিয়ে এক পীরকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ১৮ মিনিটের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। সেই ভিডিওতে এমন দৃশ্যই দেখা গেছে।

শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের ফিলিপনগর গ্রামে এই ঘটনা ঘটে। নিহত ব্যক্তির নাম শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর। তিনি ওই গ্রামেরই বাসিন্দা।

হামলা চালাতে যাচ্ছে লোকজন | ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

এই হামলার ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন পুরুষ ও এক নারীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

পুলিশ, প্রশাসন ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শামীমের আস্তানায় প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে গানবাজনা হতো। ২০২১ সালের মে মাসে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ বিভিন্ন অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে দৌলতপুর থানায় মামলা হয়েছিল। তখন পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর মুক্তি পেয়ে তিনি আবারও একই ধরনের কাজ শুরু করেন।

স্থানীয় লোকজনের দাবি, তিনি পবিত্র কোরআন নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করেছেন, যা ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত দিয়েছে। কয়েক বছর আগের একটি ভিডিও শুক্রবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েকজন জানান, ৩০ সেকেন্ডের ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধে। শনিবার সকালে শামীমের আস্তানা থেকে আধা কিলোমিটার দূরে আবেদের ঘাট এলাকায় শতাধিক মানুষ জড়ো হন। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন যে, দুপুরের পর ওই আস্তানায় হামলা চালানো হবে।

নিহত শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর | ছবি: সংগৃহীত
 
স্থানীয় সূত্র জানায়, হামলার খবরটি আগেই স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের কাছে পৌঁছেছিল। সকাল থেকেই সেখানে পুলিশ মোতায়েন ছিল। তবে জোহরের নামাজের পর বিভিন্ন এলাকা থেকে সব বয়সী মানুষ লাঠিসোঁটা, রড ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আস্তানার দিকে রওনা হন। সেখানে পৌঁছে তারা হামলা চালান এবং আধা ঘণ্টার বেশি সময় ধরে তাণ্ডব চালান। এতে আস্তানায় থাকা কয়েকজন আহত হন এবং অনেকে প্রাণভয়ে পালিয়ে যান।

দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তৌহিদুল হাসান বলেন, দুপুরে আহত অবস্থায় তিনজনকে হাসপাতালে আনা হয়। এর মধ্যে শামীম নামের ব্যক্তির অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক ছিল। তাঁকে কুপিয়ে জখম করা হয়েছিল। চিকিৎসা শুরুর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তিনি মারা যান। মূলত অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। আহত অন্য নারী ও পুরুষ এখন আশঙ্কামুক্ত।

পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ পাঠানো হলেও মানুষের ভিড় এত বেশি ছিল যে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি।

কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন বলেন, ওই ব্যক্তির ইসলাম ধর্ম নিয়ে আপত্তিকর বক্তব্যের একটি পুরনো ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। ভিডিওটি নতুন করে ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকার মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে এই হামলা চালায়। বিক্ষুব্ধ জনতার তুলনায় পুলিশের সংখ্যা কম থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। ওই ব্যক্তিকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে।

পুলিশ সুপার আরও জানান, এলাকার পরিস্থিতি এখন শান্ত রয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। কারা, কীভাবে পুরনো এই ভিডিওটি নতুন করে সামনে নিয়ে এল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, আস্তানার পেছনের দিকে বাঁশবাগান থাকায় ধারণা করা হচ্ছে, পেছন দিক থেকে সহস্রাধিক মানুষ এসে এই ঘটনা ঘটিয়েছে। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের হামলা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন ছিল।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শামীম সেখানকার ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। এরপর ফিলিপনগর উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে মাধ্যমিক, কুমারখালী ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ভেড়ামারা কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেন। পরবর্তী সময়ে ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি।

শিক্ষাজীবন শেষে কেরানীগঞ্জ এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন শামীম। পরে চাকরি ছেড়ে তিনি কেরানীগঞ্জের এক পীরের অনুসারী হন এবং সেখানে সেবক হিসেবে থাকতে শুরু করেন। ওই সময় থেকেই পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ২০০৭ সালে তিনি বিয়ে করলেও সেই সংসার বেশিদিন টেকেনি।

২০১৮ সালের দিকে শামীম রেজা নিজ গ্রামে ফিরে পৈতৃক জমিতে ওই আস্তানা গড়ে তোলেন। ২০২১ সালের ১৬ মার্চ তাঁর এক অনুসারীর শিশুপুত্রের মরদেহ ঢাকঢোল বাজিয়ে দাফন করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তিনি আলোচনায় আসেন। এরপর ধর্ম অবমাননার অভিযোগে একই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে দক্ষিণ ফিলিপনগর গ্রাম থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। 

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন