হামের থাবায় ২১ শিশুর মৃত্যু, টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ফাঁক
![]() |
| ডেমরা থেকে আসা হামে আক্রান্ত ৯ মাস বয়সী ইমতিয়াজ আকন্দকে ২৬ মার্চ মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে শয্যাপাশে শিশুটির মা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। কমপক্ষে সাত জেলায় রোগটি বড় আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। শুধু চলতি মাসেই হামে ২১ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হামের বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব না দেওয়ায় পরিস্থিতি এ অবস্থায় এসেছে। শিশুদের হামের টিকা দেওয়ায় ঘাটতি রয়েছে। হাম খুবই সংক্রামক এবং দ্রুত ছড়ায়। একজন আক্রান্ত হলে তার মাধ্যমে ১৫ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে রোগটি আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং শিশুমৃত্যু বাড়তে পারে।
গতকাল শনিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মঈনুল আহসান বলেন, ‘সারা দেশেই কমবেশি হাম রয়েছে। তবে আমরা ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চট্টগ্রাম, যশোর ও নাটোরে বেশি রোগী দেখতে পাচ্ছি।’
তবে সরকারের সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, ভোলা ও পটুয়াখালীর রোগীরা রাজধানীর এই হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিচ্ছেন। প্রতিনিধিরা খোঁজ নিয়ে জেনেছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাতেও রোগী রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় হামের সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য মারাত্মক উদ্বেগজনক। সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে, তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
—টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্যাভির স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ার নিজাম উদ্দিন আহমেদ
সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোতে যোগাযোগ করে জানা গেছে, হামে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২টি, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩টি, রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ৩টি এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে ৩টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্যাভির পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন আহমেদ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় হামের সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক। সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ অবস্থায় দ্রুত টিকাদান, শক্তিশালী নজরদারি, সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
গতকাল দুপুরে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, রোগীর ভিড় ও দীর্ঘ লাইন। অনেকের কোলে শিশু। কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কেউ এসেছেন হাম হয়েছে কি না নিশ্চিত হতে, কেউ এসেছেন বসন্ত হয়েছে কি না জানতে। ১০০ শয্যার এই হাসপাতালে হাম, বসন্ত, এইচআইভি বা এইডস, ধনুষ্টংকার, কালাজ্বর ও জলাতঙ্ক রোগের চিকিৎসা হয়।
হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় হামের রোগীদের জন্য শয্যা আছে আটটি। কিন্তু গতকাল দুপুর পর্যন্ত শুধু হাম ও হাম সন্দেহে ভর্তি ছিল ১১৭ জন রোগী। বিভিন্ন তলার বারান্দা ও মেঝেতে হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে মায়েদের শুয়ে থাকতে দেখা যায়।
নরসিংদীর বাগহাটা গ্রাম থেকে আসা মুন্নি আখতারকে চারতলার বারান্দায় তাঁর এক বছরের ছেলে আহমদুল্লার জন্য জায়গা করে নিতে দেখা যায়। মুন্নি আখতার বলেন, ১৫ দিন আগে ছেলের জ্বর হয়, পরে গায়ে ফুসকুড়ি ওঠে। স্থানীয় একটি বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে ছেলেকে দেখান। পরে সেখান থেকে জানানো হয়, তাঁর ছেলের হাম হয়েছে এবং এই হাসপাতালে আনতে বলা হয়।
রাজধানীর বছিলা এলাকা থেকে আসা এক নারী বলেন, এক বছরের ছেলেকে নিয়ে হাসপাতালের বারান্দায় থাকতে কষ্ট হচ্ছে। অনেক চেষ্টা করেও কোনো ওয়ার্ডে শয্যা পাননি।
হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় হামের রোগীর জন্য শয্যা আছে আটটি; কিন্তু গতকাল দুপুর পর্যন্ত শুধু হাম ও হাম সন্দেহে রোগী ভর্তি ছিল ১১৭ জন। বিভিন্ন তলায় বারান্দা ও মেঝেতে হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে মায়েদের শুয়ে থাকতে দেখা যায়।
হাসপাতালের পরামর্শক (শিশু স্বাস্থ্য) এ আর এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, এ বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত ৪৫০ জন রোগী হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়েছে। গতকাল যে ১১৭ জন ভর্তি ছিল, তাদেরও ৭০ শতাংশ হামের রোগী। চলতি মার্চে তিনটি শিশু মারা গেছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আজিমপুর এলাকা থেকে বেশি রোগী আসছে। তিনি আরও বলেন, হামে আক্রান্ত অনেক শিশুর টিকা নেওয়া নেই।
উল্লেখ্য, গত বছর এই হাসপাতালে হামের রোগী সন্দেহে ৬৯ জন ভর্তি হয়েছিল। এর মধ্যে ২৩ জনের হাম শনাক্ত হয়।
হামের রোগীদের চিকিৎসা দিতে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বেশ চাপ সামলাতে হচ্ছে। হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক তানজিনা জাহান বলেন, কোনো রোগী না থাকায় কালাজ্বরের ওয়ার্ডে হামের রোগী রাখা হচ্ছে। এইডসে আক্রান্ত কিছু রোগীকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। বাকি অংশ হামের রোগীদের চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।
তবে নতুন সমস্যাও দেখা দিয়েছে বলে তত্ত্বাবধায়ক জানান। তিনি বলেন, এখন বসন্ত রোগের মৌসুম চলছে। গতকাল ১০ জন বসন্তের রোগী ভর্তি ছিল। বসন্তের রোগী বাড়লে সমস্যায় পড়তে হবে। বসন্ত রোগও সংক্রামক।
এই হাসপাতালে নিয়মিত চিকিৎসক আছেন ২২ জন। হামের রোগী বাড়ায় সরকার আরও ছয়জন চিকিৎসক এই হাসপাতালে পাঠিয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় ১৮ মার্চ রাজশাহী বিভাগের ১৫৩ জন সন্দেহভাজন রোগীর নমুনা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় ৪৪ জনের শরীরে রোগটি শনাক্ত হয়। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গতকাল ৭০ জন রোগী ভর্তি ছিল। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা হাসপাতালে গতকাল বিকেলে ৭০ জন রোগী ভর্তি ছিল। পাবনা সদর হাসপাতালে ভর্তি ছিল ২৬ জন। এ বছর রাজশাহী মেডিকেলে ১২ জন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে তিনজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ১১ দিনে ১০৫ জন হামের রোগী ভর্তি হয়। গতকাল বিকেল পর্যন্ত সেখানে ভর্তি ছিল ৬৯ জন। এ পর্যন্ত ময়মনসিংহ মেডিকেলে তিনটি শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
দাতা সংস্থাগুলোর একটি সূত্র জানিয়েছে, এ বছরের ৪ জানুয়ারি কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রথম হাম শনাক্ত হয়। ১০ জানুয়ারি ক্যাম্প এলাকায় সতর্কতা জারি করা হয়। একই সময় রাজধানীর বস্তি এলাকায় হামের রোগী বেড়ে যেতে থাকে।
বাংলাদেশ হামমুক্ত দেশ নয়। তবে টিকা কর্মসূচির কারণে হামের প্রকোপ কিছুটা কমে এসেছিল। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিশুরা নিয়মিত টিকা পাচ্ছে না। দেশে কয়েক বছর ধরে হাম ও রুবেলা টিকার ক্যাম্পেইনও হয় না।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, শিশুদের ৯ মাস বয়সে হামের টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। অন্যদিকে ক্যাম্পেইনের সময় ৯ মাস থেকে ১০ বছরের সব শিশুকে টিকা দেওয়া হয়। সর্বশেষ জাতীয় ক্যাম্পেইন হয়েছে ২০২০ সালে। তখন ৩ কোটি ৪০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার কথা ছিল। তার আগে ক্যাম্পেইন হয়েছিল ২০১৪ সালে।
টিকাদান পরিস্থিতি জানতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। মুঠোফোনে বার্তা পাঠিয়েও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় গুদামে হাম–রুবেলার টিকার মজুত শূন্য। কোন জেলা বা উপজেলায় টিকার মজুত ফুরিয়ে গেছে, তা তাঁর জানা নেই।
সরকারি একাধিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সব শিশু ঠিক সময়ে টিকা পাচ্ছে না। কিছু জায়গায় মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মী নেই। কিছু ক্ষেত্রে টিকার সরবরাহও নেই।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও হাম–রুবেলা নির্মূল বিষয়ক ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, হামের প্রাদুর্ভাবের কারণ হতে পারে টিকার সরবরাহের ঘাটতি, এবং কিছু এলাকায় জনবল কম থাকার কারণে শিশুরা টিকার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের হাম হচ্ছে, অথচ টিকা দেওয়া হয় ৯ মাস বয়স থেকে। এ বিষয়ে মন্তব্য চাইলে অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘আমরা বিষয়টি আগেই লক্ষ্য করেছি। এর বৈজ্ঞানিক কারণ খুঁজে বের করা প্রয়োজন। বিষয়টি দেড় বছর আগে মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।’
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, হাম সাধারণত শিশুদের হয়। প্রথমে জ্বর দেখা দেয় এবং তা ধীরে ধীরে তীব্র হয়ে ওঠে। এরপর মুখমণ্ডলে ফুসকুড়ি (র্যাশ) উঠতে শুরু করে এবং ধীরে ধীরে তা সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এই সময় শিশুদের নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়া দেখা দিতে পারে। শিশুদের এসব লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বা হাসপাতালে ভর্তি করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মঈনুল আহসান জানিয়েছেন, দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং জেলা হাসপাতালকে হাম রোগীর চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। রাজধানীতে শিশু হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মার্কেট হাসপাতালে হামে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া হাম বেশি ছড়িয়েছে এমন এলাকায় গণটিকাকরণের (মাস ক্যাম্পেইন) ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে গণটিকাকরণের জন্য পর্যাপ্ত টিকা নেই।

Comments
Comments