স্থানীয় নির্বাচন আর দলীয় প্রতীকে নয়, এগোচ্ছে সরকার
| নির্বাচন | গ্রাফিক্স: পদ্মা ট্রিবিউন |
সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ—সব ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের বদলে নির্দলীয় ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার পথে এগোচ্ছে সরকার। সব ক্ষেত্রেই দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের বিধান বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া অধ্যাদেশের ধারাগুলো নতুন আইনে যুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে। মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘স্থানীয় নির্বাচন (সিটি করপোরেশন) আইন ২০২৬’ অনুমোদনের জন্য তোলা হচ্ছে। এরপর আইনটি পাসের জন্য জাতীয় সংসদে পাঠানো হবে।
নতুন আইনে বিশেষ পরিস্থিতিতে মেয়র ও কাউন্সিলরদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের হাতেই রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া বিশেষ প্রয়োজনে সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগের নিয়মও বহাল রাখা হচ্ছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহমুদুল হাসান জানান, স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার নিয়মটি অন্তর্বর্তী সরকার বাতিল করেছিল। ওই সরকারের অনুমোদন দেওয়া অধ্যাদেশের ধারাগুলোই এখন নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে তোলা হচ্ছে। সেখানে অনুমোদিত হলে প্রস্তাবটি সংসদ সচিবালয়ে পাঠানো হবে। সংসদই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে যে স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে নাকি নির্দলীয় হবে। মন্ত্রণালয় শুধু আগের সরকারের রেখে যাওয়া বিষয়গুলো মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সংসদে আইন পাস না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নিয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।
‘স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন ২০২৬’-এ ২০১৫ সালের সংশোধিত আইনের বেশ কিছু ধারা বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। যেমন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যুক্ত করা ৩২(ক) ধারাটি বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। ওই ধারায় বলা ছিল, মেয়র পদে লড়তে হলে কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিক দলের মনোনীত বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হবে। নতুন প্রস্তাবে এই নিয়ম বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া রাজনৈতিক দলভিত্তিক অংশগ্রহণের বিষয়ে থাকা ৩৫ নম্বর ধারাটিও বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে ১৩(ক) ও ২৫(ক) ধারা দুটি নতুন আইনেও রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ১৩(ক) ধারা অনুযায়ী, জনস্বার্থে বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার মেয়র ও কাউন্সিলরদের অপসারণ করতে পারবে। আর ২৫(ক) ধারা অনুযায়ী, সরকার প্রয়োজনে প্রশাসক নিয়োগ দিতে পারবে।
২০১৫ সালে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক চালু করেছিল। তবে সমালোচকদের মতে, দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের ফলে দেশে মনোনয়ন-বাণিজ্য শুরু হয় এবং নির্বাচনে সহিংসতা বেড়ে যায়। এই পদ্ধতির কারণে স্থানীয় পর্যায়ের সম্মানিত ব্যক্তিরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারতেন না।
এসব কারণে দীর্ঘ দিন ধরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনও দলীয় প্রতীক বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। পরে অন্তর্বর্তী সরকার দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের নিয়ম বাতিল করে গত বছরের জুলাইয়ে একটি অধ্যাদেশ জারি করে। বর্তমান সরকার সেই বিধানটিই বহাল রাখছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় জয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে তোড়জোড় শুরু হয়েছে এবং রাজনৈতিক দলগুলোও প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া শুরু হবে। তবে তার আগে ১২ মার্চ শুরু হতে যাওয়া সংসদ অধিবেশনে আইনটি পাস হতে হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দলীয় প্রতীকে স্থানীয় নির্বাচন দেশের জন্য ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। এর ফলে সহিংসতা, প্রার্থীর সংকট এবং অযোগ্য প্রার্থীর দাপট দেখা গেছে। তাঁর মতে, স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয় ও সম্মানিত ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে নির্দলীয় নির্বাচন হওয়া প্রয়োজন।
Comments
Comments