তেল বিক্রিতে সীমা, রাজধানীর পেট্রলপাম্পে গাড়ির দীর্ঘ সারি
![]() |
| জ্বালানি তেলের জন্য দীর্ঘ লাইনে মোটরসাইকেলচালকেরা। আজ শনিবার সকালে, রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। সরকারকে এখন চড়া দামে জ্বালানি তেল কিনতে হচ্ছে। সাশ্রয়ের জন্য দিনে তেল কেনার সীমাও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজধানীর জ্বালানি তেল বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘ অপেক্ষার এই মিছিলে একদিকে যেমন মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে, অন্যদিকে চাহিদামতো তেল না পাওয়ার অসন্তোষও প্রকট হচ্ছে।
শনিবার দুপুরে রাজধানীর রমনা ফিলিং স্টেশনে অকটেন নেওয়ার জন্য ৪০ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন মোটরসাইকেল চালক অপূর্ব বিশ্বাস। তাঁর কণ্ঠেও ঝরল সেই অসন্তোষের সুর। তিনি বলেন, ‘তেল নিতে নিতেই যদি দিনের অর্ধেক সময় পার হয়ে যায়, তবে বাকি সময়ের আয় দিয়ে কি আর সংসার চলে?’
অপূর্ব বিশ্বাস ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালান। আগে দিনে সর্বোচ্চ দুইবার তেল নিলেই তিনি সারা দিন যাত্রী পরিবহন করতে পারতেন। কিন্তু সরকার একবারে দুই লিটারের সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়ার পর এখন তাঁকে দিনে চার থেকে পাঁচবার তেল নিতে হচ্ছে। অপূর্ব বলেন, ‘এই নতুন নিয়মের কারণে আমাদের মতো চালকদের সবচেয়ে বেশি কষ্ট হচ্ছে।’
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করার পর ইরানও পাল্টা হামলা চালায়। এতে তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন বন্ধ করে দিয়েছে এবং হামলার কারণে কাতারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
বিশ্ববাজারের এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে জ্বালানি তেল বিক্রয়কেন্দ্রে (ফিলিং স্টেশন) ভিড় করতে শুরু করেন। এমন অবস্থায় গতকাল শুক্রবার তেল সরবরাহের সীমা নির্দিষ্ট করে দেয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। নতুন এই নিয়ম অনুযায়ী, একটি মোটরসাইকেল দিনে সর্বোচ্চ ২ লিটার পেট্রল বা অকটেন নিতে পারবে। ব্যক্তিগত গাড়ির (প্রাইভেটকার) ক্ষেত্রে দিনে ১০ লিটার তেল বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়া ছোট বাস বা মাইক্রোবাস দিনে ২০ থেকে ২৫ লিটার পর্যন্ত তেল পাবে।
শনিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর বেশ কয়েকটি জ্বালানি তেল বিক্রয়কেন্দ্র ঘুরে প্রতিটি স্থানেই মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির (প্রাইভেটকার) দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর যে পরিমাণ তেল পাওয়া যাচ্ছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে।
![]() |
| দীর্ঘ অপেক্ষার পর জ্বালানি তেল নিচ্ছেন একজন মোটরসাইকেলচালক। আজ শনিবার সকালে, রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
মালিবাগের হাজীপাড়া ফিলিং স্টেশনের সামনে হাতে মাইক নিয়ে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়িগুলোকে সারিবদ্ধভাবে তেল নেওয়ার নির্দেশনা দিচ্ছিলেন পাম্পকর্মী মো. শিকদার।
সেই লাইনে এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন মো. রবিউল ইসলাম। তিনি গত ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাজধানীতে মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন করেন। মাত্র দুই লিটার তেলের জন্য এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই উবারচালক।
রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আগে এক-দুইবার তেল নিয়ে সারা দিন বাইক চালাতে পারতাম। এখন চার-পাঁচবার তেল নেওয়ার জন্য প্রায় ছয় ঘণ্টার মতো লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। দিনে যদি ৬ ঘণ্টা বাইক চালাই, তবে বাকি ৬ ঘণ্টা তো তেলের লাইনেই চলে যাচ্ছে।’
![]() |
| জ্বালানি তেলের জন্য গাড়ির লাইন এক কিলোমিটার ছাড়িয়েছে। আজ শনিবার সকালে, রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
যেকোনো সংকট তৈরি হলে সাধারণ মানুষই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। রবিউল ইসলামও নিজেকে এখন সেই ভুক্তভোগীদের একজন মনে করছেন।
তবে হাজীপাড়া ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে আসা জাওয়াদ আল জাফিরের মত কিছুটা ভিন্ন। তিনি বলেন, ‘সরকার তেলের এই সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়ার ফলে কেউ আর অতিরিক্ত তেল জমিয়ে রাখতে পারবে না। আমি বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবেই দেখছি। যদিও তেলের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে, তবুও এতে করে বড় ধরনের সংকট তৈরি হবে না বলে আমার বিশ্বাস।’
এদিকে রমনা ফিলিং স্টেশনে একটি বাঁশ দিয়ে ঘেরাও করে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়িগুলোর সারি ঠিক রাখার চেষ্টা করছিলেন পাম্পের দুই কর্মী রাফাত আহমেদ ও মো. রবি।
![]() |
| জ্বালানি তেলের জন্য লাইন। আজ শনিবার দুপুরে রাজধানীর আসাদ গেইটের একটি ফিলিং স্টেশনে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
পাম্পের ব্যবস্থাপক মো. ওসমান জানান, ‘আমরা সরকারের বেঁধে দেওয়া নিয়ম মেনেই তেল বিক্রি করছি। গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ কেন্দ্র থেকে তেল পেয়েছি। শুক্র ও শনিবার তো বন্ধ। আগামীকাল থেকে চাহিদা অনুযায়ী তেল পাওয়া যাবে কি না, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে আশা করছি কোনো সংকট হবে না।’
তেল নেওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি ভিড় দেখা গেছে পরীবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিসিং সেন্টারে। এই স্টেশনে তেল নেওয়ার জন্য মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির সারি সকালে ২০০ থেকে ৩০০ মিটার ছাড়িয়ে যায়। দুপুর পর্যন্ত সেখানে একই অবস্থা ছিল। এমনকি গতকাল রাত ১০টার পরেও এমন দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
![]() |
| নীলক্ষেতে একটি ফিলিং স্টেশন ছিল বন্ধ। আজ শনিবার সকালে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
এই স্টেশনে দেড় ঘণ্টারও বেশি সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে তেল নেন উবারচালক মাসুদুর রশিদ। তিনি বলেন, ‘এই ভোগান্তি কবে শেষ হবে জানি না। তেল নিতে নিতেই দিনের অর্ধেক সময় পার হয়ে যাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবারও তেলের সমস্যার কারণে গাড়ি চালাতে পারিনি। আগে যেখানে দিনে ১ হাজার থেকে ১২০০ টাকার ভাড়া পেতাম, এখন সেখানে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা আয় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।’
এর মধ্যে কয়েকটি তেল বিক্রয়কেন্দ্রে বিক্রি বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। পরীবাগের পূর্বাচল ট্রেডার্সে বেলা ২টার দিকে একটি বোর্ডে লিখে দেওয়া হয় ‘পেট্রল বা অকটেন নেই’। এই প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষক জাফর আহমেদ জানান, ‘শুক্র ও শনিবার ছুটির কারণে সরবরাহ কেন্দ্র থেকে তেল আসে না। আমাদের কাছে যা মজুত ছিল, অতিরিক্ত চাহিদার কারণে তা গতকালই শেষ হয়ে গেছে। এখন কোনো তেল নেই। আগামীকাল ডিপো থেকে তেল আসার পর আবারও বিক্রি শুরু করা যাবে।’
ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে যানবাহনের এই দীর্ঘ সারির কারণে বিভিন্ন সড়কে যানজট তৈরি হয়েছে। এতে রোজার মধ্যে নগরবাসীর ভোগান্তি আরও বেড়েছে।





Comments
Comments