[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

এখনই ধনী দেশ হতে চাচ্ছে না বাংলাদেশ

প্রকাশঃ
অ+ অ-
সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে সরকার | প্রতীকী ছবি 

উন্নয়নশীল দেশের কাতারে ওঠার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বাংলাদেশ যেন হঠাৎ করেই একটু থেমে যেতে চাইছে। দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং মানব উন্নয়ন সূচকে ধারাবাহিক উন্নতির স্বীকৃতি হিসেবে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি যখন প্রায় চূড়ান্ত, ঠিক তখনই সরকার সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানোর আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছে। অর্থাৎ নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২৬ সালে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাওয়ার সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশ এখন সেই পথে হাঁটতে আগ্রহী নয়—এমন বার্তা এসেছে সরকারের সাম্প্রতিক উদ্যোগ থেকে।

বর্তমান সূচি অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৪ নভেম্বর এলডিসি মর্যাদা থেকে উত্তরণের কথা রয়েছে। তবে সরকার চায় এই সময়সীমা বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত নেওয়া হোক। এ জন্য জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি)-তে আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনীয় তিনটি সূচকে ধারাবাহিক উন্নতি করে আসছে—মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক।

২০১৮ ও ২০২১ সালের পর্যালোচনায় বাংলাদেশ এই তিনটি সূচকেই নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জন করে। ২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে এলডিসি থেকে উত্তরণের অনুমোদন দেয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাঁচ বছরের প্রস্তুতিমূলক সময় শেষে ২০২৬ সালের নভেম্বরেই উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাওয়ার কথা।

অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে জাতিসংঘে জমা দেওয়া ‘পারফরম্যান্স অব ইকোনমি অ্যান্ড প্রিপারেশনস ফর সাসটেইনেবল গ্র্যাজুয়েশন ফ্রম এলডিসি স্টাটাস ডিউরিং দ্য প্রিপারেটরি পিরিয়ড’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশ এখনও এই তিনটি সূচকের মানদণ্ড পূরণ করছে এবং উত্তরণের পথে রয়েছে। পাশাপাশি এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করতে ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি (এসটিএস)’ বাস্তবায়নের অগ্রগতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে প্রতিবেদনে স্বীকার করা হয়েছে—উত্তরণের প্রস্তুতিতে এখনও উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

সরকারের যুক্তি, এলডিসি উত্তরণের জন্য দেওয়া পাঁচ বছরের প্রস্তুতিমূলক সময় পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব মো. শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকীর সই করা একটি চিঠি ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান হোসে আন্তোনিও ওকাম্পোর কাছে পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানা সংকটের কারণে প্রস্তুতিমূলক সময়ের বড় অংশই ব্যয় হয়েছে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং সংকট মোকাবিলায়।

সরকারের ভাষায়, উত্তরণের জন্য যে প্রস্তুতিমূলক সময় দেওয়া হয়েছিল, তা মূলত সংকট ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং টিকে থাকার লড়াইয়েই কেটে গেছে।

চিঠিতে বৈশ্বিক কারণও তুলে ধরা হয়েছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে—কোভিড-১৯ মহামারীর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধজনিত জ্বালানি ও খাদ্য সংকট, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে কঠোরতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধীরগতি। এর ফলে সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হয়েছে, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো নতুন চাপের মুখে পড়েছে।

বৈশ্বিক পরিস্থিতির পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জও উল্লেখ করা হয়েছে—২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক চাপ। এতে সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ ধাক্কায় জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে গেছে, মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, বিনিয়োগের গতি কমেছে, কর-জিডিপি অনুপাত দুর্বল হয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ পড়েছে।

কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে যাওয়ায় শিল্প খাতেও প্রভাব পড়েছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি ধীর হয়েছে এবং দারিদ্র্য বিমোচনের অগ্রগতিও কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাধ্য হয়ে নীতিনির্ধারণের মূল ফোকাস উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে সরিয়ে স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা বজায় রাখা ও সংকট ব্যবস্থাপনার দিকে গেছে।

এলডিসি মর্যাদা হারালে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ কিছু বিশেষ সুবিধা হারাবে—ইউরোপীয় ইউনিয়নের শুল্কমুক্ত সুবিধা (জিএসপি), বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার বিশেষ সুবিধা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহায়তা। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের উচ্চ নির্ভরতার কারণে এসব সুবিধা হারালে রফতানি প্রতিযোগিতা কমে যেতে পারে। এছাড়া বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য শুল্ক নীতিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

সরকারের মতে, তিন বছরের অতিরিক্ত সময় পেলে সামষ্টিক অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল করা, কাঠামোগত সংস্কার এগিয়ে নেওয়া, রফতানি খাতের বহুমুখীকরণ এবং মুক্ত বাণিজ্য ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির প্রস্তুতি জোরদার করা সম্ভব হবে।

পোশাক খাতের উদ্যোক্তাদের একটি অংশও সময় বাড়ানোর উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। বিজিএমইএ’র সভাপতি মাহমুদুল হাসান খান বলেন, এই উদ্যোগের ফলে আমরা বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য কিছুটা সময় পাবো। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি বড় সুফল বয়ে আনতে পারে।

তবে অর্থনীতিবিদদের একাংশ সময় বাড়ানোর বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, এলডিসি উত্তরণ একটি সূচকভিত্তিক প্রক্রিয়া এবং এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল নয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখনও তিনটি প্রধান সূচকের ওপরে রয়েছে। সময় বাড়ানোর জন্য শক্তিশালী যুক্তি দেখানো প্রয়োজন। সাধারণত অন্তত দুটি সূচকে উল্লেখযোগ্য অবনতি দেখা গেলে উত্তরণ বিলম্ব হয়। শুধুমাত্র সামষ্টিক অর্থনৈতিক চাপ দেখিয়ে সময় বাড়ানো সহজ হবে না।

সব মিলিয়ে এলডিসি উত্তরণকে ঘিরে বাংলাদেশ এখন গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনের গর্ব, অন্যদিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বাণিজ্য ঝুঁকি—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের আবেদন গৃহীত হবে কিনা, তা নির্ভর করবে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটির মূল্যায়ন এবং পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তের ওপর।

স্পষ্টত—এলডিসি উত্তরণ শুধু মর্যাদার বিষয় নয়, এটি অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং নীতিনির্ধারণের একটি বড় মোড়। আপাতত সেই মোড়ে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যেন বলছে— এখনই ধনী দেশ হতে চাই না বাংলাদেশ।

Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন