সলিমপুর জঙ্গলে কী আছে, যা ভয় ছড়াচ্ছে
![]() |
| পাহাড়ের মাঝখানের এই সড়ক ধরে ঢুকতে হয় জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগরে। সম্প্রতি তোলা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের সলিমপুর ইউনিয়নে অবস্থিত জঙ্গল সলিমপুর। এলাকাটির নামের সঙ্গে ‘জঙ্গল’ থাকলেও নির্বিচারে পাহাড় কাটায় এখন তা হারিয়ে যেতে বসেছে। জঙ্গল সলিমপুর এলাকাটি দুটি অংশে বিভক্ত—একদিকে ছিন্নমূল এলাকা, অন্যদিকে আলীনগর। দুই অংশেই পাহাড় কেটে অবৈধভাবে গড়ে উঠছে অসংখ্য ঘরবাড়ি, দোকানপাট ও বিপণিবিতান। পাহাড় কেটে এখনো চলছে জায়গার কেনাবেচা।
পাহাড় কেটে এই ব্যবসা পরিচালনাকে কেন্দ্র করে জঙ্গল সলিমপুরে গড়ে উঠেছে একাধিক সন্ত্রাসী বাহিনী। বাধা ছাড়াই পাহাড় কাটা চালিয়ে যেতে বাইরের মানুষের প্রবেশ এই এলাকায় অনেকটা নিষিদ্ধ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও অভিযান চালাতে গিয়ে বিভিন্ন সময় হামলার মুখে পড়তে হয়েছে। সম্প্রতি অভিযানে যাওয়া র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) এক সদস্যকেও পিটিয়ে হত্যা করে স্থানীয় সন্ত্রাসীরা। বাইরের বাসিন্দাদের কাছে জঙ্গল সলিমপুর এখন এক আতঙ্কিত এলাকা হিসেবে পরিচিত।
সোমবার এলাকাটিতে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও এপিবিএন যৌথ অভিযান চালায়। অভিযানে থাকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা জানান, জঙ্গল সলিমপুরে যেভাবে পাহাড় কাটা হচ্ছে, তা বন্ধ করা না হলে খুব দ্রুতই এলাকাটি পাহাড়শূন্য হয়ে পড়বে।
চট্টগ্রাম শহরের বায়েজিদ বোস্তামী থেকে দুই কিলোমিটার পশ্চিমে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটি। এর বিপরীতে সংযোগ সড়কের উত্তর পাশে ৩ হাজার ১০০ একর জায়গায় জঙ্গল সলিমপুরের অবস্থান। সীতাকুণ্ডে এর অবস্থান হলেও এলাকাটি অনেকটা শহরের ভেতরেই। এর পূর্ব দিকে রয়েছে হাটহাজারী উপজেলা এবং দক্ষিণে বায়েজিদ থানা।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নব্বইয়ের দশকে সন্ত্রাসী আলী আক্কাস জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন শুরু করেন। নিজের দখল ধরে রাখতে তিনি একটি নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলেন। এলাকাটি দুর্গম পাহাড়ে হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেখানে সহজে পৌঁছাতে পারত না। এই সুযোগে আলী আক্কাসের বাহিনী নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে সরকারি পাহাড়ি জমি বিক্রি শুরু করে। জায়গার কেনাবেচা ও পাহাড় দখল নিয়ে একপর্যায়ে এই বাহিনীর ভেতরেই দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। এর মধ্যেই র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ আলী আক্কাস মারা যান। তার মৃত্যুর কিছুদিন পর আক্কাসের সহযোগী কাজী মশিউর রহমান, ইয়াসিন মিয়া, গফুর মেম্বার ও গাজী সাদেক আলাদা আলাদা দল গঠন করেন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইয়াসিন সীতাকুণ্ডের এস এম আল মামুনের আশ্রয়ে ছিলেন। আল মামুন সীতাকুণ্ডের সাবেক সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নেতা। ইয়াসিন বর্তমানে আলীনগর বহুমুখী সমিতির নেতৃত্বে রয়েছেন। অন্যদিকে মহানগর ছিন্নমূল বস্তিবাসী সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে রয়েছেন কাজী মশিউর ও গাজী সাদেক। যাঁরা পাহাড়ের জায়গা কিনেছেন, তাঁরাই এই দুই সমিতির সদস্য। বর্তমানে এই দুই সংগঠনে প্রায় ৩০ হাজার সদস্য রয়েছেন।
![]() |
| জঙ্গল সলিমপুরে পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে বসতি | ফাইল ছবি |
সরেজমিনে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম শহরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক দিয়ে জঙ্গল সলিমপুরে যেতে হয়। এই সড়কের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের উল্টো দিকের অন্য একটি সড়ক দিয়ে কিছুদূর গেলেই জঙ্গল সলিমপুর এলাকা শুরু।
বিশাল পাহাড় কেটে জঙ্গল সলিমপুরের প্রধান সড়কটি তৈরি করা হয়েছে। সড়ক ধরে পাহাড়ের টিলা পার হলেই ডান পাশে নুরুন্নবী শাহ (র.)-এর মাজার। আরও কিছুদূর সামনে এগোলে এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়। এর আশপাশে দোতলা বিপণিবিতানসহ অনেক দোকানপাট রয়েছে। সোমবার কয়েকটি দোকান বন্ধ থাকলেও বেশির ভাগই খোলা ছিল। দোকানে লোকজনের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো। সড়কের দুই পাশে অসংখ্য ঘরবাড়ি। এসব ঘরের কোনোটি পাহাড়ের নিচে, আবার কোনোটি পাহাড়ের ঢালে। চলাচলের জন্য সেখানে রয়েছে একাধিক পথ।
সোমবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের সময় সড়কের পাশে ও পাহাড়ের নিচে থাকা ঘরবাড়ির সামনে নারী ও শিশুদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। পুরুষদের উপস্থিতি ছিল কম। তবে সবার চোখেমুখেই আতঙ্কের ছাপ ছিল।
এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের আগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর দলীয় কার্যালয় এবং কিছুটা দূরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির জঙ্গল সলিমপুর শাখার কার্যালয় দেখা গেছে। গত ১৯ জানুয়ারি অভিযানে যাওয়ার সময় এই কার্যালয়ের পাশেই র্যাব-৭ চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় আরও চার র্যাব সদস্য আহত হন।
এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের সামনের একটি মোড় থেকে তিনটি রাস্তা তিন দিকে চলে গেছে। একটি রাস্তা গেছে আলীনগরের দিকে। সেই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা যায়, পাহাড়ের চূড়ায় ও নিচে অসংখ্য ঘরবাড়ি। পাহাড়ের পাদদেশে দালানকোঠাও গড়ে উঠেছে। যাতায়াতের জন্য রয়েছে ছোট ছোট পথ এবং বিদ্যুতের খুঁটিও দেখা গেছে।
উচ্চবিদ্যালয়ের সামনের বাঁ দিকের রাস্তা ধরে এগোলে কাঁঠালতলা নামের একটি এলাকা পড়ে। এরপর লটকাটুলির মাজার পার হলে ডানে ও বাঁয়ে দুটি রাস্তা পাওয়া যায়। বাঁ দিকের রাস্তায় লোকনাথ মন্দির এবং এরপর রীনার ঘোনা এলাকা। আর ডান দিকের রাস্তা দিয়ে গেলে লোহার ব্রিজ এলাকায় পৌঁছানো যায়। পুরো এলাকাটিই পাহাড় দিয়ে ঘেরা। তবে বেশির ভাগ পাহাড়ই এখন বৃক্ষহীন ও ন্যাড়া। পাহাড়ে গাছপালা বলতে তেমন কিছু নেই। উল্টো পাহাড়ের ঢালে ইটের দেয়াল তুলে বিক্রির জন্য জায়গা বা প্লট প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে। সেখানে কিছু ঘরবাড়িও দেখা গেছে।
![]() |
| চট্টগ্রামের জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান। গতকাল সকালে তোলা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ড পার হয়ে আলীনগর যেতে হয়। এর আগে এলাকাটিতে সশস্ত্র পাহারা দেখা গেলেও সোমবার তা দেখা যায়নি। বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকায় বাইরের মানুষের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে রেখেছে আলীনগরের নিয়ন্ত্রণকারী ইয়াসিন বাহিনীর প্রধান ইয়াসিন। সেখানে নিজের পরিচয় দিয়ে অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের কোনো আত্মীয়স্বজন এলে তাঁরাই মূল ফটকে এসে অতিথিদের ভেতরে নিয়ে যান।
আলীনগর অটোরিকশা স্ট্যান্ড এলাকায় তিনটি বাজার রয়েছে। এটি দুর্গম পাহাড়ি এলাকা। বাজারের পেছনে পাহাড়ের নিচে সব কাঁচা-পাকা ঘরবাড়ি। এ ছাড়া ইটের দেয়াল দিয়ে ঘেরা কিছু খালি জায়গাও রয়েছে।
যৌথ বাহিনীর অভিযানে থাকা পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি নাজমুল হাসান বলেন, অভিযানের সময় কিছু বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকায় যাওয়ার পর আলীনগরে ঢোকার মুখে একটি ট্রাক দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেটি সরিয়ে সামনে এগোয়। কিছুদূর গিয়ে দেখা যায়, রাতের অন্ধকারে একটি কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়েছে। পরে ইট-বালু ফেলে তা ভরাট করে বাহিনীর গাড়ি আলীনগরে প্রবেশ করে।
আলীনগর অটোরিকশা স্ট্যান্ড পার হয়ে সোজা উত্তর দিকে এগোলে একটি আবাসিক এলাকা। সেখানে ইট বিছানো প্রশস্ত সড়ক। দুই পাশে সব পাকা ঘরবাড়ি আর ইটের দেয়াল দেওয়া প্লট। রয়েছে বিদ্যুতের খুঁটিও। ঘরবাড়ির কাছেই বড় বড় পাহাড়, যার বেশির ভাগ অংশ এরই মধ্যে কেটে ফেলা হয়েছে।
আধা কিলোমিটার যাওয়ার পর আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়। বিদ্যালয়ের ৫০০ গজ আগে দেখা গেছে, সড়কে পড়ে আছে লোহার বড় গেট। এটি লাগানোর জন্য পিলারও তৈরি করা হয়েছে। বিদ্যালয়টির ডানে অন্ধ কলোনি, এরপর বনশ্রী এলাকা। বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকাটিতে দোকানপাট ও দোতলা বিপণিবিতান রয়েছে। এর কিছুদূর গেলেই লাল গেট। লাল গেটের পর থেকে চট্টগ্রাম সেনানিবাস এলাকা শুরু।
আলীনগরের শেষ এলাকা উত্তর আলীনগরে গিয়ে দেখা যায়, বড় বড় পাহাড় কেটে সড়ক তৈরি করা হয়েছে। আর পাহাড়ের নিচে সব ঘরবাড়ি ও ইটের দেয়ালে ঘেরা প্লট। টিনের ঘেরাও দিয়ে কাটা হচ্ছে পাহাড়।
জঙ্গল সলিমপুরের অন্তত ৮ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কম টাকায় থাকার জায়গা করার জন্য তাঁরা পাহাড়ের এসব প্লট কিনেছেন। বছরের পর বছর ধরে এখানে বসতি গড়ে উঠেছে। কাউকে উচ্ছেদ করলে সরকার যাতে অবশ্যই বিকল্প থাকার ব্যবস্থা করে—এমন দাবি তাঁদের।
সরেজমিনে দেখা যায়, ৩ হাজার ১০০ একরের এই পাহাড়ি এলাকায় সড়কের আশপাশের সব পাহাড় বৃক্ষহীন হয়ে গেছে। আর যেগুলো আছে, সেগুলো ধাপে ধাপে কাটা হচ্ছে।
২০২২ সালের ২৩ জুন তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক জঙ্গল সলিমপুর এলাকাকে ১১টি ভাগে ভাগ করে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার-২, মডেল মসজিদ, নভোথিয়েটারসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনার কথা জানান। ধারণক্ষমতার তিন গুণের বেশি বন্দি থাকায় নতুন কারাগার তৈরির জন্য সলিমপুরে ৫০ একর জায়গা নির্ধারণ করা হয়। পরে জেলা প্রশাসন ও কারা অধিদপ্তরের মধ্যে এ বিষয়ে চিঠি চালাচালিও হয়।
চট্টগ্রাম আদালত ভবন, মেডিকেল কলেজ ও পুলিশ লাইনের দূরত্ব বিবেচনায় জঙ্গল সলিমপুরকে কারাগারের জন্য উপযুক্ত মনে করা হয়েছিল। এখান থেকে আসামিদের আদালতে আনা-নেওয়া সহজ হতো। কারা কর্তৃপক্ষ সব প্রস্তুতিও নেয়। তবে গত বছরের মার্চে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন জানায়, জঙ্গল সলিমপুরের জমিগুলো দখলে আছে। উদ্ধার না হওয়ায় তা কারা কর্তৃপক্ষকে দেওয়া যাচ্ছে না।
অভিযান শেষে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি আহসান হাবীব পলাশ সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা বিভাগীয় কমিশনার ও প্রশাসনকে অনুরোধ করব এই এলাকায় প্রশাসনের নেওয়া পরিকল্পনাগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করার জন্য।’
জানতে চাইলে বিভাগীয় কমিশনার মো. জিয়াউদ্দীন বলেন, ‘আমাদের এখানে প্রশাসনের যে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হওয়ার দরকার ছিল, তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সরকার আগে এই এলাকা ঘিরে যে উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েছিল, এখন সেটি আমরা শুরু করব।’
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের সরকারি জায়গা যাতে আর কোনো অবস্থাতেই বেহাত না হয়, এ বিষয়ে প্রশাসনকে কঠোর থাকতে হবে। পাশাপাশি এসব জায়গায় সরকারি গুরুত্বপূর্ণ যেসব স্থাপনার পরিকল্পনা রয়েছে, সেগুলোর কাজ দ্রুত শুরু করতে হবে।



Comments
Comments