প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থায় পরিবর্তনের আভাস
- চলতি মাসের মধ্যেই পদত্যাগ করতে পারেন কয়েকজন প্রসিকিউটর
- ৫ আগস্টের পর জামায়াতপন্থিদের হাতে ছিল প্রসিকিউশনের মূল কর্তৃত্ব
- এ সময় আসামিপক্ষের আইনজীবীরা হয়ে যান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী
- শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডসহ তিন রায়ের নথি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থায় শিগগিরই পরিবর্তন আসছে। জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল এবং স্বচ্ছ করতে নতুন সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে প্রাথমিকভাবে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রসিকিউশন বিভাগ ও তদন্ত সংস্থাকে নতুন করে ঢেলে সাজানো।
বর্তমানে দুটি ট্রাইব্যুনালে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় হত্যা ও নির্যাতনসহ ২১টি মামলার বিচার চলছে। নতুন প্রধান প্রসিকিউটরের হাত ধরে ট্রাইব্যুনালে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, চলতি মাসের মধ্যেই বিতর্কিত কয়েকজন প্রসিকিউটর পদত্যাগ করতে পারেন বা তাঁদের সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। বিদায়ী প্রধান প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে পেশাগত অসদাচরণ, শৃঙ্খলাভঙ্গ ও অনৈতিক কাজের যেসব অভিযোগ জমা পড়েছে, তা তদন্ত করতে বিশেষ দল গঠন করা হতে পারে।
পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই ট্রাইব্যুনালে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডসহ যে তিনটি রায় ঘোষণা হয়েছে, সেগুলোর মামলা ও রায়ের নথিপত্র নতুন করে পরীক্ষা করা হবে। এসব মামলার তদন্তে বড় ধরনের কোনো গাফিলতি, অবহেলা বা ত্রুটি রয়েছে কি না এবং রায়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অমিল পাওয়া গেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নতুন প্রধান প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।
তবে ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রয়োজন অনুযায়ী প্রধান প্রসিকিউটর মামলার তদন্ত ও রায় পরীক্ষা করতে পারেন বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। তিনি বলেন, পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য মামলা বিশ্লেষণ করে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে দেখা যেতে পারে আপিল সঠিকভাবে জমা দেওয়া হলো কি না।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন বিভাগের একাধিক সূত্র বলছে, দুটি ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে যে ২১টি মামলার বিচার চলছে, তার বেশির ভাগ আসামি করা হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের মৌখিক আদেশে। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে বসে এসব মামলায় আসামি কারা হবেন, তা ঠিক করা হতো। এসব অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করতে চায় নতুন প্রসিকিউশন। পাশাপাশি দল নিষিদ্ধের বিধান, সেনাসদস্যদের বিচার করাসহ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি হওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চারটি অধ্যাদেশের গ্রহণযোগ্যতা ও আইনি বৈধতা নিয়ে পর্যালোচনা করবে নতুন প্রসিকিউশন। অনেকে মনে করছেন, সঠিকভাবে তদন্ত হলে প্রসিকিউশনের অনেক অজানা গুরুতর অভিযোগ বেরিয়ে আসবে।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যাল গঠিত হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও স্থানীয় সহযোগী রাজাকার, আলবদর ও আলশামসের অপরাধের বিচার করা। তবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এই বিচার প্রক্রিয়া থমকে যায়।
২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকারের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল যুদ্ধাপরাধের বিচার করা। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ১৯৭৩ সালের আইনটি সংশোধন করে এবং ২০১০ সালের ২৫ মার্চ প্রথম ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। মামলা বেড়ে যাওয়ায় ২০১২ সালের ১২ মার্চ আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি প্রথম রায়ের মাধ্যমে ফরিদপুরের আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এই ট্রাইব্যুনালে জামায়াত-বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতাকে সাজা দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দুটি ট্রাইব্যুনালে ৬৬টি মামলার রায় হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নতুন মাত্রা যোগ হয়। রাতারাতি আসামি পক্ষের আইনজীবীরা হয়ে যান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। অন্তর্বর্তী সরকার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তাজুল ইসলামকে প্রধান প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেয়। যদিও তিনি আগে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের আইনজীবী ছিলেন। একই সঙ্গে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়।
বর্তমানে ট্রাইব্যুনালের ২১টি মামলায় ৪৫৭ জনের বিচার চলছে। আসামিদের মধ্যে ২৮৩ জন পলাতক এবং ১৬৪ জন কারাগারে আছেন। প্রথমে একটি ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হলেও পরে গত বছর আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। দুই ট্রাইব্যুনালে এ বছর ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৪টি মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে তিনটি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে একটিতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ১১ জনকে। রাজসাক্ষী হওয়া এক আসামিকে এই মামলায় খালাস দেওয়া হয়। আগামী ৯ এপ্রিল রংপুরের আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করা হবে। জুলাইয়ের ঘটনায় আরও ৩৪টি মামলা এখনও তদন্তাধীন।
এছাড়া আওয়ামী লীগ শাসনামলে গুম, খুন ও অপহরণের অপরাধে বিচারের মুখোমুখি হয়েছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান। সাবেক ও বর্তমান ২০ জন সেনা কর্মকর্তাও এ মামলার আসামি। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ৬৫ জন জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার আসামি।
গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রসিকিউশনের মূল কর্তৃত্ব ছিল। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই নেতৃত্ব বদলে যায়। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রধান প্রসিকিউটরের নিয়োগ বাতিল করে বিএনপি সরকার। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আমিনুল ইসলামকে নতুন প্রধান প্রসিকিউটর নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রশ্ন উঠেছে, তাজুল ইসলামকে সরানোর পর কি ট্রাইব্যুনাল বিতর্কমুক্ত হয়েছে? তাঁর বিদায়ের দিন থেকেই নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড ও অনিয়মের অভিযোগ বেরিয়ে আসছে। প্রসিকিউশন থেকে তথ্য পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। এসব নিয়ে প্রসিকিউশনে অস্থিরতা ও হতাশা বিরাজ করছে।
এসব বিষয়ে নতুন প্রধান প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, শিগগিরই ট্রাইব্যুনাল সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও আইনগতভাবে সব সিদ্ধান্ত নেবে।
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেছেন, বিচারের নামে ১৭ মাস ধরে বিনা বিচারে অনেককেই আটকে রাখা হয়েছে। প্রধান প্রসিকিউটর পরিবর্তনের ফলে প্রতিহিংসার অবসান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

Comments
Comments