ভোটের রাজনীতিতে ফেরার কৌশল খুঁজছে আওয়ামী লীগ
![]() |
| রাজধানী গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের ভেঙে ফেলা কার্যালয় | ফাইল ছবি |
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন পরিকল্পনা করছে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দল আওয়ামী লীগ। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাইরে থাকা দলটি এখন সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ—এই চার স্তরের নির্বাচনে নিজেদের যুক্ত করার পথ খুঁজছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে নির্বাচনী রাজনীতিতে ফিরে আসা।
আত্মগোপনে থাকা এবং দেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে দলটির এমন পরিকল্পনার কথা জানা গেছে। দলের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো বলছে, স্থানীয় নির্বাচনের পাশাপাশি তাদের আরেকটি লক্ষ্য হলো বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচন। বিশেষ করে আইনজীবী সমিতিগুলোর নির্বাচনে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতে চায় তারা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর স্থানীয় সরকারের প্রায় সব স্তরের জনপ্রতিনিধিদের পদ শূন্য হয়ে যায়। বর্তমানে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে এবং পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা থাকা আওয়ামী লীগের নেতারা একে রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাদের ধারণা, এসব নির্বাচনে ব্যক্তিগত প্রভাব, স্থানীয় নানা বিষয় এবং দলীয় সমর্থন—সবই ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করছেন, পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফিরে আসতে হলে আগে স্থানীয় নির্বাচনে যুক্ত হতে হবে। সেই লক্ষ্যেই কারাগারে থাকা নেতা-কর্মীদের জামিনের বিষয়ে জোর দেওয়া হবে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য সরকার ও আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে দলটির।
সর্বশেষ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ১৭টি পদের মধ্যে ৭টি পদে জয়ী হয়েছে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্যানেল। যদিও সভাপতি পদে বিএনপি সমর্থিত এবং সাধারণ সম্পাদক পদে জামায়াতে ইসলামী সমর্থিত প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন।
এর আগে ২৬ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে সভাপতিসহ ১০টি পদে জয় পেয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা। ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নোয়াখালী জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্যানেল সাধারণ সম্পাদকসহ ৯টি পদে জয়ী হয়েছে। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুরে ৮টি ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৬টি পদে জয় পেয়েছে।
এসব নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীও অংশ নেয়। সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মতো শীর্ষ পদগুলোতে বিএনপি বা জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরাই জয়ী হয়েছেন।
সারা দেশে ৭৪টি আইনজীবী সমিতি রয়েছে। আওয়ামী লীগের দলীয় হিসাব অনুযায়ী, শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর ১৪টি আইনজীবী সমিতির নির্বাচন হয়েছে। এসব নির্বাচনে বিভিন্ন পদে আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা উল্লেখযোগ্য ফলাফল করেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে আগামী ১৩ ও ১৪ মে অনুষ্ঠেয় উচ্চ আদালত আইনজীবী সমিতির নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই আইনজীবী সংগঠনের নির্বাচনে শীর্ষ পদে জয়ের ব্যাপারে খুব বেশি আশাবাদী না হলেও অন্যান্য পদে ভালো ফল করার লক্ষ্য নিয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত আইনজীবীরা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক চালু করেছিল আওয়ামী লীগ সরকারই। তবে এখন দলটির অনেক নেতা-কর্মী মনে করছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া উচিত।
আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হলে দলটির জন্য অংশগ্রহণ সহজ হবে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগের অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। তবে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোট করার সুযোগ থাকবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই নেতাদের মতে, স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক চালু করা আওয়ামী লীগের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। এর ফলে তৃণমূল পর্যায়ে বিভেদ বেড়েছে এবং দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিএনপি ও অন্য রাজনৈতিক দলগুলো একই ভুল করবে না বলেই তাঁদের ধারণা।
সারা দেশে বড় শহরগুলোর স্থানীয় সরকার বা সিটি করপোরেশন আছে ১২টি। এর সব কটিই এখন অনির্বাচিত প্রশাসক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মধ্যে সবচেয়ে নিচের স্তর ইউনিয়ন পরিষদ, যার সংখ্যা সাড়ে চার হাজারের বেশি। উপজেলা রয়েছে প্রায় ৫০০টির মতো এবং পৌরসভার সংখ্যা তিন শতাধিক।
সিটি করপোরেশন থেকে শুরু করে ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত স্থানীয় সরকারের কোনো পর্যায়েই এখন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই। গত দেড় বছরের এই শূন্যতায় সেবা পেতে নানাভাবে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে নাগরিকদের।
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিটি করপোরেশন নির্বাচন দিয়েই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভোট শুরু করার পরিকল্পনা করছে সরকার। এরপর ধাপে ধাপে পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে নির্বাচন কমিশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি পাঠিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করছেন, পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচন তুলনামূলকভাবে সহজ। কারণ, সেখানে দলীয় রাজনীতির প্রভাব থাকলেও তা এতটা তীব্র নয়। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী নির্ধারণের পাশাপাশি সাংগঠনিক ও মাঠপর্যায়ের নানা প্রস্তুতি নিতে হয়। ঈদুল ফিতরের পর তাঁরা সেই প্রস্তুতির কাজ শুরু করার পরিকল্পনা করছেন।
লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিঃসন্দেহে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের জন্য একটা সুযোগ। দলটির চিহ্নিত এবং গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্থানীয় নেতা হয়তো হয়রানির ভয়ে নির্বাচনে অংশ নেবেন না। তবে স্থানীয়ভাবে অনেক জনপ্রিয় ব্যক্তি আছেন যাঁরা নিজ দলের শাসনামলে সুযোগ পাননি; তাঁরা হয়তো এবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন।
মহিউদ্দিন আহমদ আরও বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ পাবে—এটা ঠিক। তবে জাতীয়ভাবে দলটির রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন হবে কি না, তা বলা মুশকিল। কারণ, তাদের পুরো নেতৃত্ব আত্মগোপনে। তাদের মধ্যে অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে অনুশোচনা এখনও দেখা যায়নি। ফলে তাদের জাতীয়ভাবে রাজনীতিতে ফিরতে হলে আরও অনেক কিছু করতে হবে।

Comments
Comments