ডিজেল আমদানিতে গুনতে হচ্ছে বাড়তি অর্থ, ২ জাহাজে অতিরিক্ত ব্যয় ৩৩০ কোটি
জ্বালানির দাম বাড়লে অর্থনীতি চাপে পড়বে। জেট ফুয়েলের দাম এক মাসে দ্বিতীয়বার বাড়ল। সর্বশেষ গতকাল লিটারে বেড়েছে ৯০ টাকা।| প্রতীকী ছবি |
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এর প্রভাব এখন বাংলাদেশেও পড়তে শুরু করেছে। এ মাসে দেশে আসা দুটি ডিজেলবাহী জাহাজের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৩৩০ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি)। সব মিলিয়ে জ্বালানি আমদানিতে আগের তুলনায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বেশি খরচ হচ্ছে।
সরকার বেশি দামে জ্বালানি কিনতে শুরু করলেও দেশে এখনো জেট জ্বালানি ছাড়া ডিজেল, অকটেন ও পেট্রলের দাম বাড়ানো হয়নি। ফলে পরিবহন, শিল্প ও উৎপাদন খাতে এখনো সরাসরি বড় প্রভাব পড়েনি। জ্বালানির দাম বাড়ানো হলে পরিবহন ব্যয় বাড়বে, উৎপাদন খরচ বাড়বে। এর প্রভাব পড়বে পুরো অর্থনীতিতে।
যুদ্ধের আগে বিপিসি জ্বালানি তেল বিক্রি করে লাভ করছিল। গত অর্থবছরে সংস্থাটি প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা লাভ করেছে। যেমন, প্রতি লিটার ডিজেলে ১–২ টাকা, পেট্রল ও অকটেনে ৩–৪ টাকা লাভ করছিল বিপিসি। দাম বাড়ার পর এখন বিপিসি প্রতি লিটার ডিজেলে ৬৮–৬৯ টাকা লোকসান দিচ্ছে বলে কর্মকর্তারা দাবি করছেন। এ পরিস্থিতিতে সরকার ভর্তুকি দেবে, নাকি ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়িয়ে এই বাড়তি খরচ সমন্বয় করবে—সেই সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বেড়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করবে। একই সঙ্গে সরকারকে বেশি দামে খোলাবাজার থেকেও জ্বালানি কিনতে হচ্ছে।
তবে গত সোমবার ঠাকুরগাঁওয়ে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, সামনে সময় সহজ নয়। যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বাড়বে, জিনিসপত্রের দামও বাড়বে, আর সেই চাপ সহ্য করেই এগোতে হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল আনার প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি ইরানি বাহিনীর বন্ধ ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে।
বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৮৮ দশমিক ৪৪ ডলার। গত সোমবার তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩৬ দশমিক ৬০ ডলারে, যা প্রায় ১৬৭ শতাংশ বেশি। একই সময়ে অকটেনের দাম ৭৮ দশমিক ৩৯ ডলার থেকে বেড়ে ১৬৩ দশমিক ৭১ ডলারে ওঠে, অর্থাৎ বৃদ্ধি প্রায় ১০৮ শতাংশ। জেট জ্বালানির দাম ৮৯ দশমিক ৪০ ডলার থেকে বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ২২৮ দশমিক ৪০ ডলারে পৌঁছেছে, যা প্রায় ১৫৫ শতাংশ বেশি। বাড়তি দামে আগামী মাসেও তেল নিয়ে জাহাজ দেশে আসবে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি
| জ্বালানি | পূর্বের মূল্য | বর্তমান মূল্য |
|---|---|---|
| ডিজেল | ৮৮.৪৪ | ২৩৬.৬০ |
| অকটেন | ৭৮.৩৯ | ১৬৩.৭১ |
| জেট ফুয়েল | ৮৯.৪০ | ২২৮.৪০ |
(হিসাব ব্যারেলপ্রতি ডলারে)
আগামী তিন মাসের তেল আমদানির পরিকল্পনা (২০২৬)
| মাস | আমদানির লক্ষ্যমাত্রা (টন) | |
|---|---|---|
| এপ্রিল | ৪,৫০,০০০ টন | |
| মে | ৪,৯০,০০০ টন | |
| জুন | ৪,৩০,০০০ টন | |
বিপিসি সিঙ্গাপুরভিত্তিক মূল্য নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান প্ল্যাটসের সূচক অনুসরণ করে তেল কেনে। তেল জাহাজে তোলার দিনকে ঘিরে আগের দুই দিন, ওই দিন এবং পরের দুই দিনের গড় দাম ধরে প্রতি ব্যারেলের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেশি বেড়ে গেলে আমদানি খরচেও তার প্রভাব দ্রুত পড়ে।
বিপিসির হিসাবে, ১৬ মার্চ ‘এমটি চাং হাং হং টু’ নামের একটি জাহাজে প্রায় ২ লাখ ৩ হাজার ১২৬ ব্যারেল ডিজেল আমদানি করা হয়। যুদ্ধের আগে এই চালানের সম্ভাব্য খরচ ধরা হয়েছিল প্রায় ২৬৩ কোটি টাকা। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় একই পরিমাণ তেলের জন্য এখন খরচ হয়েছে প্রায় ৪২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ একটি জাহাজেই বাড়তি খরচ হয়েছে প্রায় ১৬২ কোটি টাকা। প্রতি ব্যারেল ডিজেলের দাম পড়েছে ১৭০ দশমিক ৯৯ ডলার।
একই ধরনের পরিস্থিতি হয়েছে ‘এমটি রাফালস সামুরাই’ নামের আরেকটি জাহাজের ক্ষেত্রেও। প্রায় ২ লাখ ব্যারেল ডিজেল নিয়ে ১৪ মার্চ দেশে আসে জাহাজটি। যুদ্ধের আগে এর সম্ভাব্য খরচ ছিল প্রায় ২৬৩ কোটি টাকা। কিন্তু চূড়ান্ত হিসাবে তা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৩১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক জাহাজেই বাড়তি খরচ হয়েছে প্রায় ১৬৮ কোটি টাকা।
বিপিসির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, যুদ্ধ শুরুর পর ইতিমধ্যে সাতটি জাহাজ ডিজেল ও একটি জাহাজ ফার্নেস তেল দেশে এসেছে। এর মধ্যে অন্তত ছয়টি জাহাজে অতিরিক্ত খরচ হয়েছে। এই বাড়তি খরচের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে।
গতকাল উড়োজাহাজের জ্বালানি জেট জ্বালানির দাম এক মাসে দ্বিতীয়বার বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। মাসের শুরুতে লিটারে ১৭ টাকা বাড়ার পর এবার বেড়েছে আরও ৯০ টাকা।
দেশের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের জন্য জেট জ্বালানির দাম এখন প্রতি লিটার ২০২ টাকা ২৯ পয়সা। এর আগে ছিল ১১২ টাকা ৪১ পয়সা। গত মাসে তা ছিল ৯৫ টাকা ১২ পয়সা। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটারের দাম ০.৭৩৮৪ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১.৩২১৬ ডলার করা হয়েছে।
দেশে মোট জ্বালানি ব্যবহারের বড় অংশই ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৬৩ শতাংশ পূরণ হয় ডিজেল দিয়ে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দেশে ডিজেলের চাহিদা ছিল প্রায় ৪৩ লাখ টন, যার প্রায় ৮০ শতাংশই সরাসরি আমদানি করা হয়। বাকি অংশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে দেশে পরিশোধন করা হয়। কৃষিতে সেচ, সড়ক পরিবহন, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ডিজেলের ব্যবহার বেশি, যা এখনো দেশের বাজারে আগের দামে বিক্রি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেহেতু বিপিসি গত কয়েক বছরে বড় অঙ্কের লাভ করেছে, তাই এই বাড়তি খরচ তাদের সেই লাভ থেকেই আংশিকভাবে সামাল দেওয়া উচিত। প্রয়োজনে সরকার অন্য খাতের বৈদেশিক খরচ কমিয়ে জ্বালানি আমদানিতে ভর্তুকি দিতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকার ও জনগণ—দুই পক্ষকেই বিলাসী বা অপ্রয়োজনীয় খরচ কমাতে হবে। এখনই একটি নির্দিষ্ট রেশনিং পদ্ধতি চালু করা দরকার, যাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ খাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়।
গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, বর্তমান অস্থির পরিস্থিতিতে কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি চুক্তিতে যাওয়া ঠিক হবে না। যুদ্ধের কারণে বাজার প্রতিদিন বদলাচ্ছে। তাই এখন তিন মাসের পরিকল্পনা ধরে এগোনোই বেশি বাস্তবসম্মত হবে।
Comments
Comments