ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীরা পড়ছে পঞ্চম শ্রেণির বই
![]() |
| ফাইল ছবি |
আইনি জটিলতায় আটকে যাওয়া ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা আগামী এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হবে। শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী এহছানুল হক মিলন এই তথ্য জানিয়েছেন। সম্প্রতি সচিবালয়ে জুনিয়র ও ইবতেদায়ি বৃত্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
শিক্ষাবর্ষের এই সময়ে এসে বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কারণ, গত বছর যাদের পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল, তারা এখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ছে। ফলে নিজেদের নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের এখন আবার নতুন করে পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে।
২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী জানান, গত বছরের এই প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে নেওয়া হবে। এই পরীক্ষায় কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীরাও অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পাঁচটি বিষয়ে মোট ৪০০ নম্বরের ওপর এই বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে ১০০ নম্বর করে এবং প্রাথমিক বিজ্ঞান ও বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ে ৫০ নম্বর করে বরাদ্দ থাকবে।
তবে প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা আয়োজন নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। গত সোমবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত এখনো নেওয়া হয়নি। এখনই এসব বিষয়ে আলোচনা করা অপ্রাসঙ্গিক হবে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কেউ কেউ মনে করছেন, বৃত্তি পরীক্ষা মূলত শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়ায়। এতে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের আরও পিছিয়ে পড়ার ভয় থাকে। এছাড়া কোচিং ও প্রাইভেট পড়ার ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে যাওয়ায় অভিভাবকদের আর্থিক চাপ বাড়ারও আশঙ্কা রয়েছে।
প্রাথমিকে সর্বশেষ পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা হয়েছিল ২০২২ সালে। এর আগে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এই পরীক্ষা চালু ছিল। পরবর্তীতে ২০০৯ সালে পঞ্চম শ্রেণি শেষে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিএসসি) নামে পাবলিক পরীক্ষা শুরু হলে আলাদাভাবে বৃত্তি পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায়। তখন পিএসসির ফলের ভিত্তিতেই শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়া হতো।
ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার গত বছর পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষা আবার চালুর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। সেই অনুযায়ী বছরের শেষে পরীক্ষা হওয়ার কথা থাকলেও আদালতের আদেশে তা স্থগিত হয়ে যায়। এছাড়া মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে গঠিত কমিটি অষ্টম শ্রেণির পাবলিক পরীক্ষা (জেএসসি) বাতিল রাখার সিদ্ধান্ত বহাল এবং জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল।
এ বিষয়ে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন কমিটির আহ্বায়ক ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ বলেন, কমিটি জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষা বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। এ পরীক্ষার ফলে শিক্ষায় বৈষম্য আরও বাড়বে। কারণ, মাত্র নির্দিষ্ট কিছু শিক্ষার্থী এতে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।
অভিভাবকদের একাংশ মনে করছেন, ষষ্ঠ শ্রেণির নিয়মিত ক্লাসের পাশাপাশি আগের বছরের পাঠ্যবই পড়ে নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি চাপ হবে। কারণ একই সময়ে তাদের ষষ্ঠ শ্রেণির প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতিও নিতে হবে।
মানাফ নামের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্যবই সম্পূর্ণ আলাদা। দুই শ্রেণির পড়ার বিষয় ও মূল্যায়নের মধ্যেও পার্থক্য আছে। ফলে ভিন্ন দুই শ্রেণির পড়া একসঙ্গে সামলানো শিক্ষার্থীদের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
রুদ্র নামের আরেক অভিভাবক বলেন, শিক্ষাবর্ষের এই সময়ে পরীক্ষা নিলে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ সৃষ্টি হবে কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।
শিক্ষার্থীরাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, একসঙ্গে দুই শ্রেণির পড়াশোনা করতে হলে প্রাইভেট ও কোচিংয়ের চাপ বাড়বে, যা তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সাদিয়া খাতুন নামের এক শিক্ষার্থী জানায়, পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি এবং ষষ্ঠ শ্রেণির সাময়িক পরীক্ষার ধরন সম্পূর্ণ আলাদা। একসঙ্গে দুই প্রস্তুতি নিতে গিয়ে কোনোটিই ঠিকভাবে শেষ করা সম্ভব না-ও হতে পারে।
এ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, আদালতে রিট থাকার কারণে নির্দিষ্ট সময়ে বৃত্তি পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। এপ্রিলে পরীক্ষা হলে স্কুলের প্রথম সাময়িক পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীরা প্রায় এক মাস সময় পাবে। শিক্ষার্থীরা একটু বাড়তি পরিশ্রম করলে দুটি পরীক্ষাতেই ভালো করতে পারবে। পরীক্ষা না হওয়ার চেয়ে হওয়াটাই ভালো।

Comments
Comments