আলোহীন চোখে মেয়েদের নিয়ে সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন
![]() |
| মায়ের পাশে বসে শিশু তিনটিও ফুটপাতেই তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যায়। সম্প্রতি গুলশান–২ নম্বরে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
সাদাছড়ি হাতে ফুটপাতে বসে আছেন জ্যোৎস্না বেগম। পাশে তাঁর তিন মেয়ে—নুসরাত জাহান, ইশরাত জাহান ও তাবাসসুম আক্তার। সবার বড় নুসরাত। ফুটপাতেই বসে সে ছোট বোন তাবাসসুমকে পড়া দেখিয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি এক দুপুরে গুলশান-২ নম্বরের মাঝামাঝি একটি ফুটপাতে এই মা-মেয়েদের সঙ্গে দেখা হয়। অনুমতি নিয়েই তাঁদের ছবি তোলা হয়।
জ্যোৎস্না বেগম জন্ম থেকেই দৃষ্টিহীন। তাঁর স্বামী অটোরিকশা চালাতেন। তাঁরও পায়ে সমস্যা ছিল। ১০ মাস আগে বুকে ব্যথা হলে সেটিকে গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা ভেবে ওষুধ খান; কিন্তু ব্যথা কমেনি। পরে হঠাৎই তিনি মারা যান। স্বামী বেঁচে থাকতে জ্যোৎস্না মাঝেমধ্যে ফুটপাতে বসতেন। তবে এখন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ফুটপাতেই কাটে তাঁর সময়। পথচারীদের অনেকে সহায়তা করেন। এই সহায়তার টাকাই এখন তাঁদের একমাত্র ভরসা।
জ্যোৎস্না পাঁচ বছর ধরে কড়াইল বস্তিতে থাকেন। ঘরভাড়া দিতে হয় চার হাজার টাকা। বড় মেয়ে নুসরাত ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। ছোট মেয়ে তাবাসসুম তৃতীয় শ্রেণিতে। তারা বনানীর সিজিএস কমিউনিটি স্কুলে পড়ে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা এই স্কুলে বিনা খরচে পড়ার সুযোগ পায়। বিনা মূল্যে বই-খাতা ও টিফিনও দেওয়া হয়। মেজ মেয়ে ইশরাত পড়ে জাগো ফাউন্ডেশন পরিচালিত একটি স্কুলে। তারও কোনো বেতন লাগে না। তবে তিন বোনই বাসায় প্রাইভেট পড়ে, এতে খরচ হয় আট হাজার টাকা।
জ্যোৎস্না বেগম বলেন, স্বামী বেঁচে থাকতে ঘরভাড়া ও মেয়েদের প্রাইভেট পড়ার খরচ জোগাড় করতে তেমন কষ্ট হতো না। কিন্তু এখন মানুষের দয়ার ওপর নির্ভর করে মাসের এই খরচ চালানো বেশ কঠিন হয়ে গেছে। তবু তিনি কোনোভাবেই মেয়েদের পড়াশোনা বন্ধ করতে চান না। গর্ব করে বলেন, তাঁর মেয়েরা লেখাপড়ায় ভালো।
মেয়েদের স্কুল বন্ধ থাকলে জ্যোৎস্না তাঁদের সঙ্গে নিয়েই ফুটপাতে বসেন। তবে তিনি কখনো মেয়েদের কারও কাছে হাত পাততে বলেন না। তারা মায়ের পাশে বসে পড়াশোনা করে। রোজার সময় পাশের সিটি ব্যাংক থেকে ইফতার দেওয়া হয়, তা দিয়েই তাঁদের খাবার চলে।
জ্যোৎস্না বলেন, ‘আমি মানুষের কাছে সাহায্য চাই। অনেক ম্যাডাম ও স্যার মাঝেমধ্যে ৫০০ বা ১০০০ টাকাও দেন। এই টাকা খরচ করি না, জমিয়ে রাখি। দুই দিন রান্না করি, দুই দিন করি না। এক বেলা খেলে আরেক বেলা খাই না। সব সময় মনে হয়, মেয়েদের পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়।’
জ্যোৎস্নার বাবার বাড়ি জয়পুরহাটে, আর স্বামীর বাড়ি ঝিনাইদহে। দুই পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। তিনি বলেন, ‘তারা নিজেরাই কষ্টে আছে, আমাকে কীভাবে দেখবে? এখন আমাকে দেখার মতো কেউ নেই।’
বর্তমান পরিস্থিতিতে মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়েও চিন্তায় থাকেন জ্যোৎস্না। তিনি বলেন, মেয়েদের একা বস্তির ঘরে রেখে যেতে ভয় পান। তাই তাঁদের সঙ্গে নিয়েই থাকেন। মেয়েরা একা স্কুলে যায়, তিনি তাদের ভালো-মন্দ বুঝিয়ে দেন। এর বাইরে তাঁর করার মতো কিছু নেই।
বস্তির ঘরের মালিকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান জ্যোৎস্না। তিনি বলেন, ভাড়া দিতে দেরি হলেও মালিক তা মেনে নেন। না হলে ঢাকায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে যেত।
স্বামীর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। বলেন, স্বামী তাঁর নানা কাজে সাহায্য করতেন এবং তিনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন।
রাতে বাড়ি ফিরতে দেরি হলে ৫০ টাকা রিকশা ভাড়া লাগে। জ্যোৎস্না বলেন, বেশির ভাগ সময় তিনি হেঁটেই বাড়ি ফেরেন। কারণ, এই ৫০ টাকাও তাঁর কাছে অনেক। এই সামান্য টাকা বাঁচাতে পারলে সঞ্চয়ের পরিমাণ কিছুটা বাড়ে।

Comments
Comments