খাদ্যসহায়তায় টান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হাহাকার
![]() |
| কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ১ এপ্রিল থেকে কমানো হচ্ছে খাদ্য সহায়তা। এ নিয়ে দুশ্চিতায় আছেন রোহিঙ্গারা। সম্প্রতি জাদিমুরা শিবিরে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
কক্সবাজারের টেকনাফের জাদিমুরা আশ্রয়শিবিরের মাঝখানে ত্রিপলের ছাউনির একটি ছোট ঘরে স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান নিয়ে আট বছর ধরে থাকছেন রোহিঙ্গা ছৈয়দ করিম। তাঁর বাড়ি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের উত্তরের বলিবাজার গ্রামে। আশ্রয়শিবিরে শরণার্থী হিসেবে স্বামী-স্ত্রী মিলে মাসে খাদ্যসহায়তা হিসেবে জাতিসংঘের দেওয়া ১২ ডলার করে মোট ২৪ ডলার পান, যা টাকায় প্রায় ২ হাজার ৯৩৫ টাকা। এত কম টাকায় সাত সদস্যের সংসার চালানো কঠিন। এর মধ্যে আগামী এপ্রিল থেকে এই খাদ্যসহায়তা জনপ্রতি সাত ডলারে নেমে আসতে পারে বলে তিনি জেনেছেন।
ছৈয়দ করিম (৫০) বলেন, সামনে কষ্ট আরও বাড়বে। আগে বাড়তি আয়ের জন্য শিবিরের বাইরে মজুরির কাজ করে দিনে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় করতেন। এখন কড়াকড়ির কারণে সেই সুযোগও নেই। বিশেষ করে চারজনের বেশি সদস্যের পরিবারগুলোর খাবার জোগাতে খুবই কষ্ট হচ্ছে।
জাদিমুরা আশ্রয়শিবিরে প্রায় ৩৭ হাজার রোহিঙ্গা বসবাস করছে। তাদের বেশির ভাগই ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর রাখাইন রাজ্যে সহিংসতার মুখে পালিয়ে এসেছে। রোহিঙ্গা আবদুল নবী বলেন, ‘আট বছর ধরে আমরা আশ্রয়শিবিরে খুব কষ্টে দিন কাটাচ্ছি। তহবিলের অভাবের কথা বলে খাদ্যসহায়তা কমানো হচ্ছে। ফিরে যাওয়ার বিষয়েও কোনো অগ্রগতি নেই।’
পাশের লেদা আশ্রয়শিবিরেও খাদ্যসহায়তা কমানো নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। চায়ের দোকান, হাটবাজার ও আড্ডায় বসে রোহিঙ্গারা সহায়তা বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করছেন।
লেদা আশ্রয়শিবিরের উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যান ও রোহিঙ্গা নেতা মোহাম্মদ আলম বলেন, মানবিক কারণে বাংলাদেশ ১৪ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে—এ জন্য তাঁরা কৃতজ্ঞ। তবে সম্প্রতি জাতিসংঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, আগামী ১ এপ্রিল থেকে মাসিক সহায়তা কমানো হবে। পরিবারের অবস্থা অনুযায়ী কেউ ১২, কেউ ১০, আবার কেউ ৭ ডলার পাবেন। এতে শিবিরে অসন্তোষ বাড়ছে। মাঝিরা দফায় দফায় বৈঠক করেও পরিস্থিতি সামাল দিতে পারছেন না।
রোহিঙ্গা নেতা আবুল মনছুর বলেন, ১২ ডলারেও একটি পরিবারের ১৫ দিন চলে না। অনেক পরিবার না খেয়ে বা কম খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। অর্থের অভাবে এবারের ঈদও ঠিকভাবে উদ্যাপন করা যায়নি। পানি, জ্বালানি ও নিরাপত্তার সমস্যাও রয়েছে। এমন অবস্থায় সহায়তা কমানো হলে বড় সংকট দেখা দেবে।
বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে ২ লাখ ৪৫ হাজার পরিবারের ১৪ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। এর মধ্যে ২০১৭ সালের পরের কয়েক মাসে এসেছে প্রায় আট লাখ মানুষ। গত আট বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। উল্টো গত দেড় বছরে নতুন করে আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে এসেছে।
![]() |
| সহায়তা কমালে বড় প্রভাব পড়বে শিশুদের ওপর। বহু শিশু অপুষ্টির শিকার হবে। কক্সবাজারের একটি শিবিরে | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন |
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার এবং অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, গতকাল রোববার পর্যন্ত সব পরিবারকে ১২ ডলার করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। তবে ১ এপ্রিল থেকে পরিবারগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করে খাদ্যসহায়তা দেওয়া হবে।
মিজানুর রহমান জানান, নতুন ব্যবস্থায় পরিবারভেদে ৭, ১০ ও ১২ ডলার করে সহায়তা দেওয়া হবে। আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় জাতিসংঘের সংস্থাগুলো এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। সহায়তা বাড়লে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে।
আরআরআরসি কার্যালয় ও শিবির সূত্রে জানা গেছে, যেসব পরিবারে আয় করতে পারেন এমন সদস্য আছেন এবং নির্ভরশীল কম, তাদের ‘এ’ শ্রেণিতে রেখে ৭ ডলার দেওয়া হবে। এমন পরিবারের সংখ্যা প্রায় ১৭ শতাংশ।
নারী, শিশু ও নির্ভরশীল সদস্য বেশি—এমন পরিবারকে ‘সি’ শ্রেণিতে রেখে ১২ ডলার দেওয়া হবে, যা প্রায় ৩৩ শতাংশ। অন্যদিকে মাঝামাঝি অবস্থার ৫০ শতাংশ পরিবার ‘বি’ শ্রেণিতে পড়ে, তারা পাবে ১০ ডলার করে।
মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেই এই ভাগ করা হয়েছে। তবে এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ আছে। তহবিল কমে যাওয়ার বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
রোহিঙ্গা নেতারা আশঙ্কা করছেন, আশ্রয়শিবিরে মানবিক সংকট আরও বাড়তে পারে। আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের সভাপতি মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, আগে ১৪ ডলার থেকে কমিয়ে ৮ ডলার করা হয়েছিল, পরে ১২ ডলারে আনা হয়। এখন আবার ৭ ডলারে নামানো হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠবে।


Comments
Comments