চিঠি আদান-প্রদান নেই, ডাকঘরে পড়ে আছে অবহেলিত পোস্টকার্ড
| পোস্টকার্ড | ফাইল ছবি |
একসময় কম খরচে বার্তা পাঠানোর অন্যতম মাধ্যম ছিল ডাক বিভাগের পোস্টকার্ড। ঈদ, পূজা বা বিশেষ অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা জানাতে কিংবা জরুরি বার্তা পাঠাতে পোস্টকার্ডের ব্যবহার ছিল ব্যাপক। স্টেশনারি পণ্য হিসেবে এটিকে অনেকেই সংরক্ষণ করতেন। একসময় মাত্র ৫০ পয়সায় দেশের যেকোনো প্রান্তে পোস্টকার্ডে খোলা চিঠি পাঠানো যেত।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে জনপ্রিয় এই মাধ্যম ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। এখন পোস্টকার্ডের দাম দুই টাকা হলেও ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে। সময় বদলানোর সঙ্গে মানুষ এখন বার্তা পাঠানোর জন্য মূলত ফেসবুক, এক্স, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভর করছে। ফলে শখ করেও ডাক বিভাগের পোস্টকার্ড ব্যবহার করতে আগ্রহী নন অনেকেই।
এবারের ঈদে পোস্টকার্ডে শুভেচ্ছা পাঠানো মানুষ খুব কম দেখা গেছে। তাঁদের মধ্যে একজন এনামুল হক। তিনি তাঁর বন্ধু চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. আব্দুল মান্নানকে পোস্টকার্ডে খোলা চিঠি হিসেবে ঈদের শুভেচ্ছা পাঠিয়েছেন।
এনামুল হক বলেন, হাতের কাছে পোস্টকার্ড পাওয়া এখন প্রায় অসম্ভব। আগে যেকোনো স্টেশনারির দোকানে সহজেই পাওয়া যেত। এখন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, এক্স, হোয়াটসঅ্যাপ থাকায় কষ্ট করে পোস্টকার্ড সংগ্রহ করতে হয়। এবার কয়েকজন বন্ধুকে পোস্টকার্ডে ঈদের শুভেচ্ছা জানালাম। ছোটবেলার সেই আনন্দ ফিরে পেলাম।
বিভিন্ন সময়ে ডাক বিভাগের উদ্যোগে মেলার আয়োজন করা হতো, যেখানে পোস্টকার্ড ও চিঠির খামের প্রদর্শনী থাকত। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রায় আঠারো মাস পোস্টকার্ড বিক্রি কার্যক্রম বন্ধ থাকার অভিযোগ ওঠে। জানা গেছে, পোস্টকার্ডের ডান পাশে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছোট প্রতিকৃতি থাকায় বিক্রি সীমিত রাখা হয়েছিল। যদিও বিষয়টি কেউ প্রকাশ্যে স্বীকার করেননি।
অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নেওয়ার পর মোহাম্মদপুরের এক জ্যেষ্ঠ ব্যক্তি পোস্টকার্ড কিনতে গেলে তাঁকে প্রথমে জানানো হয়, বিক্রি করা যাবে না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই ব্যক্তি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় নেই, তারপরও বিক্রি করা যাচ্ছিল না। পরে পোস্ট অফিসের একজন কর্মী পোস্টকার্ড বিক্রি করেন। তিনি খুব সহানুভূতিশীল ছিলেন।
মোহাম্মদপুর পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার মো. মাহমুদ নবী বলেন, কখনো বিক্রি বন্ধ ছিল না, আসলে কেউ কিনতে আসতেন না। এখনও তেমন কেউ আসেন না। আগে বিটিভি এক লাখ টাকার পোস্টকার্ড অর্ডার করেছিল, এর মধ্যে ১০ হাজার টাকার নিয়েছে। এখনও ৯০ হাজার টাকার পোস্টকার্ড পড়ে আছে।
ঢাকার বাইরের পরিস্থিতি সম্পর্কে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার পোস্ট অফিস পরিদর্শক মো. মজিবর রহমান বলেন, এক সময় আত্মীয়-পরিজনের কাছে শুভেচ্ছা জানাতে বা জরুরি বার্তা পাঠাতে পোস্টকার্ডের কদর ছিল। এখন আর কেউ এগুলো কিনতে চান না। নতুন করে এর ব্যবহার বাড়ানো কঠিন। তবে পোস্টকার্ডের দাম মাত্র দুই টাকা, মান উন্নত করে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা গেলে কিশোর-কিশোরী বা শিশুদের কাছেও এটি জনপ্রিয় হতে পারে। ছোট পরিসরে গবেষণা করে এই পুরোনো ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা উচিত।
পোস্টকার্ড ব্যবহারের বিষয়টি আবার চালু করার বিষয়ে অতিরিক্ত পোস্টমাস্টার জেনারেল মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, নতুন করে পোস্টকার্ড ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ বিষয়ে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ডাক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এক সময় রাজধানী ঢাকায় প্রায় ২৬৯টি লেটার বক্স ছিল। এর মধ্যে হলুদ বক্স ঢাকার জন্য, লাল বক্স সারাদেশের জন্য এবং নীল বক্স বিদেশে চিঠি পাঠানোর জন্য ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে অধিকাংশ লেটার বক্স আর নেই।
অতিরিক্ত পোস্টমাস্টার জেনারেল মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, “পোস্ট অফিসের আশপাশে এখনও প্রায় শতাধিক লেটার বক্স চালু রয়েছে। বেশিরভাগ জায়গা থেকে ব্যবহার না হওয়ায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, আবার কিছু নতুন করে বসানো হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী পরিকল্পনা করে আরও বসানো হতে পারে।”
তবে ডাক বিভাগ স্বীকার করেছে, মানুষকে লেটার বক্স ব্যবহার করতে উৎসাহিত করার উদ্যোগ খুব কম। প্রতি বছর ৯ অক্টোবর বিশ্ব ডাক দিবসে ডাক বিভাগের সেবাসহ বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহ তৈরি করা যায়নি।
এ ছাড়া বর্তমানে ডাক বিভাগের আওতায় ৯৮৪৮টি ডাকঘর রয়েছে। এর মধ্যে ৪টি জিপিও, ২৩টি এ গ্রেড পোস্ট অফিস, ৪৫টি বি গ্রেড পোস্ট অফিস, ৪০৮টি উপজেলা পোস্ট অফিস, ৯৩০টি সাব পোস্ট অফিস এবং ৮১০৯টি শাখা ডাকঘর রয়েছে। এই ডাকঘরগুলো শহর থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকাতেও ডিজিটাল পদ্ধতিতে ডাকসেবা পৌঁছে দিচ্ছে।
Comments
Comments