[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

সাড়ে ছয় দশকের দীর্ঘ যাত্রায় বিতর্কই সঙ্গী

প্রকাশঃ
অ+ অ-
রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের চুল্লি | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

দেশবাসী ৬৫ বছর আগে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্বপ্ন দেখেছিল। বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এখন সেই কেন্দ্রের নির্মাণকাজ দৃশ্যমান। আশা করা হচ্ছে, আগামী ডিসেম্বরে রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।

গত ১২ মার্চ অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পরিকল্পনা কমিশনে ঢাকায় নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার খোজিনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। আগামী ৭ এপ্রিল কেন্দ্রটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ফুয়েল লোডিং’ শুরু হবে। ফুয়েল লোডিং সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর জুন-জুলাই মাসে পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে।

মন্ত্রী জানান, পরীক্ষামূলক উৎপাদনের শুরু থেকেই এই বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। তবে পূর্ণ সক্ষমতায়, অর্থাৎ প্রথম ইউনিটের পুরো ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নিয়মিতভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হবে ডিসেম্বর নাগাদ। পরীক্ষামূলক চালুর সময় কেন্দ্রটি সম্পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করবে না; জুন-জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ধাপে ধাপে বিদ্যুতের পরিমাণ বাড়ানো হবে।

পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুরে অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। প্রথম ইউনিটটি ২০২৪ সালে কার্যক্রম শুরু করার কথা থাকলেও বিভিন্ন কারণে তা পিছিয়েছে। এটি রাশিয়ার রোসাটোম স্টেট অ্যাটমিক এনার্জি করপোরেশনের সহযোগিতায় নির্মিত হচ্ছে।

১৯৬১ সালে বাংলাদেশে প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৬২ সালে ঈশ্বরদী থানার পদ্মা নদীর পার্শ্ববর্তী রূপপুর নির্বাচিত হয়। একাধিক সমীক্ষার মাধ্যমে প্রকল্পের বাস্তবতা যাচাই করা হয়। এই প্রকল্পের জন্য ২৬০ একর এবং আবাসিক এলাকার জন্য ৩২ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ১৯৬৮ সালের মধ্যে ভূমি উন্নয়ন, অফিস, রেস্ট হাউস, বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র এবং কিছু আবাসিক ইউনিটের নির্মাণকাজ আংশিকভাবে সম্পন্ন হয়। ১৯৬৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদনের প্রকল্প বাতিল করে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে সরকার আবার ২০০ মেগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ১৯৭৭-১৯৮৬ সালে ‘মেসার্স সোফরাটম’ সম্ভাব্যতা অধ্যয়ন চালিয়ে রূপপুরে প্রকল্প বাস্তবায়ন যৌক্তিক বলে সিদ্ধান্ত দেয়। এরপর একনেক ১২৫ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেয়, কিন্তু বিভিন্ন কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৮৭ সালে জার্মানি ও সুইজারল্যান্ডের দুটি কোম্পানি দ্বিতীয়বার সম্ভাব্যতা অধ্যয়ন করে এবং ৩০০–৫০০ মেগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ দেয়।

২০০৯ সালে ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে অপরিহার্য কার্যাবলি সম্পাদন’ শীর্ষক প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মাণের জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন শুরু হয়। ১৩ মে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন ও রুশ রোসাটোমের মধ্যে ‘পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার’ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ২১ মে ২০১০ সালে বাংলাদেশ সরকার ও রাশিয়ান ফেডারেশনের মধ্যে ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রকল্প সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একটি জাতীয় কমিটি, মন্ত্রী ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সভাপতিত্বে একটি কারিগরি কমিটি, মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ এবং ৮টি উপগ্রুপ গঠন করা হয়েছে।

২০১১ সালের ২ নভেম্বর বাংলাদেশ ও রুশ ফেডারেশন সরকারের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত আন্তঃরাষ্ট্রীয় সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ২০১২ সালের ১৯ জুন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ পাস করা হয়।

২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর রাশিয়া ফেডারেশন সফরকালে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রাক-প্রারম্ভিক পর্যায়ের কার্যাদি সম্পাদনের জন্য রাষ্ট্রীয় রপ্তানি ঋণচুক্তি স্বাক্ষর হয়। এ চুক্তির ভিত্তিতে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন (প্রথম পর্যায়) প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ২০১৩ সালের ২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রথম পর্যায় কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করে। 

২০১৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির বিধানসংবলিত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র আইন-২০১৫ জারি করা হয়। ২০১৫ সালের ১৮ আগস্ট রূপপুরসহ অন্যান্য পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনার জন্য নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড গঠন করা হয়। ২০১৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মূল পর্যায়ের কার্যাবলি সম্পাদনের জন্য রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সাধারণ চুক্তি স্বাক্ষর হয়। 

২০১৬ সালের ১০-১৪ মে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় পারমাণবিক অবকাঠামো প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আইএইএর সুপারিশ বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য আইএনআইআর ফলোআপ মিশন পরিচালনা করা হয়। ২০১৬ সালের ২১ জুন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থান লাইসেন্স প্রদান করে। ২০১৬ সালের ২৬ জুলাই এ প্রকল্পের মূল পর্যায়ের কার্যাবলি সম্পাদনের জন্য বাংলাদেশ সরকার ও রুশ ফেডারেশন সরকারের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ক্রেডিট চুক্তি স্বাক্ষর করা হয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়ন বিষয়ে রুশ ফেডারেশন ও বাংলাদেশ পক্ষের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ সমন্বয় কমিটির একটি সভা ২০১৬ সালের ২২ জুন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্পেন্ট ফুয়েল রাশিয়ায় ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও রুশ ফেডারেশনের সাথে ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট এক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ২০১৭ সালের ৪ নভেম্বর একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নকশা ও নির্মাণ লাইসেন্স প্রদান করে। ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১ নং ইউনিটের প্রথম কংক্রিট ঢালাইয়ের উদ্বোধন করেন।

২০২১ সালের ১০ অক্টোবর ও ২০২২ সালের ১৮ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যথাক্রমে এই কেন্দ্রের প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের পারমাণবিক চুল্লিপাত্র বা রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল স্থাপনের কাজ উদ্বোধন করেন। উভয় অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পাবনার ঈশ্বরদীতে যুক্ত হন তিনি। রূপপুরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রুশ আণবিক শক্তি সংস্থা-রোসাটমের মহাপরিচালক অ্যালেক্সিই লিখাচেভ।

২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ রাশিয়ার কাছ থেকে পারমাণবিক জ্বালানির প্রথম চালান গ্রহণ করে। এ উপলক্ষে একটি ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যাতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি ভ্লাদিমির পুতিন উপস্থিত ছিলেন। ২০২৪ সালের ১৩ অক্টোবর প্রথম ইউনিট ও ২০২৫ সালের ১৭ অক্টোবর দ্বিতীয় ইউনিট চূড়ান্ত হস্তান্তর করার কথা থাকলেও ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পের সময়সীমা দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সাল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। গত একনেক বৈঠকে তা বাড়িয়ে ২০২৮ সাল করা হয়।

এই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য নির্বাচিত পারমাণবিক চুল্লিতে পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য থাকবে বলে জানানো হয়েছে। এগুলো হলোÑ পারমাণবিক চুল্লির ফুয়েল পেলেট, যা অতি উচ্চ তাপমাত্রায় তার জ্বালানি বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে পারে। ফুয়েল পেলেট সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তৈরি করা হয়, ফলে তেজস্ক্রিয় ফিশন প্রোডাক্টসমূহ পেলেটের ভেতরে অবস্থান করে।

ফুয়েল পেলেটগুলো জিরকোনিয়াম অ্যালয়ের তৈরি ফুয়েল ক্ল্যাডিং দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। বিশেষ কোনো কারণে সামান্য পরিমাণ ফিশন প্রোডাক্ট ফুয়েল পেলেট থেকে বের হয়ে এলেও তা এই ক্ল্যাডিংয়ে ভেদ করতে পারবে না। নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের জন্য বিশেষ মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পুরু ইস্পাতের প্রেশার ভেসেল তৈরি করা হয় যা, উচ্চ তেজস্ক্রিয় অবস্থাতেও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

রিইনফোর্সড কংক্রিট দিয়ে ১.২ মিটার পুরুত্বের প্রথম কন্টেইনমেন্ট ভবন তৈরি করা হয়, যা যেকোনো পরিস্থিতিতে তেজস্ক্রিয়তা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া থেকে বিরত রাখে। 

নিরাপত্তাব্যবস্থা অধিকতর জোরদার করার জন্য আধুনিক নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টগুলোতে প্রথম কন্টেইনমেন্ট ভবনের পর আরও ০.৫ মিটার পুরুত্বের আরও একটি কন্টেইনমেন্ট ভবন যুক্ত করা হয়; যা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিমান দুর্ঘটনা ইত্যাদি থেকে প্লান্টকে সুরক্ষা দেয়।

এই পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যের কারণে মনুষ্য সৃষ্ট ঘটনা/দুর্ঘটনা বা প্রাকৃতিক বিপর্যয় যেমন শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, ভুমিকম্প, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদির প্রভাব মোকাবিলায় সক্ষম থাকবে এই পারমাণবিক চুল্লি। 

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন