[tenolentSC] / results=[3] / label=[ছবি] / type=[headermagazine]

বিএনপির জয়ে নতুন মোড়ে বাংলাদেশ, প্রত্যাশা বাড়ছে সমর্থকদের: আল–জাজিরা

প্রকাশঃ
অ+ অ-
সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ঢাকা | ছবি: পদ্মা ট্রিবিউন

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিন বিকেলে রিকশাচালক আনোয়ার পাগলা যখন ঢাকার গুলশানে বিএনপির কার্যালয়ের সামনের রাস্তায় মোড় নিলেন, তখন সেখানে ছোটখাটো শোরগোল পড়ে। তাঁর রিকশার হুডের এক পাশে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, অন্য পাশে বিএনপির দলীয় পতাকা ঝুলছিল। তিনি এই দলের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক।

আনোয়ার আল-জাজিরাকে বলেন, ‘লোকে আমাকে পাগল বলে, কারণ আমি মনে করি, এই দলই আমার জীবনের সবকিছু। তবে লোকে কী মনে করে, তাতে কিছু যায় আসে না। আমরা জিতেছি এবং বাংলাদেশ এখন আরও ভালো হবে।’

প্রায় দুই দশক পর আবার ক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি। গত বৃহস্পতিবারের সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের মধ্য দিয়ে দলটি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।

শনিবার নির্বাচন কমিশন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের গেজেট প্রকাশ করেছে, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিক ধাপ। নির্বাচনে মধ্যডানপন্থী বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২১২টিতে জিতেছে। অন্যদিকে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও দেশের বৃহত্তম ধর্মভিত্তিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন।

লোকে আমাকে পাগল বলে। কারণ, আমি মনে করি, এই দলটিই আমার জীবনের সবকিছু। তবে (লোকে কী মনে করল) তাতে কিছু যায়–আসে না। আমরা জিতেছি এবং বাংলাদেশ এখন আরও ভালো হবে।

আনোয়ার পাগলা, রিকশাচালক ও বিএনপির সমর্থক

২০২৪ সালে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাত হয়। এতে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ প্রাণ হারান। ক্ষমতাচ্যুত হাসিনা দেশ থেকে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর থেকে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ পরিচালিত হচ্ছে।

নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নতুন প্রধানমন্ত্রী হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। নির্বাচনের পরদিন শুক্রবার সমর্থকদের সঙ্গে দেখা করে তিনি বলেন, ‘আপনারা যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন, সেটার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।’ নির্বাচনী প্রচারে তিনি বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, বাংলাদেশে গণতন্ত্র আবার যাত্রা শুরু করবে।

বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলে নাগরিকদের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে ক্ষমতায় গিয়েছিল বিএনপি। দুই দশক পর তাঁর ছেলে তারেক রহমানের হাত ধরে বিএনপি আবার ক্ষমতায় ফিরল।

বৃহস্পতিবারের ভোট মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ভোট গণনায় অসংগতি ও কারচুপির অভিযোগ থাকলেও শনিবার নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছে জামায়াত।

বিএনপি সম্প্রতি নিজেদের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হারিয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়া ৩০ ডিসেম্বর মারা যান।

খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৯১ ও ২০০১ সালে ক্ষমতায় গিয়েছিল বিএনপি। দুই দশক পর তাঁর ছেলে, তারেক রহমানের হাত ধরে বিএনপি আবার ক্ষমতায় ফিরল।

শুক্রবার দুপুরে গুলশানে বিএনপির কার্যালয়ে দলের কর্মী কামাল হোসেন উল্লসিত জনতার ভিড়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি সেসব দিনের কথা স্মরণ করেন, যা তিনি ‘দমন-পীড়নের বছর’ বলে বর্ণনা করেন।

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের দিকে ইঙ্গিত করে কামাল বলেন, ‘অনেক দিন ধরে আমার মনে হয়েছিল, শেখ হাসিনার শাসন বোধ হয় কখনো শেষ হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘এবার মানুষ আমাদের দেশের শাসনের সুযোগ দিয়েছে। আমরা বাংলাদেশকে ফিরে পেয়েছি।’

আপনারা যে ভালোবাসা দেখিয়েছেন, সেটার জন্য আমি কৃতজ্ঞ।

তারেক রহমান, বিএনপির চেয়ারম্যান

কামাল হোসেন আরও বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই নতুন সরকারের তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। তাঁর ভাষ্য, নিত্যপণ্যের দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অন্যদিকে অনেক তরুণ বেকার। সরকারকে এসব সমস্যা দ্রুত সমাধান করতে হবে।

এদিকে নির্বাচনের পরদিন শুক্রবার রাজধানী ঢাকা অস্বাভাবিকভাবে শান্ত ছিল। এদিন রাজধানী শান্ত থাকার পেছনে পরিকল্পনা ছিল। বিএনপি বিজয় মিছিল না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ও শুক্রবার শান্ত দেখা গেছে। তবে কার্যালয়ের আশপাশে কয়েকজন সমর্থক হতাশা প্রকাশ করেছেন।

কার্যালয়ের পাশে জামায়াতের সমর্থক আবদুস সালাম অভিযোগ করেন, ‘ভোট গণনার প্রক্রিয়ায় কৌশল প্রয়োগ হয়েছে, আর সংবাদমাধ্যম জামায়াত জোটের বিরুদ্ধে পক্ষপাত করেছে।’ তাঁর মতে, ভোট গণনা সুষ্ঠু হলে জামায়াত আরও বেশি আসন পেত।

অন্যদিকে জার্মানিতে বসবাসকারী জামায়াতের সমর্থক মুয়াজ আবদুল্লাহ বলেন, সংগঠনের ব্যর্থতার কারণে জামায়াত পরাজিত হয়েছে।

রাজধানীর মগবাজারে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ও শুক্রবার শান্ত দেখা গেছে। তবে কার্যালয়ের আশপাশে কয়েকজন সমর্থক হতাশা প্রকাশ করেন।
মুয়াজ আরও বলেন, ‘অনেক এলাকায় জামায়াত ভালোভাবে নির্বাচনী প্রচার চালাতে পারেনি। কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে তাদের ঠিকমতো প্রতিনিধি পর্যন্ত ছিল না।’

বিএনপি ও জামায়াত দীর্ঘদিন এক জোটে থাকলেও এই নির্বাচনে তারা ছিল পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। নির্বাচনী প্রচারের সময় কিছু বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। তবে নির্বাচনের আগের কয়েক মাসে অনলাইনে তীব্র বিভাজন দেখা গেছে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের বাইরে দলটির কর্মী সুজন মিয়া মৈত্রীর সুরে বলেন, ‘আমরা শত্রুতা চাই না। আমাদের দেশ গঠনের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত।’

‘জবান’ নামে বাংলাদেশের একটি সাময়িকীর সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক রেজাউল করিম রনি বলেন, এই নির্বাচনে বিএনপির জয় বাংলাদেশের ডানপন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কা কমাতে সাহায্য করবে। তাঁর ভাষ্য, ‘এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ এক অর্থে দেশের রাজনীতিকে সেই ঝুঁকি থেকে মুক্ত করেছে।’

তবে আসল পরীক্ষা এখনো শুরু হয়নি বলে সতর্ক করেন রেজাউল করিম। তিনি বলেন, ‘ভালো শাসন নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা বজায় রাখা এবং অধিকারভিত্তিক একটি রাষ্ট্র গড়ে তোলা মূল চ্যালেঞ্জ। এগুলোই ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষার মূলভিত্তি।’

আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, বিএনপির এই জয় ‘২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে পরিবর্তনের রাজনীতির যে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, তার জন্য একটি ধাক্কা।’
 
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পোস্টারের সামনে দলটির নেতা–কর্মীরা বিজয়সূচক ‘ভি’ চিহ্ন দেখাচ্ছেন। ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ঢাকা | ছবি: রয়টার্স
 
কুগেলম্যান বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘বিএনপি পরিবারতান্ত্রিক এবং দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির অভিযোগে জর্জরিত। দলটির মধ্যে সেই নীতির প্রতিফলন রয়েছে, যা জেন-জি আন্দোলনকারীরা প্রত্যাখ্যান করেছেন।’

তিনি আরও বলেন, বিএনপি এখন পুরনো রাজনৈতিক অভ্যাসের বাইরে যেতে জনগণ এবং বিরোধী দলের চাপের মুখে থাকবে। তাঁর ভাষায়, ‘নতুন সরকার যদি দমনমূলক বা প্রতিশোধমূলক রাজনীতিতে ফিরে যায়, তবে সংস্কারবাদীরা হতাশ হবেন এবং গণতান্ত্রিক প্রচেষ্টা পিছিয়ে যাবে।’

বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনের ফলাফল সামগ্রিকভাবে পুরো অঞ্চলের জন্য তুলনামূলকভাবে কম টানাপোড়েন সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পাকিস্তান সম্ভবত জামায়াতের জয় বেশি পছন্দ করত, কারণ ইসলামাবাদের সঙ্গে দলটির ঐতিহাসিক সংযোগ রয়েছে। তবে কুগেলম্যানের মতে, পাকিস্তান ও চীন উভয়ই বিএনপির সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখে। অন্যদিকে ভারত বিএনপিকে জামায়াতের তুলনায় অনেক বেশি পছন্দ করে।

তবে ঢাকায় বিএনপি কার্যালয়ের দৃশ্য দেখে ভূরাজনৈতিক বিষয় অনেক দূরের মনে হয়। বিজয়ের বিশেষ মুহূর্ত ভাগাভাগি করতে নিজের দুই নাতি-নাতনিকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির কার্যালয়ে এসেছিলেন দলটির নেতা শামসুদ দোহা।

শামসুদ দোহা বলেন, ‘এ অনুভূতির সঙ্গে তুলনা করার মতো কিছু নেই। স্বৈরশাসনের অধীনে আমরা দীর্ঘদিন ভুগেছি। এখন আমাদের দেশ গঠনের সময়।’
Fetching live reactions...
Was this article helpful?

Comments

Comments

Loading comments…
মোবাইল অ্যাপস ডাউনলোড করুন