সিলিন্ডার গ্যাসের সংকট দ্রুত মিটছে না
| প্রতীকী ছবি |
রান্নার জ্বালানি হিসেবে পরিচিত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সংকট সহজে কাটছে না। পবিত্র রমজান শুরুর আগে সরবরাহ বাড়ানোর তোড়জোড় থাকলেও বাস্তবে ব্যবসায়ীরা কথা অনুযায়ী এলপিজি আমদানি করতে পারেননি। উল্টো এক মাসের ব্যবধানে আমদানি কমেছে ২১ হাজার টন।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বরে ১ লাখ ২৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছিল। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার লক্ষ্যে জানুয়ারিতে ১ লাখ ৬৭ হাজার ৬০০ টন আমদানির পরিকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত এসেছে ১ লাখ ৫ হাজার টন। ফেব্রুয়ারিতে আমদানি সামান্য বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও ব্যবসায়ীদের মতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে মার্চ পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, আমদানি বাড়াতে সরকার ঋণপত্র বা এলসি খোলার সুযোগসহ বিভিন্ন সুবিধা দিয়েছে। চাহিদামতো পণ্য আনার অনুমতিও দেওয়া হয়েছে। এমনকি জাহাজভাড়া বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনা করে দাম সমন্বয় করেছে বিইআরসি। এরপরও সব কোম্পানি এলপিজি আমদানি করতে পারেনি। কেউ কেউ ঋণপত্র খুলতে ব্যর্থ হয়েছেন। বড় কোম্পানিগুলো বাড়তি দামে পণ্য কিনতে চাইলেও বিশ্ববাজারে খোলাবাজার থেকে এলপিজি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে অস্থিরতা চলায় এখন বিকল্প বাজারের খোঁজ করা হচ্ছে।
দেশের অন্যতম শীর্ষ এলপিজি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজেআই) ফ্রেশ এলপি গ্যাসের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা জানান, বিশ্ববাজারে দাম বেশি হওয়া সত্ত্বেও ফ্রেশ গ্যাস আমদানি অব্যাহত রেখেছে। মার্চের মধ্যে সংকটের সমাধান হতে পারে।
এদিকে এলপিজি আমদানিকারকদের সংগঠন লোয়াবের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত মাসে হঠাৎ জ্বালানি বিভাগ থেকে এলপিজি আমদানির অনুমতি নেয় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সরকারি এই সংস্থাটি এলপিজি আমদানি করে বেসরকারি কোম্পানিগুলোকে দেওয়ার কথা ছিল। এ কারণে অনেক ব্যবসায়ী নিজেদের আমদানির প্রচেষ্টায় ঢিলেমি দিয়েছেন। তবে বিপিসি এখনো সেই আমদানি কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, দ্রুত সংকট মেটাতে দুই সপ্তাহ আগে সরকারি পর্যায়ে এলপিজি আমদানির অনুমতি পেয়েছে সংস্থাটি। ইতিমধ্যে তারা ১১টি দেশকে চিঠি পাঠিয়েছে। এসব দেশের আগ্রহ ও সক্ষমতা যাচাই করে একটি তালিকা তৈরি করা হবে। এরপর শুরু হবে দাম নিয়ে আলোচনা। ফলে এই প্রক্রিয়ায় এলপিজি আমদানি করতে আরও বেশ কিছু সময় লেগে যাবে।
বিইআরসি ও লোয়াবের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এলপিজি আমদানির সক্ষমতা রয়েছে ২৩টি কোম্পানির। তবে গত বছর আমদানি করেছে ১৭টি কোম্পানি। এর মধ্যে কিছু প্রতিষ্ঠান শেষের দিকে কোনো গ্যাস আমদানি করতে পারেনি। মূলত মাত্র পাঁচটি কোম্পানি এলপিজির সিংহভাগ আমদানি করেছে। এই কোম্পানিগুলো আমদানি বাড়ানোর অনুমতি চাইলেও সময়মতো তা পায়নি। ফলে গত নভেম্বরে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এলপিজি আমদানি কমে যায় ৪৪ শতাংশ। এতে বাজারে বড় ধরনের সরবরাহ ঘাটতি দেখা দেয় এবং ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে এলপিজির তীব্র সংকট শুরু হয়।
অন্যতম শীর্ষ এলপিজি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ওমেরার পরিচালক ও লোয়াবের সাবেক সভাপতি আজম জে চৌধুরী জানান, বিশ্বজুড়েই এখন এলপিজির চাহিদা বেশি। এ কারণে অনেকে আমদানি করতে পারছে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে এক থেকে দুই মাস সময় লাগতে পারে।
এদিকে চলমান সংকটের মধ্যেই ফেব্রুয়ারির জন্য এলপিজির নতুন দাম ঘোষণা করেছে বিইআরসি। গত সোমবার সংস্থাটির ঘোষণায় জানানো হয়, ফেব্রুয়ারিতে বেসরকারি এলপিজির মূল্য সংযোজন করসহ দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ১১৩ টাকা ৪ পয়সা। সেই হিসাবে ১২ কেজি সিলিন্ডারের নতুন দাম ১ হাজার ৩৫৬ টাকা। যদিও বাজারে এই দামে এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, আইন অনুযায়ী কমিশন দাম ঘোষণা করছে। দাম নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয় বলেই বাড়তি দাম নেওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে। কোম্পানিগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এলপিজি আমদানি না করার কারণ জানতে চেয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
দেশে বর্তমানে এক কোটির বেশি গ্রাহক এলপিজি ব্যবহার করেন। এখন নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি ১২ কেজির সিলিন্ডারে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেশি নিচ্ছেন বিক্রেতারা। রাজধানীর মিরপুরের দক্ষিণ পাইকপাড়ার বাসিন্দা সাহানা সাত্তার জানান, সরকার নির্ধারিত দামে কোথাও এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। সোমবার তিনি একটি ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৩০০ টাকায় কিনতে বাধ্য হয়েছেন।
Comments
Comments